একটি কলম, একজোড়া ক্রাচ আর এক জীবনের যাত্রা
কেউ আসলে জানে না তার গল্প কোথা থেকে শুরু হয়।
আমারটা হয়তো শুরু হয়েছিল একটি বাঁশের ক্রাচ দিয়ে—
একটি ছোট শহরের সরু গলিতে,
যেখানে এক তরুণ বিশ্বাস করেছিল, তার কলমই হবে তার পা,
আর সত্যই হবে তার শক্তি।
জীবন কোনোদিনই কোমল ছিল না।
এসেছে সংগ্রাম নিয়ে, অভাব নিয়ে, ভুল বোঝাবুঝি নিয়ে—
তবুও কিছু এক অদৃশ্য শক্তি আমাকে বারবার টেনে নিয়েছে সংবাদকক্ষে।
কালির গন্ধে, মুদ্রণযন্ত্রের শব্দে,
আর মানুষের গল্প বলার অদম্য আকাঙ্ক্ষায় আমি বেঁচে থেকেছি।
আমি কখনো বড় হতে চাইনি।
চেয়েছি শুধু মানুষের কথা লিখতে—
তাদের কষ্ট, তাদের হাসি, তাদের স্বপ্ন।
কারণ আমি বিশ্বাস করি—
মানুষই পারে মানুষকে বাঁচাতে।
ভালোবাসা ছাড়া সত্যও টেকে না, বিশ্বাসও নয়, সাহিত্যও নয়।
এই বইটি খ্যাতি বা সাফল্যের নয়,
এটি এক মানুষ, এক সম্পাদক আর অর্থ খোঁজার এক জীবনের গল্প।
এর পাতায় আছে ১৯৯১ সালের প্রথম ছাপার গন্ধ,
যেদিন দৈনিক মাথাভাঙ্গা প্রথম আলোর মুখ দেখেছিল;
আছে দৈনিক ঝিনাইদহ-এর সাহস,
দৈনিক অধিবেশন-এর কারাবন্দি স্মৃতি,
আর দৈনিক এই আমার দেশ-এর অদম্য পরিশ্রম।
আজ যখন কলম ধরি আর ক্রাচে ভর দিই, দুর্বল লাগে না—
মনে হয় শুধু কৃতজ্ঞতা।
জীবন আমার কাছে শুধু সংগ্রাম নয়,
এটি এক বিশ্বাসের, এক ভালোবাসার গল্প—
যেখানে শব্দই আমার বেঁচে থাকার শক্তি।
“এক পায়ে দাঁড়িয়ে — একজন সম্পাদক” আত্মপ্রশংসা নয়,
এটি এক ধরনের জবাবদিহি।
একটি স্বীকারোক্তি—
যে দুর্নীতি, উগ্রতা আর বিভ্রান্তির এই যুগেও
একটি সৎ শব্দ, একটি সত্য গল্প
আর একটি মানবিক হৃদয়
এখনও পৃথিবী বদলে দিতে পারে।
একদিন আমার হাত থেমে যাবে।
কিন্তু তার আগে আমি রেখে যেতে চাই একটুখানি আলোর দাগ—
পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক স্মারক,
যাতে তারা আবার সাহস নিয়ে লিখতে পারে,
কারণ ছাড়া আবার ভালোবাসতে পারে,
আর সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে পারে—
যদি লাগে, এক পায়ে ভর দিয়েই হোক।
আলী কদর পলাশ
সম্পাদক ও প্রকাশক
দৈনিক এই আমার দেশ
দ্য বিজনেস ইন ম্যাগাজিন
প্রধান সম্পাদক
দৈনিক গড়ব বাংলাদেশ
দৈনিক মুখপাত্র
ফুটনোট
(বাংলা ও ইংরেজি দ্বিভাষিক সংস্করণের জন্য প্রযোজ্য)
এই গ্রন্থ আমার জীবনের পথচলা, সাংবাদিকতার সংগ্রাম, সম্পাদনার নীতি ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার এক ব্যক্তিগত আখ্যান। এখানে যে প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি অনুচ্ছেদ সংরক্ষিত রয়েছে—তা শুধুই কোনো পেশাগত বিবরণ নয়; এটি আমার হৃদয়ের ভাষা, স্বপ্নের ছায়া, আর জীবনের গভীর অভিজ্ঞতার সংকলন।
বাংলা ও ইংরেজি—উভয় ভাষায় বইটি প্রকাশিত হবে, যেন দুই প্রজন্মের পাঠক দুই ভাষায় একই অনুভবের কাছে পৌঁছে যেতে পারেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিক পত্রিকার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত আমার লেখা ও অভিজ্ঞতাগুলোও এখানে ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষিত থাকছে, ভবিষ্যৎ পাঠকের জন্য একটি বিশ্বস্ত আর্কাইভ রূপে।
জীবনের অগাধ ব্যস্ততার মাঝে—হার্ট, কিডনি, রিউম্যাটোলজি আর্থ্রাইটিসের ক্রমাগত চ্যালেঞ্জ বয়ে নিয়েও—আমি চেষ্টা করেছি এই বইটিকে সত্য, স্বপ্ন ও আত্মবিশ্বাসের ভাষায় পূর্ণ করতে।
আমার এই সীমাহীন ব্যস্ততা ও শারীরিক যন্ত্রণা কোনোদিন কলম থামাতে পারেনি; বরং প্রতিটা যন্ত্রণা আমাকে আরও দৃঢ় করেছে, আরও অনুভব–সমৃদ্ধ করেছে।
এই বই আমার কাছে কেবল স্মৃতির সংকলন নয়;
এটি আমার জীবনকে নতুনভাবে বলার সাহস,
নিজেকে ফিরে দেখার আয়না,
আর আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার এক উত্তরাধিকার।
তবে এই লেখা এখনো সম্পাদিত নয়, যখন যতটুুকু স্মৃতি মনে আসে তা লিখে রাখা।
অধ্যায় এক ঃ দৈনিক মাথাভাঙ্গা
