মোঃ ফারুক আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার:
দীর্ঘ আট বছর ধরে ঝুলে থাকা চার লেনের ধীরগতির নির্মাণকাজ আর যত্রতত্র অবৈধ যানের দাপট—এই দুইয়ে মিলে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিশ্বরোড মোড় থেকে আশুগঞ্জ গোলচত্বর পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার এলাকা ছিল যাত্রী ও চালকদের জন্য এক দুঃস্বপ্নের নাম। বিশেষ করে ঈদ এলেই এই অংশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থেকে পোহাতে হতো চরম ভোগান্তি। তবে এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঈদযাত্রায় চেনা সেই যানজটের চিরচেনা রূপ উধাও, মহাসড়কে মিলেছে স্বস্তির নিশ্বাস।
সরেজমিনে দেখা গেছে, এবার ঈদে ঘরমুখী মানুষ ও যানবাহনগুলো কোনো বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই এই ১২ কিলোমিটার পথ পার হয়ে যাচ্ছে। আর এই জটমুক্ত স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতির নেপথ্যে রয়েছে হাইওয়ে পুলিশের সময়োপযোগী কিছু শক্ত পদক্ষেপ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়।
নির্মাণকাজ সাময়িক স্থগিত: মহাসড়কের যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এফকনস ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের নির্মাণসামগ্রী ও তাদের ভারী যানবাহনের ওঠানামা। ঈদকে কেন্দ্র করে হাইওয়ে পুলিশের অনুরোধে সরকারি নির্দেশনায় আগামী ৩১ তারিখ পর্যন্ত এই প্রকল্পের সব ধরনের কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
মহাসড়কে যানজট সৃষ্টির অন্যতম কারণ ছিল সিএনজিচালিত অটোরিকশার এলোমেলো চলাচল। এবার হাইওয়ে পুলিশ অটোরিকশা মালিকদের সাথে বৈঠক করে তাদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা নির্ধারণ করে দিয়েছে, ফলে মূল সড়কে অবৈধ যানের বিশৃঙ্খলা অনেকটাই কমেছে।
বিশ্বরোড মোড় থেকে সিলেটমুখী সড়কের এক লেনের কাজ এরই মধ্যে শেষ হওয়ায় সেই লেনে গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক গতি পেয়েছে।
ঢাকা থেকে সিলেটগামী ‘বিলাস পরিবহন’-এর যাত্রী আলমগীর মিয়া বলেন, বিগত বছরগুলোতে এই রুটে ঈদের সময় যে জ্যাম হতো, তা ভাবলেই গা শিউরে উঠত। আজ সকালে ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে বিশ্বরোড পর্যন্ত চলে এলাম, কোথাও এক মিনিটের জন্যও থমকে দাঁড়াতে হয়নি। এবারের জার্নিটা সত্যিই অবিশ্বাস্য।
একই পথের ট্রাকচালক দুলাল মিয়া জানান, আশুগঞ্জ থেকে বিশ্বরোড পার হতেই আগে আমাদের দিনের অর্ধেক সময় পার হয়ে যেত। সড়ক সচল রাখার জন্য নির্মাণকাজের গাড়িগুলো এখন বন্ধ রাখা হয়েছে। রাস্তা ফাঁকা থাকায় আমরা খুব সহজেই পার হতে পারছি।
বিশ্বরোড মোড় এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ সাব্বির মিয়া জানান, পুলিশ এবার কঠোরভাবে হাইওয়েতে অটোরিকশা ওঠা নিয়ন্ত্রণ করছে। মোড়ে মোড়ে পুলিশের বাড়তি তদারকির কারণেই এবার রাস্তা এতটা পরিষ্কার।
বিশ্বরোড খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ আবু তাহের জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের জন্য সাধারণত এখানে জ্যাম লেগে থাকত। সরকারি নির্দেশনা মেনে ঈদ উপলক্ষে ৩১ তারিখ পর্যন্ত কাজ বন্ধ রাখায় পরিস্থিতির নাটকীয় উন্নতি হয়েছে।
এ বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশের (সিলেট রিজিয়ন) পুলিশ সুপার মোঃ রেজাউল করিম বলেন, আমরা শুধু আইন প্রয়োগ করিনি, বরং সমন্বিত ব্যবস্থা নিয়েছি। অটোরিকশা চালক ও মালিকদের সাথে কথা বলে তাদের জন্য নির্দিষ্ট পকেট বা জায়গা ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এক লেনের কাজ শেষ হওয়াতেও সুবিধা হয়েছে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবার মহাসড়ক ভোগান্তিমুক্ত রাখা সম্ভব হচ্ছে এবং আমরা আশাবাদী, ফিরতি যাত্রাও এমন স্বস্তিদায়ক হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে আশুগঞ্জ নৌবন্দর থেকে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত ৫১ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্প পাস হলেও দীর্ঘ আট বছরেও আশুগঞ্জ-বিশ্বরোড অংশের কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে উন্নয়নকাজের সেই দীর্ঘসূত্রিতার খেসারত যাতে এবার ঈদযাত্রীদের দিতে না হয়, তা নিশ্চিত করেছে হাইওয়ে পুলিশের এই বিশেষ তৎপরতা।