মোঃ ফারুক আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার:
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরাইল বিশ্বরোড বৃহস্পতিবার (২৮ মে) পবিত্র ঈদুল আজহা, উপলক্ষে মা-বাবা ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজনদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে।শেষ মুহূর্তে নাড়ির টানে তড়িঘড়ি করে ঘরে ফিরছেন লাখ লাখ মানুষ। রাজধানী ঢাকা, সিলেট, নরসিংদী ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসার একমাত্র রাস্তা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে এখন যানবাহনের চাপ। আর এই ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে মহাসড়কের আশুগঞ্জ গোলচত্বর থেকে সরাইল বিশ্বরোড মোড় পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে এক ভয়াবহ ও স্থবির যানজট। বিগত এক সপ্তাহ ধরে চলমান এই তীব্র জটলার কারণে যাত্রীসাধারণের হয়রানি, বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের লাঘবহীন কষ্ট এখন চরমে পৌঁছেছে।
ঢাকা সিলেট মহাসড়কের সরাইল কুট্টাপাড়া, বিশ্বরোড মোড় ও আশুগঞ্জ গোলচত্বর এলাকায় একই রাস্তায় যানবাহনের একাধিক দীর্ঘ ও সমান্তরাল সারি তৈরি হয়ে আছে। মহাসড়কটি এখন কার্যত এক অবরুদ্ধ জনপদে পরিণত হয়েছে। যেখানে আশুগঞ্জ থেকে সরাইল বিশ্বরোডে আসতে স্বাভাবিক সময়ে সর্বোচ্চ ২০ মিনিট প্রয়োজন, সেখানে বর্তমানে সময় লাগছে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা।
যানজটের কারণে তীব্র গরমে বাসের ভেতর আটকে থেকে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কোমলমতি শিশু, শিক্ষার্থী, বয়োবৃদ্ধ ও অ্যাম্বুলেন্সে থাকা মুমূর্ষু রোগীরা। দূরপাল্লার বাস, মাইক্রোবাস ও প্রাইভেটকার ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই স্থানে আটকে থাকায় নিরুপায় হয়ে হাজার হাজার যাত্রীকে ব্যাগ-লাগেজ মাথায় নিয়ে পায়ে হেঁটে গন্তব্যের দিকে রওনা হতে দেখা গেছে। বিভিন্ন পেশাজীবী ও চাকরিজীবীদের প্রতিদিনের স্বাভাবিক কর্মঘণ্টার কয়েক ঘণ্টা আগে ঘর থেকে বের হতে হচ্ছে।
সড়কে আটকে থাকা দূরপাল্লার বাসের চালক মহিম, মনসুর আক্ষেপ করে বলেন, সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় খানাখন্দ ও ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই সেখানে পানি জমে থাকে। এছাড়া অপরিকল্পিত ট্রাফিক সিগন্যাল ও নিয়ম না মেনে ওভারটেকিং করার প্রতিযোগিতার কারণে এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এখনই যে পরিস্থিতি, ঈদ পরবর্তী সময়ে ঢাকা ফেরার পথে এই জটলা আরও বিকট আকার ধারণ করবে। আমাদের বাধ্য হয়ে কাঁচপুর ব্রিজ দিয়ে কুমিল্লা হয়ে প্রায় ২০০ কিলোমিটার অতিরিক্ত রাস্তা ঘুরে সিলেট অঞ্চলে যেতে হচ্ছে। এতে আমাদের খরচ ও শারীরিক কষ্ট দ্বিগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
এদিকে মহাসড়কে গাড়ি যখন অত্যন্ত ধীরগতিতে চলে, তখন সক্রিয় হয়ে উঠছে স্থানীয় ছিনতাইকারী ও পকেটমার চক্র। জানালার পাশ থেকে সাধারণ যাত্রী ও পথচারীদের মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ, ভ্যানিটি ব্যাগ ও পার্স খোয়া যাওয়ার খবর নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে, যা ঈদযাত্রীদের ভোগান্তিকে আরও উসকে দিচ্ছে।
সড়ক নির্মাণ প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে আশুগঞ্জ নৌবন্দর থেকে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত ৫১ কিলোমিটার সড়ক দুই লেন থেকে চারলেনে উন্নীতকরণের লক্ষ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের অনুমোদন পায়। পরবর্তীতে নানা সমীক্ষা শেষে ২০২০ সালের মার্চ মাসে তিনটি প্যাকেজে এই ৫১ কিলোমিটার মহাসড়কের মূল কাজ শুরু করে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘এফকনস ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড’।
দুর্ভাগ্যের বিষয়, দীর্ঘ ৮ বছর পার হয়ে গেলেও নানা অহেতুক প্রতিকূলতা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চরম গাফিলতির কারণে আশুগঞ্জ নৌবন্দর থেকে বিশ্বরোড পর্যন্ত মাত্র ১২ কিলোমিটার চারলেন সড়কের কাজ আজও শেষ করতে পারেনি তারা। এই ধীরগতির খেসারত হিসেবেই প্রতিদিন আশুগঞ্জ গোলচত্বর এবং বিশ্বরোড মোড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কৃত্রিম যানজট লেগে থাকে, যার স্থায়ী কোনো সমাধান মিলছে না।
মহাসড়কের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে সরাইল খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানার ওসি আবু তাহের দেওয়ান দৈনিক এই আমার দেশকে বলেন, ঈদ উপলক্ষে গাড়ির চাপ কয়েক গুণ বেড়েছে। আমাদের তীব্র লোকবল সংকট থাকা সত্ত্বেও হাইওয়ে পুলিশের সদস্যরা দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা মহাসড়কে যানজট নিয়ন্ত্রণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ভারতীয় ঠিকাদারি কোম্পানি সময়মতো চারলেনের কাজ সম্পন্ন না করায় এবং রাস্তা খুঁড়ে রাখায় আজ সাধারণ মানুষের এই চরম ভোগান্তি।