(চুয়াডাঙ্গার প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র)
১৯৯১ সালের ১০ই জুন—
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বাজেট পাসের দিন,
চুয়াডাঙ্গার ইতিহাসে সূচিত হয় এক নতুন অধ্যায়।
সেদিনই প্রকাশিত হয় প্রথম দৈনিক পত্রিকা—
দৈনিক মাথাভাঙ্গা।
একটি ছোট শহরে, সীমিত সামর্থ্য ও অক্লান্ত স্বপ্ন নিয়ে
একদল তরুণ সংবাদপাগল মানুষ গড়ে তুলেছিলেন এই পত্রিকা।
প্রকাশনার অনুষ্ঠান হয় শ্রীমন্ত টাউন হলে,
যেখানে উপস্থিত ছিলেন Voice of America-এর তৎকালীন সংবাদদাতা
এবং বাসস-এর বিশেষ প্রতিনিধি গিয়াস কামাল চৌধুরী।
প্রথম সম্পাদক হিসেবে আমাদের পছন্দ ছিলেন
চুয়াডাঙ্গা পৌর কলেজের অধ্যক্ষ হামিদুল হক মুন্সী।
কিন্তু সরকারি চাকরিজীবী হওয়ায় আইনি বাধায়
তাকে সম্পাদক হিসেবে রাখা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে উপজেলা চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম পিনু
পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
আমি, আলী কদর পলাশ,
তখন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে পুরো সম্পাদনা বিভাগের নেতৃত্বে ছিলাম।
জেলা প্রশাসন ও আইনানুগ প্রক্রিয়ায়
প্রকাশক হিসেবে দায়িত্ব নেন সরদার আল আমিন।
আমার জীবন তখন টিউশনির আয়ে চলত,
তবুও মনের অদম্য জেদ ও ভালোবাসায়
সৃষ্টি হয় চুয়াডাঙ্গার প্রথম দৈনিক।
পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন রিচার্ড রহমান (অকাল প্রয়াত),
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মাহবুবুর রহমান পাঞ্জু, (ইটালী প্রবাসী)
বার্তা সম্পাদক রাজিব আহমেদ (বর্তমানে দেশের শীর্ষ মোটিভেশনাল ট্রেইনার ও ইতিহাস গবেষক এবং বহুগ্রন্থ প্রণেতা),
মফস্বল সম্পাদক জাহিদ ইসলাম (বর্তমানে একটি রিসো নামের একটি এনজিও প্রধান)
আর সংবাদকক্ষে কর্মরত ছিলেন রাজিব হাসান কচি (বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাব সভাপতি ও দৈনিক খাবখবর পত্রিকার প্রধান সম্পাদক।
আদিল হোসেন, আহমেদ শরীফ মিম, ও সেলিম হোসেন।
প্রতিদিনের রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ও রম্য ছড়া “টিপ্পনী” লিখতেন
আহাদ আলী মোল্লা। সেই প্রথম দিন থেকে এখনো লিখে চলেছেন।
এই নামটি আমি নির্বাচন করেছিলাম পাবনার “দেশব্রতি” পত্রিকার
“টিপ্পনী” ছড়া গ্রন্থের অনুপ্রেরণায়।
পত্রিকার প্রতিটি পাতায় ছিল একদল তরুণের পরিশ্রম,
রাতভর জেগে কাজ করার উদ্যম,
আর সংবাদকে ভালোবাসার অদ্ভুত পাগলামি।
প্রকাশনার ছয় মাসের মাথায়
হঠাৎ করেই পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে থাকে।
প্রকাশক সরদার আল আমিন অফিস স্থানান্তর করেন প্রেসে—
রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন,
আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ পত্রিকার গতি মন্থর করে দেয়।
আমি মনের কষ্টে পদত্যাগ করি,
আমার সঙ্গে অনেকেই পদত্যাগ করেন—।
কিছুদিন পত্রিকা অনিয়মিত থাকলেও
পরবর্তীতে নতুন উদ্যমে পুনরায় প্রকাশ শুরু হয়।
আজ দৈনিক মাথাভাঙ্গা চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ অঞ্চলের
একটি জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী পত্রিকা।
এর বর্তমান সম্পাদক ও প্রকাশক সরদার আল আমিন,
যিনি অক্লান্ত পরিশ্রমে এই পত্রিকাটিকে
আঞ্চলিক সাংবাদিকতার এক অনন্য উদাহরণে পরিণত করেছেন।
আমার হাতে শুরু হওয়া এই যাত্রা
এখন নতুন প্রজন্মের হাতে পরিপূর্ণতা পেয়েছে।
সেই জন্যই আমি বলি —
“প্রতিটি সংবাদপত্র কেবল মুদ্রিত শব্দ নয়,
এটি একদল মানুষের ভালোবাসা,
একজন সম্পাদকের স্বপ্নের প্রতিধ্বনি।”
অধ্যায় দুই ঃ দৈনিক এই আমার দেশ
নতুন করে যাত্রা শুরু
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে চুয়াডাঙ্গার এক তরুণ সম্পাদক স্বপ্ন দেখেছিলেন—
