কুমিল্লা প্রতিনিধি, মোঃ রমিজ উদ্দিন :
কুমিল্লা তিতাসে সকাল গড়াতেই বাতাকান্দি বাজারের পুরোনো বটগাছের ছায়াতলে ভেসে আসে লোহার সঙ্গে হাতুড়ির মিতালি—টুংটাং, টুংটাং শব্দ। সেই শব্দ যেন ঘোষণা দেয় এক অবিচল জীবনসংগ্রামের। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে, চুল হয়েছে শুভ্র, কিন্তু কর্মচাঞ্চল্যে ভাটা পড়েনি। জীবনের ৯৬টি বছর পার করেও আগুনের উত্তাপ আর লোহার গন্ধকে সঙ্গী করে প্রতিদিন কাজ করে চলেছেন প্রবীণ কামারশিল্পী কানু কর্মকার।
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ছালিয়াকান্দি গ্রামের বাসিন্দা কানু কর্মকার। তিনি স্বর্গীয় ক্ষেত্র কর্মকারের ছেলে এবং স্বর্গীয় আনন্দ কর্মকারের নাতি। বংশ পরম্পরায় লালিত ঐতিহ্যবাহী কামারশিল্পই তাঁর জীবনের অবলম্বন।গত বুধবার সরেজমিনে তিতাস উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বাতাকান্দি বাজারের বটতলার কামারপল্লীতে গিয়ে দেখা যায়, বয়সের ভারকে উপেক্ষা করে এখনো কর্মব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন তিনি। কেউ পুরোনো দা-ছুরি শান দিতে আসছেন, কেউ নতুন চাপাতি কিংবা বটি তৈরি করাচ্ছেন। ক্রেতাদের আনাগোনায় মুখর পুরো এলাকা।
কানু কর্মকার জানান, বাবার হাত ধরেই ১৯৬৫ সালে এ পেশায় যুক্ত হন তিনি। তার আগে দাদা আনন্দ কর্মকারও ছিলেন একজন খ্যাতিমান কামারশিল্পী। পূর্বপুরুষদের দেখানো পথ ধরেই তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের কর্মজীবন।
একসময় নিজ বাড়িতে দা, চাপাতি, ছুরি, কাঁচি, বটি ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি তৈরি করতেন। পরে সেগুলো নিয়ে কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলার সাপ্তাহিক হাটে হাটে ঘুরে বিক্রি করতেন। মঙ্গলবার রামচন্দ্রপুর, বুধবার বাতাকান্দি, বৃহস্পতিবার কোম্পানীগঞ্জ, শনিবার ইলিয়টগঞ্জ এবং রবিবার গৌরীপুরের হাট ছিল তাঁর নিয়মিত কর্মক্ষেত্র।
কালের পরিবর্তনে আর বয়সের ভারে এখন আর সেই হাটে হাটে ঘোরা সম্ভব হয় না। তাই প্রায় চার দশক ধরে বাতাকান্দি বাজারের বটতলাতেই পিঁড়ি পেতে বসে কামারশিল্পের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। বর্তমানে বড় ছেলে খোকন কর্মকার বাবার সঙ্গে একই পেশায় যুক্ত রয়েছেন।
চার সন্তানের জনক কানু কর্মকারের দুই ছেলে ও দুই মেয়েই বিবাহিত। বড় ছেলে খোকন কর্মকার বাবার পাশে থেকে কামারশিল্পকে এগিয়ে নিচ্ছেন। আর ছোট ছেলে সুমন কর্মকার প্রায় ১৬ বছর আগে জীবিকার তাগিদে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান, বর্তমানে সেখানেই কর্মরত আছেন। দুই মেয়েও স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে-শান্তিতে সংসার করছেন।
আবেগঘন কণ্ঠে কানু কর্মকার বলেন, “বাবার কাছ থেকেই এ কাজ শিখেছি। এই কাজ করেই সন্তানদের মানুষ করেছি। প্রায় ৪০ বছর ধরে বাতাকান্দি বাজারে বসে কাজ করছি। এই পেশার আয় দিয়েই সংসার চলেছে।”
তিনি আরও বলেন, “এটা শুধু একটা পেশা নয়, এটা আমাদের বাপ-দাদার ঐতিহ্য। পূর্বপুরুষদের স্মৃতি আর এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতেই আজও আগুনের পাশে বসে হাতুড়ি চালিয়ে যাচ্ছি।”
আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রনির্ভর উৎপাদনের যুগে ঐতিহ্যবাহী কামারশিল্প নানা সংকটের মুখে পড়েছে। তবুও হাল ছাড়েননি কানু কর্মকার। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও আগুনের উত্তাপে ঘাম ঝরিয়ে তিনি যেন বলে চলেছেন—ঐতিহ্য কখনো হারিয়ে যায় না, যদি কেউ তাকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করে।
বাতাকান্দি বাজারের বটতলায় আজও যখন হাতুড়ির আঘাতে লোহা রূপ নেয় প্রয়োজনীয় যন্ত্রে, তখন সেই টুংটাং শব্দের মধ্যেই জীবন্ত হয়ে ওঠে বাংলার হারিয়ে যেতে বসা এক ঐতিহ্যের গল্প; আর সেই গল্পের অন্যতম নায়ক ৯৬ বছরের প্রবীণ কারিগর কানু কর্মকার।