আলী কদর পলাশ
বাংলাদেশের আর্থিক খাতে আবারও একটি পরিচিত দৃশ্য। শীর্ষ পদে পদত্যাগ। ভাষা এক ব্যক্তিগত কারণ।
আজ ২ মার্চ সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন। একই দিনে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইডিআরএর চেয়ারম্যান এম আসলাম আলম সরে দাঁড়িয়েছেন। সাধারণ বীমা করপোরেশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারীও পদত্যাগ করেছেন। তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তি। তিনজনই ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়েছেন।
এর কয়েক দিন আগে, ২৫ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর নিয়োগ বাতিলের আগেই অফিস ছেড়েছেন। নতুন গভর্নর হয়েছেন মো. মোস্তাকুর রহমান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও বীমা খাতে ধারাবাহিক পদত্যাগ নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
ঘটনাগুলো আলাদা করে দেখলে কাকতালীয় মনে হতে পারে। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে দেখলে চিত্র ভিন্ন। গত বছরও ব্যাংক খাতে অস্থিরতা ছিল। ডেপুটি গভর্নর পর্যায়ে পরিবর্তন হয়েছে। আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটে রদবদল হয়েছে। বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে একাধিক ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদত্যাগ করেছেন। ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও উপব্যবস্থাপনা পরিচালক দায়িত্ব ছেড়েছেন। সব মিলিয়ে ডজনখানেকের বেশি এমডি বা সমমানের কর্মকর্তা সরে গেছেন।
প্রশ্ন হলো, এতগুলো উচ্চপদে থাকা ব্যক্তি কি সত্যিই একই সময়ে ব্যক্তিগত কারণে সিদ্ধান্ত নেন? নাকি ব্যক্তিগত কারণ আমাদের প্রশাসনিক অভিধানের একটি নিরাপদ শব্দ?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে নেতৃত্ব পুনর্বিন্যাস নতুন নয়। সরকার বদলালে আস্থার মানচিত্র বদলায়। বিশেষ করে আর্থিক খাতের মতো কৌশলগত ক্ষেত্রে নতুন নীতিনির্ধারকেরা নিজেদের আস্থাভাজন নেতৃত্ব চান। এতে পূর্ববর্তী নিয়োগপ্রাপ্তদের অবস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
অনেক সময় সরাসরি অপসারণের বদলে পদত্যাগই হয় সম্মানজনক সমাধান। এতে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব এড়ানো যায়। কিন্তু রাজনৈতিক সংকেত স্পষ্ট থাকে।
সোনালী ব্যাংক দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক। আইডিআরএ বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক। সাধারণ বীমা করপোরেশন রাষ্ট্রীয় বীমা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বাংলাদেশ ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই চার স্তম্ভের নেতৃত্বে স্বল্প সময়ে পরিবর্তন অর্থনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ ঘটনা নয়। এটি ক্ষমতার রসায়নের প্রতিফলন।
মূল প্রশ্ন ব্যক্তি নয়। প্রশ্ন প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠান কি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যাবে? নাকি ব্যক্তি ও সরকারের ঊর্ধ্বে টিকে থাকবে?
ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তন বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের জন্য ভালো সংকেত নয়। নীতির ধারাবাহিকতা দুর্বল হয়। সংস্কারের গতি কমে।
ব্যক্তিগত কারণ থাকতে পারে। কিন্তু যখন আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগ বাতিলের পরপরই মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, এম আসলাম আলম ও মোহাম্মদ জয়নুল বারীর মতো শীর্ষ ব্যক্তিরা সরে দাঁড়ান, তখন শব্দটির রাজনৈতিক পাঠ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
সমস্যা ব্যক্তি নয়। সমস্যা প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা। যতদিন নিয়োগ ও অপসারণ সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও সুরক্ষিত না হবে, ততদিন ‘ব্যক্তিগত কারণ’ ক্ষমতা বদলের সবচেয়ে কৌশলী ভাষ্য হিসেবেই রয়ে যাবে।