একটি পত্রিকা গড়ে তুলবেন, যে পত্রিকা ক্ষমতার নয়, মানুষের হয়ে কথা বলবে।
সেই স্বপ্ন থেকেই জন্ম নেয় দৈনিক এই আমার দেশ।
১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে চুয়াডাঙ্গা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পত্রিকাটির ডিক্লারেশন অনুমোদন করেন,
এবং ১৯৯২ সালের ১ জানুয়ারি প্রকাশিত হয় প্রথম সংখ্যা।
তখন এটি ছিল সাপ্তাহিক পত্রিকা,
ঢাকার আধুনিক প্রেসে ছাপা হতো—যা সে সময় মফস্বল সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক বিস্ময়কর পদক্ষেপ।
পরবর্তীতে ২০১৭ সালে, এই আমার দেশ রূপান্তরিত হয় দৈনিকে,
যার আলাদা সংস্করণ প্রকাশিত হতে থাকে ঢাকা, চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ থেকে।
প্রতিষ্ঠাকালীন পর্যায়ে দুইজন স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন—
আমি আলী কদর পলাশ, প্রকাশক হিসেবে,
এবং কাজল মাহমুদ, সম্পাদক হিসেবে।
পরবর্তীতে কাজল মাহমুদ চাকরির সূত্রে দায়িত্ব ছেড়ে দিলে
আমি নিজেই সম্পাদকের গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করি যা আজো বয়ে চলেছি—
জীবনের বাকি পথটা উৎসর্গ করেছি সাংবাদিকতার প্রতি।
শুরুর দিকেই পত্রিকাটির পাশে দাঁড়ান অনেক জ্ঞানী ও গুণী মানুষ।
তাদের মধ্যে ছিলেন সরদার আলী হোসেন ও ইকবাল আতাহার তাজ,
যারা চুয়াডাঙ্গা সংস্করণের উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতির দায়িত্বে আসেন
জনাব আব্দুল হাই, এমপি—
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের পাঁচবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য,
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী,
এবং ঝিনাইদহে প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী মুক্তিযোদ্ধা।
তার দূরদৃষ্টি, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও মানবিক নেতৃত্ব
পত্রিকার চিন্তা ও চরিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করে।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে ব্যারিস্টার জিসান হাই দায়িত্বগ্রহণ করে
আমাকে কিছুটা অবসর দেয়।
প্রথম থেকেই এই আমার দেশ পাঠকের ভালোবাসায় ঘেরা ছিল।
চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, যশোর ও মাগুরা জেলায়
এটি সাধারণ মানুষের মুখপত্র হয়ে ওঠে,
ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্য অঙ্গনেও পায় বিশেষ স্বীকৃতি।
খুলনা বিভাগের প্রথম রঙিন ও আধুনিক দৈনিক হিসেবে
এই আমার দেশ প্রযুক্তি ও সাহসী সাংবাদিকতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিটি শিরোনামের পেছনে ছিল একদল নিরলস সহকর্মীর ঘাম ও স্বপ্ন,
যারা বিশ্বাস করতেন—
সংবাদ কেবল তথ্য নয়, এটি মানুষের প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতা।
আজও এই আমার দেশ বহন করছে সেই অঙ্গীকার—
সত্যের, ন্যায়ের, আর মানবিকতার অঙ্গীকার।
অধ্যায় ৩ ঃ দৈনিক ঝিনাইদহ
একটি জেলার প্রথম দৈনিক, এক সম্পাদকের সাহসী সূচনা
বাংলা ১৪০০ সালের পহেলা বৈশাখ (ইংরেজি ১৪ এপ্রিল, ১৯৯৩)
ঝিনাইদহ শহরের সংবাদপত্র ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন।
সেই দিনেই প্রকাশিত হয় দৈনিক ঝিনাইদহ—
জেলার প্রথম দৈনিক পত্রিকা,
যার প্রতিষ্ঠাতা, প্রধান সম্পাদক, প্রকাশক ও মালিক ছিলেন
আলী কদর পলাশ।
পত্রিকার আনুষ্ঠানিক প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়
ঝিনাইদহ পৌর অডিটোরিয়ামে,
যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন
তৎকালীন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি, জনাব আব্দুর রহিম খান, পিপিএম।
তিনি পূর্বে চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, সিলেট ও মাগুরায়
পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
চুয়াডাঙ্গা কর্মকালীন সময়ে আমার সঙ্গে
