আলী আহসান রবি :
ঢাকা, ২১ জুন ২০২৬, রবিবার
জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর থেকে সব ধরনের আমদানি শুল্ক, ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহারের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো। তবে একইসঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেছে, বাজেট ঘোষণার মাত্র তিন দিন আগে জারি করা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একটি এসআরও সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের লক্ষ্যকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
আজ রবিবার, রাজধানীর গ্রিন লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত “জাতীয় বাজেটে জ্বালানি খাতঃ নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়া” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসকল দাবি তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করেছে উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন) এবং বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি) এবং সহ-আয়োজক হিশেবে রয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা), ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ, এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। অনুষ্ঠানের ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী। আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা) থেকে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন থেকে ওয়াসিউর রহমান তন্ময়, ইটিআই বাংলাদেশের পরিচালক মুনীর উদ্দিন শামীম, জলবায়ু কর্মী ফারাহ আনজুম এবং ক্লিনের নেটওয়ার্কিং এডভাইজার মনোয়ার মোস্তফা।
কর ও শুল্ক প্রত্যাহারের ফলে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও উৎপাদন ব্যয় ৩০ থেকে ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসবে। এর ফলে জ্বালানি আমদানির ওপর দেশের নির্ভরতা কমবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জাতীয় লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে। এটি শুধু একটি কর-ছাড় নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং জলবায়ু অভিযাত্রার জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। কিন্তু, গত, ৮ই জুন জারি করা এনবিআরের এসআরওতে এমন কিছু শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যা সাধারণ গ্রাহক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকদের জন্য সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনকে প্রায় অসম্ভব করে তুলবে। এসআরও অনুযায়ী মূলত বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও পিপিএভিত্তিক সৌর প্রকল্পগুলোই কর-সুবিধা পাবে, অথচ কোটি কোটি আবাসিক গ্রাহক, কৃষক এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এর বাইরে থেকে যাবেন।
এ বিষয়ে বিডব্লিউজিইডি এর সদস্য সচিব হাসান মেহেদী বলেন, “সরকার যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেখানে এনবিআরের এই এসআরও সেই অগ্রযাত্রার পথেই কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি অবিলম্বে বাতিল করে কর-সুবিধা সকল নাগরিক ও উদ্যোক্তার জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।”
একদিকে সরকার এলএনজি আমদানিকে বড় অর্থনৈতিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত করছে, অন্যদিকে এলএনজি আমদানির ওপর বিদ্যমান কর-সুবিধা বহাল রেখেছে। পাশাপাশি কয়লা আমদানির কর ছাড় বৃদ্ধি, নতুন রিফাইনারি স্থাপন এবং জীবাশ্ম জ্বালানি অবকাঠামো সম্প্রসারণের উদ্যোগ দেশের সবুজ রূপান্তরকে ধীর করে দিতে পারে।
আগামী অর্থবছরে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ১৭ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য বরাদ্দ মাত্র ৩৭৯ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের মাত্র ২.২ শতাংশ। অথচ ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বছরে কমপক্ষে ২১ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি তহবিল গঠন, আবাসিক সৌরবিদ্যুতের জন্য সরাসরি ভর্তুকি প্রদান, কর্পোরেট বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি (Corporate PPA) দ্রুত কার্যকর করা, ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর প্রগতিশীল নির্গমন কর আরোপের দাবি জানানো হয়।
কি ভাবছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিগণ?