তার গভীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও স্নেহের বন্ধন গড়ে ওঠে।
তিনি নিজে বলেছিলেন—
“তোমার পরবর্তী পত্রিকার সঙ্গে আমি থাকব, অতীতের মতোই।”
তার সেই কথা রাখতেই তিনি
দৈনিক ঝিনাইদহের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে
আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বন্ধুর মতো, অভিভাবকের মতো।
আমার সাংবাদিকতা জীবনের এক বিশাল অনুপ্রেরণা ছিলেন তিনি।
প্রেরণার পেছনে যাদের অবদান
দৈনিক ঝিনাইদহের সূচনায়
আমার সহযোদ্ধাদের অবদান অবিস্মরণীয়।
বিশেষ করে আমার স্কুল বন্ধু
মনজুরুল ইসলাম জোয়ারদার,
যিনি তখন তরুণ ব্যবসায়ী ছিলেন—
তিনি পত্রিকা প্রকাশনার জন্য
৮০,০০০ টাকা অর্থ সহায়তা এবং একটি জিপ গাড়ি দিয়েছিলেন।
তার সেই সহায়তা আজও আমার জীবনের এক গভীর কৃতজ্ঞতার স্মৃতি। যদিও তার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী,
তবুও তার নাম উচ্চারণ করলেই মনে ভরে যায় এক অনন্ত বন্ধুত্বের উষ্ণতায়।
পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন
অধ্যক্ষ আমিনুর রহমান টুকু,
একজন শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবক।
তার দায়িত্বশীলতা ও নেতৃত্বে
দৈনিক ঝিনাইদহ খুব দ্রুত মানুষের আস্থা অর্জন করে।
পত্রিকার নীতি ছিল সরল—
“সত্য বলো, নির্ভীক হও, মানুষের পক্ষে থাকো।”
সংবাদকর্মীরা ছিলেন তরুণ, উদ্যমী,
অনেকে তখন প্রথমবার কলম ধরেছিলেন।
তবুও তাদের নিষ্ঠা ও ভালোবাসা
পত্রিকাটিকে খুব অল্প সময়েই জনপ্রিয় করে তোলে।
অধ্যায় ৪ : দৈনিক অধিবেশন
এক সাহসী কণ্ঠের জন্ম, এক মরমি কবির জন্মদিনে
বাংলা বর্ষপঞ্জির ৮ই মার্চ, মরমী কবি পাগলা কানাই–এর জন্মবার্ষিকীর দিনেই
প্রকাশিত হয় ঝিনাইদহ জেলার প্রথম আধুনিক দৈনিক পত্রিকা — দৈনিক অধিবেশন।
দিনটি শুধু এক পত্রিকার সূচনাই নয়, বরং এক নতুন চিন্তার, এক সাহসী সাংবাদিকতার সূচনা ছিল।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় ঝিনাইদহ পৌরসভা অডিটোরিয়ামে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী, সাবেক গভর্নর ও লেখক অধ্যাপক আবু সায়ীদ।
তার উপস্থিতি পত্রিকার প্রথম দিনটিকে করে তোলে ঐতিহাসিক ও গৌরবময়।
সেদিন সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী, রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীদের সমাবেশে
ঝিনাইদহের আকাশে এক নতুন কণ্ঠের জন্ম হয় — এক সাহসী সংবাদকণ্ঠ।
পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন প্রবীণ সাংবাদিক ও ঝিনাইদহ পৌরসভার সাবেক মেয়র এস. এম. আনিসুর রহমান খোকা।
অভিজ্ঞ সাংবাদিক হিসেবে তার নেতৃত্বে পত্রিকার ভাষা, বয়ান ও দৃষ্টিভঙ্গি পায় মানবিক গভীরতা।
আর আমি, আলী কদর পলাশ, ছিলাম পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক —
সম্পাদনা নীতি, সংবাদ কাঠামো ও আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রয়োগে নেতৃত্ব দিয়েছি এক তরুণ কিন্তু নিষ্ঠাবান টিমকে।
দৈনিক অধিবেশন ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রথম পূর্ণাঙ্গ কম্পিউটারাইজড পত্রিকা।
সেই সময়ে সংবাদ সম্পাদনা, পেজ মেকআপ, এমনকি তথ্যভিত্তিক রিপোর্টিংও ছিল একদম নতুন অভিজ্ঞতা।
আমাদের উদ্দেশ্য ছিল একটাই —
প্রমাণ করা যে রাজধানীর বাইরেও বিশ্বমানের সাংবাদিকতা সম্ভব, যদি আন্তরিকতা ও সাহস থাকে। আমার সকল কাজে সার্বক্ষণিক অর্থ, মেধা ও শ্রম দিয়ে আমাকে ঋণী ও ঋদ্ধ করে দিল আফরোজ পারমিতা টিউলিপ।
পত্রিকার উপদেষ্টা ও শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে ছিলেন অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব —
নূরে আলম সিদ্দিকী, ১৯৭১ সালের সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ও কিংবদন্তি ছাত্রনেতা, স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক, বিশিস্ট শিল্পপতি এবং সাবেক এমপি;
অ্যাডভোকেট কালি কিংকর মন্টু, তৎকালীন ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবের সভাপতি;
মোশাররফ হোসেন মশা, ঝিনাইদহের প্রাক্তন মেয়র;
অ্যাডভোকেট এনামুল হক নিলু, তিনবার নির্বাচিত হলিধানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান;
বিমল কুমার সাহা, দৈনিক ইত্তেফাক-এর প্রতিনিধি;
এবং তরুণ সাংবাদিকদের এক নিবেদিতপ্রাণ দল, যারা সত্যের পক্ষে কলম ধরেছিল।
আর অর্থ, নিরলস শ্রম এবং আমার পূর্ণ সেবায় যার অবদান আমি কৃতজ্ঞ চিত্তে মনে রেখেছি, রাখবো- রাখতে হয় তাকে দিল আফরোজ পারমিতা টিউলিপকে।
খুব অল্প সময়েই দৈনিক অধিবেশন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
সত্যনিষ্ঠ প্রতিবেদন, পরিচ্ছন্ন মেকআপ, আর তীক্ষ্ণ সম্পাদকীয় লেখার জন্য পাঠকদের আস্থা পায় দ্রুত।
কিন্তু সত্য উচ্চারণের মূল্য যে কতটা কঠিন, সেটি বুঝেছিলাম খুব শিগগিরই।
২০০২ সালে, একের পর এক রাজনৈতিক ও মৌলবাদবিরোধী সম্পাদকীয় প্রকাশের পর
তৎকালীন সরকার পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করে।
আমাকে এবং পারমিতাকে গ্রেপ্তার করা হয় একাধিক দমনমূলক আইনে।
সেদিন মনে হয়েছিল সত্য বলা মানেই কারাগারের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, দেশের প্রতিটি জেলা থেকে সাংবাদিক সমাজ প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠল।
আমার সেই বন্দিত্ব কেবল ব্যক্তিগত নয় — ছিল সংবাদপত্রের স্বাধীনতার এক প্রতীকী লড়াই।
আজও যখন দৈনিক অধিবেশন-এর নাম উচ্চারণ করি, মনে হয় যেন কলমে আগুন জ্বলে ওঠে।
মনে পড়ে এস. এম. আনিসুর রহমান খোকার হাসি, যিনি প্রথম দিনের সংবাদশিরোনামে নিজের অভিজ্ঞতা ঢেলে দিয়েছিলেন।
মনে পড়ে সেই তরুণ দলটির কথা, যারা দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রমে এক ইতিহাস রচনা করেছিল।
দৈনিক অধিবেশন আজও বেঁচে আছে — কাগজে নয়,
মানুষের স্মৃতিতে, সংগ্রামে, আর এক সম্পাদকীয় নীতিতে —
সত্যকে ভালোবেসে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরার অঙ্গীকারে।
দৈনিক অধিবেশন এবং পূর্বাপর কিছু ঘটনা-
অধ্যায় ৫ : দৈনিক মুক্তকণ্ঠ
(বাংলাদেশের প্রথম রঙিন ও সর্বাধুনিক বাংলা দৈনিক)
দৈনিক মুক্তকণ্ঠ বাংলাদেশের সংবাদপত্র ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। এটি ছিল দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ রঙিন বাংলা দৈনিক, যার প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও আর্থিক বিনিয়োগ ছিল অনন্য।
বেক্সিমকো গ্রুপ ছিল পত্রিকার মালিকানা সংস্থা। প্রকাশনার দায়িত্বে ছিলেন গ্রুপের অন্যতম পরিচালকগণ। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন প্রবীণ সাংবাদিক ও কলামিস্ট কে. জি. মুস্তফা, যিনি ছিলেন দেশবরেণ্য লেখক, ভাষা সৈনিক ও স্বাধীনতা-পরবর্তী সাংবাদিকতার এক উজ্জ্বল নাম।
মুক্তকণ্ঠ শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, বিষয়বস্তুর দিক থেকেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এতে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সংবাদপত্রে রঙিন ফটো জার্নালিজম চালু হয়—যা তখনকার সাংবাদিক সমাজে বিপ্লব ঘটায়। পত্রিকাটি রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক খবরের পাশাপাশি উন্নয়ন সাংবাদিকতায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়।
পত্রিকার আর্থিক পৃষ্ঠপোষক ছিল বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসসহ গ্রুপের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, যা তখনকার সংবাদমাধ্যমে কর্পোরেট জগতের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার সূচনা হিসেবে দেখা হয়।