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা) থেকে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর পাশাপাশি বাজেট ও নীতিতে তার প্রতিফলন থাকতে হবে। শুধু ছাদসোলারের লক্ষ্য নয়, প্রয়োজন পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা। রাজধানীর বাইরে চলমান লোডশেডিং ও জ্বালানি বৈষম্য দূর করতেও বাজেটে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।”
ক্লিনের নেটওয়ার্কিং এডভাইজার মনোয়ার মোস্তফা বলেন, “নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত অগ্রসর হওয়া বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রাধিকার। যত দ্রুত আমরা এগোবো, অর্থনীতি তত লাভবান হবে। তাই এই খাতে বিদ্যমান বৈষম্যমূলক নীতিগুলো পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।”
ইটিআই বাংলাদেশের পরিচালক মুনীর উদ্দিন শামীম বলেন, “মুনীর উদ্দীন শামীম, পরিচালক, ইটিআই বাংলাদেশ বলেন, “একটি বাজেট তখনই মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, যখন তা সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে। বৈষম্য রেখে সবুজ জ্বালানিতে রূপান্তর সম্ভব নয়। কার্বন নির্গমন কমানোর লক্ষ্যে সরকারকে কার্যকর প্রণোদনা দিতে হবে। একই সঙ্গে ২০২৭ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার চাহিদা পূরণে বাজেট ও নীতির যথাযথ সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।”
ফারাহ আনজুম বলেন, “বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জ্বালানি খাতে মোট বরাদ্দের প্রায় ৯৮ শতাংশই জীবাশ্ম জ্বালানিতে যাচ্ছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, আমাদের নীতিগত অবস্থান ও বাস্তব বিনিয়োগের মধ্যে কি কোনো সামঞ্জস্য রয়েছে?”
সুশীল সমাজের ৭ দফা কৌশলগত দাবি:
সংবাদ সম্মেলন থেকে নিম্নলিখিত সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো পেশ করা হয়:
১। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ৮ জুন ২০২৬ জারিকৃত এসআরও বাতিল করে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের উপর থেকে সব ধরনের শুল্ক ও কর আগামী ১০ বছরের জন্য বাতিল করতে হবে যা সবার জন্য প্রযোজ্য হবে।
২। বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত সম্প্রসারণের জন্য ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি তহবিল গঠন করতে হবে যা বাংলাদেশ ব্যাংক বিনাসুদে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সরবরাহ করবে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সুদে তা নবায়নযোগ্য জ্বালানির উদ্যোক্তাদের প্রদান করবে। এক্ষেত্রে পুনর্তহবিল নয় (Refinancing) বরং পূর্বতহবিল (Prefinancing) সরবরাহ করতে হবে।
৩। নাগরিক অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করতে বাজেটে আবাসিক ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের জন্য প্রতি কিলোওয়াটে কমপক্ষে ২৫ হাজার টাকা (২০০ মার্কিন ডলার) সরাসরি ভর্তুকি বরাদ্দ করতে হবে। বৈষম্য দূর করতে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করার জন্য নারী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রকল্পে অতিরিক্ত ১০% ভর্তুকি দেয়া প্রয়োজন।
৪। শিল্প ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে, অবিলম্বে কর্পোরেট বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির নির্দেশিকা সক্রিয় করতে হবে এবং প্রতিযোগিতামূলক হুইলিং চার্জ চালু করতে হবে, যাতে মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে।
৫। নতুন অনুমোদিত সকল ইউটিলিটি-স্কেল সৌর প্রকল্পের সাথে ন্যূনতম ২০ শতাংশ ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম সক্ষমতা থাকা বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে গ্রিডের স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে হবে।
৬। স্থানীয় জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রতি বছর দশ লক্ষ পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে যুব উন্নয়ন, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, সমবায় অধিদপ্তর ও জনশক্তি বিভাগের উদ্যোগে নবায়নযেগা্য জ্বালানি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে হবে, যার মাধ্যমে উচ্চ-দক্ষতার কাজে বিদেশি শ্রমিকের উপর নির্ভরতা হ্রাস পাবে।
৭। দূষণকারীদের নিরুৎসাহিত করতে এবং সবুজ ব্যবসা উদ্যোগে প্রণোদনা দেয়ার জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও দুষণকারী শিল্প-কারখানার উপর প্রগতিশীল নির্গমন কর আরোপ করতে হবে।
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের মূল কারণ যতটা না জ্বালানির ঘাটতি, তার চেয়ে বেশি নীতিগত অগ্রাধিকারের সংকট। বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ, জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর ব্যয়বহুল ভবিষ্যৎ অথবা নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক স্বনির্ভর অর্থনীতি। জাতীয় বাজেটে এই বৈষম্য দূর না হলে জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জলবায়ু প্রতিশ্রুতি কোনোটিই অর্জন করা সম্ভব হবে না।