৯০ দশকের শেষভাগে, অর্থাৎ প্রায় ১৯৯৮-৯৯ সালের দিকে, পত্রিকাটি ব্যাপকভাবে প্রচার লাভ করে। এর সম্পাদনা নীতিতে ছিল স্বাধীনতা ও মানবিক সাংবাদিকতার মিশ্রণ। তবে নানা আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ২০০৬ সালে মুক্তকণ্ঠের প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়।
পত্রিকাটির অনেক সাংবাদিক ও কলাম লেখক পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তকণ্ঠের সাফল্য ও শিক্ষণ বাংলাদেশের আধুনিক সংবাদপত্র ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছে।
অধ্যায় ৬ : দৈনিক মানবকণ্ঠ
প্রধান সম্পাদকের চেয়ারে—এক নতুন অভিজ্ঞতার শুরু
দৈনিক মানবকণ্ঠ আমার সাংবাদিকতা জীবনের এক বিশেষ অধ্যায়—একটি সময়, যখন আমি শুধু একজন সম্পাদক নই, বরং একটি বৃহৎ টিমের অধিনায়ক।
এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হওয়া মানে ছিল এক নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা।
মানবকণ্ঠ মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রয়াত মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের পরিবার, অর্থাৎ জাতীয় নেতা ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী-এর পরিবারের প্রতিষ্ঠিত পত্রিকা।
ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী।
তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র মোহাম্মদ রেজা ছিলেন মানবকণ্ঠের প্রথম সম্পাদক।
পত্রিকাটি শুরু থেকেই মানবতার কণ্ঠস্বর—এই স্লোগানে পরিচালিত হয়।
আমি প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করি এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশের সংবাদপত্র শিল্প পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।
অনলাইন সংস্করণ, দ্রুত সংবাদ প্রবাহ, ডিজিটাল নিউজরুম—সবকিছুতেই তখন নবযুগের সূচনা।
আমি চেয়েছিলাম মানবকণ্ঠকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে যেতে, যেখানে সংবাদ শুধু তথ্য নয়, একটি মূল্যবোধও প্রকাশ করবে।
পত্রিকার নীতি ছিল পরিষ্কার—
“মানুষের পক্ষে, সত্যের পক্ষে।”
আমরা চেষ্টা করেছি প্রতিটি সংখ্যায় সেই দর্শনকে বাঁচিয়ে রাখতে।
সাংবাদিকতার সঙ্গে ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতা, দলমত নির্বিশেষে মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণ—এই তিন লক্ষ্য নিয়েই আমি সম্পাদকীয় নেতৃত্ব শুরু করি।
মানবকণ্ঠের পাঠকসমাজ ছিল দেশের প্রান্তিক থেকে রাজধানী পর্যন্ত বিস্তৃত।
আমাদের প্রতিবেদক ও ফটোজার্নালিস্টরা দেশের বিভিন্ন জেলায় মানবিক গল্প সংগ্রহ করতেন—
গরিব কৃষকের জীবনের হাসি, মুক্তিযোদ্ধার সংগ্রাম, কিংবা শহুরে তরুণের স্বপ্ন—সবই প্রতিফলিত হতো প্রতিদিনের পাতায়।
পরবর্তীতে পত্রিকার মালিকানা পরিবর্তন হয় এবং এটি আশিয়ান গ্রুপ-এর অধীনে পুনরায় প্রকাশিত হয়।
তবে আমি গর্বিত—মানবকণ্ঠের পুনর্জন্মেও রয়ে গেছে সেই দর্শন, যে দর্শন থেকে তার সূচনা হয়েছিল।
মানবকণ্ঠ আমাকে শিখিয়েছিল নেতৃত্বের সাহস, দায়িত্বের ভার, এবং সাংবাদিকতার আভিজাত্যের আড়ালে মানবতার সত্যিকারের মানে।
অধ্যায় ৭ : দৈনিক গড়ব বাংলাদেশ
নতুন প্রজন্মের ভাবনা ও আধুনিক সাংবাদিকতার সমন্বয়ে এক নতুন অধ্যায়
দৈনিক গড়ব বাংলাদেশ আমার সম্পাদকীয় জীবনের আধুনিকতম অধ্যায় — যেখানে সাংবাদিকতা, প্রযুক্তি ও কর্পোরেট দায়বদ্ধতা একসূত্রে গাঁথা।
আমি ২০২১ সাল থেকে এই পত্রিকার প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি এবং অদ্যাবধি সেই দায়িত্বে আছি।
পত্রিকাটি পরিচালিত হয় বাংলাদেশের স্বনামধন্য ইলেকট্রনিকস ব্র্যান্ড মিনিস্টার মাইওয়ান গ্রুপ-এর অর্থায়নে।
কোম্পানির চেয়ারম্যান এম. এ. রাজ্জাক খান পত্রিকার প্রকাশক ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দৈনিকটির নির্বাহী সম্পাদক এম. হুসাইন আহমেদ এবং সহকারী সম্পাদক নুরুন্নবী সোহেল—তাদের নিরলস পরিশ্রম ও নিষ্ঠায় পত্রিকাটি আজ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
২০১৬ সালে দৈনিক গড়ব বাংলাদেশ-এর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়।
পত্রিকাটির মূল দর্শন—
> “একসাথে গড়ব দেশ
এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করেই আমি সম্পাদকীয় দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন বিভাগ ও কনটেন্ট কাঠামো প্রবর্তন করি—
গভর্ন্যান্স, অর্থনীতি, নাগরিক সাংবাদিকতা, ও গবেষণাভিত্তিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলোর উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আমরা চেষ্টা করেছি পত্রিকার প্রতিটি পাতায় দেশের বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা একসঙ্গে তুলে ধরতে।
সরকার, সমাজ ও নাগরিকের মধ্যকার সম্পর্ককে সাংবাদিকতার আলোয় ব্যাখ্যা করাই ছিল আমাদের লক্ষ্য।
আজ দৈনিক গড়ব বাংলাদেশ একটি আধুনিক, গতিশীল ও মূল্যবোধনিষ্ঠ জাতীয় দৈনিকে পরিণত হয়েছে —
যেখানে সংবাদ কেবল তথ্য নয়, বরং দায়িত্ব, চিন্তা ও আশার প্রতীক।
আমার কাছে এই পত্রিকাটি কেবল একটি সম্পাদকীয় দায়িত্ব নয়; এটি এক বিশ্বাস—
যে সাংবাদিকতা সৎ, মানবিক ও দূরদর্শী, সেই সাংবাদিকতাই পারে জাতিকে গড়তে।
অধ্যায় ৮ : দি বিজনেস ইন ম্যাগাজিন
শেষ নয়, এক নতুন শুরু
দীর্ঘ চার দশকের সাংবাদিকতা জীবনে আমি দেখেছি—
দেশ বদলেছে, সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু সত্য বলার সাহসের প্রয়োজন কখনো বদলায়নি।
এবার আমি প্রবেশ করলাম এক নতুন যাত্রায়—
যেখানে সংবাদ কেবল তথ্য নয়, ভাবনা ও নেতৃত্বের দিকনির্দেশ।
এই যাত্রার নাম— “The Business in Magazine”।
এটি শুধু একটি প্রকাশনা নয়, বরং আমার সমগ্র অভিজ্ঞতার পুনর্জন্ম—
একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম যেখানে ব্যবসা, উদ্ভাবন ও মানবিক নেতৃত্ব মিলেমিশে এক হয়েছে।
পত্রিকাটি প্রকাশিত হচ্ছে দৈনিক এই আমার দেশ–এর উদ্যোগে,
আর আমি নিজে এর সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।
দৈনিক মুখপাত্র : ইতিহাস, উত্তরাধিকার ও আমার সম্পৃক্ততা
Daily Mukhaptra – a publication of Diamond World
ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় আগে ঢাকায় আত্মপ্রকাশ করেছিল জাতীয় দৈনিক দৈনিক মুখপাত্র। সৎ, নির্ভীক ও মানুষের পক্ষে থাকা সাংবাদিকতার যে স্বপ্ন, মুখপাত্র ছিল তারই বাস্তব প্রতিফলন। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে দীর্ঘ সময় ধরে সাংবাদিক জামাল প্রকাশক ও সম্পাদক হিসেবে এই পত্রিকাটিকে সামনে এগিয়ে নিয়েছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণতন্ত্রের পালাবদল, রাষ্ট্রপরিচালনার ওঠানামা—সব প্রতিকূলতার মাঝেও তাঁর সম্পাদনা–দর্শন ছিল অটল ও সুস্পষ্ট: নিরপেক্ষতা, সাহস এবং কঠোরভাবে তথ্যনিষ্ঠ থাকা।
জামালের শ্রম ও সংগ্রামের হাত ধরে মুখপাত্র ধীরে ধীরে একটি পরিণত জাতীয় দৈনিকে রূপ নেয়। দেশজুড়ে গড়ে ওঠে নিজস্ব সংবাদদাতা নেটওয়ার্ক; রাজধানী থেকে প্রান্তিক জনপদ—সব জায়গার খবরকে এক স্রোতে মিলিয়ে পত্রিকাটি হয়ে ওঠে পাঠকমহলের আস্থার একটি নির্ভরযোগ্য ঠিকানা।
১ নভেম্বর ২০১৭—দৈনিক মুখপাত্রের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনাদিবস।
এই দিনেই পত্রিকাটি আনুষ্ঠানিকভাবে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড–এর মালিকানায় আসে। ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান দিলীপ কুমার আগরওয়ালা সম্পাদক ও প্রকাশকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই দিন ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের অধীনে মুখপাত্রের প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়—যেন পুরোনো গাছের শেকড় অটুট রেখে নতুন সবুজ পাতা মেলায়ার মতো এক নবযাত্রা।
এই নতুন অধ্যায়ের সূচনা মুহূর্ত থেকেই আমি প্রধান সম্পাদক ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করি। জাতীয় ও আঞ্চলিক সাংবাদিকতার দীর্ঘ পথচলা, মাঠ–রিপোর্টিংয়ের অভিজ্ঞতা এবং নীতিনিষ্ঠ সম্পাদনা–দর্শনকে সঙ্গে নিয়ে মুখপাত্রকে নতুন কাঠামো, আধুনিক উপস্থাপনা ও ডিজিটাল যুগের চাহিদা–সম্মত এক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করি।
আজ Daily Mukhaptra – a publication of Diamond World তথ্যনির্ভর, নিরপেক্ষ ও পাঠক–মুখী সাংবাদিকতার এক স্থায়ী ও স্বীকৃত ঠিকানা।
জামালের সংগ্রামী সূচনা–পর্ব এবং ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের করপোরেট শক্তি—এই দুই ধারার মিলনে আজকের মুখপাত্র তার পূর্ণতা পেয়েছে। আর আমি দাঁড়িয়ে আছি সেই সেতুবন্ধনের ঠিক মধ্যমণিতে—অতীতের উত্তরাধিকার ও বর্তমানের দায়িত্ব সমানভাবে বয়ে নিয়ে।
চুয়াডাঙ্গা, দু’টি পরিবার, দু’টি ধর্ম—
আর আমাদের বন্ধুত্বের গল্প
আমি, দিলীপ কুমার আগরওয়ালা এবং দৈনিক মুখপাত্র
দৈনিক মুখপাত্রের বর্তমান রূপ বুঝতে গেলে আমার সঙ্গে দিলীপ কুমার আগরওয়ালা–র সম্পর্কের কথাও বলতে হয়। কারণ এই পত্রিকার গল্প শুধু কাগজের পরিসংখ্যান বা অফিসিয়াল কাগজপত্রে সীমাবদ্ধ নয়—এটি আমাদের ব্যক্তিজীবনের গভীর মানবিক ইতিহাসের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
আমরা দু’জনই চুয়াডাঙ্গার সন্তান। ছোটবেলায় ছিলাম প্রতিবেশী—এতটাই কাছের যে এক বাড়ির হাসি–কান্না, উৎসবের আলো, ধূপের গন্ধ আর রান্নার সুগন্ধ অনায়াসে চলে যেত অন্য বাড়িতে।
দু’টি ভিন্ন ধর্মের মানুষ হয়েও আমাদের পরিবারের সম্পর্ক ছিল হৃদয়ের বন্ধনে বাঁধা—অবিচ্ছেদ্য, অকৃত্রিম।
আমার মায়ের সঙ্গে দিলীপের বাবার সম্পর্ক ছিল প্রায় রক্তের আত্মীয়তার সমান ঘনিষ্ঠ—মমতা, আদর, শ্রদ্ধা আর মানুষের মতো মানুষ হয়ে ওঠার এক নীরব, জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা ছিল এই সম্পর্কের ভিতরে।
প্রতি কালীপূজায় আমি যেতাম তাদের বাড়ি। প্রদীপের সারি, ঘণ্টাধ্বনি, ভক্তদের ভিড়, আর অতিথি আপ্যায়নের ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে সেই ঘরটি ধীরে ধীরে আমার জীবনেও এক পরিচিত আশ্রয়ে পরিণত হয়। কখনও মনে হয়নি আমি “ভিন্ন” কোনো ঘরের মানুষ; মনে হয়েছে আমরা সবাই এক–একটি পরিবার, কেবল ধর্মের পথ আলাদা, গন্তব্যের মানবিকতা একই।
দিলীপ বয়সে আমার ছোট; কিন্তু আমাদের সম্পর্কের পরিমাপ কখনও বয়স দিয়ে করা যায়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে হয়ে উঠেছে আমার বন্ধু, সহযাত্রী ও পরামর্শদাতা। Diamond World প্রতিষ্ঠা ও বিস্তারের পথে আমি দেখেছি তার পরিশ্রম, সততা ও দূরদর্শিতা—কীভাবে স্বপ্নকে ব্যবসায়িক বাস্তবতায় রূপ দেয়, আর সেই বাস্তবতাকে আবার মানবিক স্পর্শে নরম করে।
পরে, যখন দৈনিক মুখপত্র তার মালিকানায় এলো, তখন আমার মনে হয়েছিল—এ যেন বহু আগে লেখা কোনো গল্পের স্বাভাবিক ও অনিবার্য সমাপ্তি।
একই জেলার দুই সন্তান, দুই ধর্মের দুই পরিবার, দুই পুরোনো প্রতিবেশী—জীবনের ভিন্ন ভিন্ন রাস্তা ঘুরে আবার এসে মিলিত হলাম একটি জাতীয় দৈনিকের অভিন্ন দায়িত্বে।
আজ মুখপাত্রের প্রতিটি পৃষ্ঠা শুধুমাত্র খবর বহন করে না;
এগুলোর ভেতর দিয়ে বয়ে যায় আমাদের শৈশবের স্মৃতি, পারিবারিক মূল্যবোধ, আন্তধর্মীয় বন্ধুত্ব, পারস্পরিক আস্থা, এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার।
এই জন্যই দৈনিক মুখপত্র আমার কাছে শুধু একটি পত্রিকার নাম নয়—এটি আমার জীবনযাত্রার, সম্পর্কের ইতিহাসের এবং পেশাগত সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
চলবে…..
ব্যক্তিগত স্মৃতি এবং দৈনিক মাথাভাঙ্গা পর্ব- ১
আমার জীবনের গল্প যদি এক লাইনে বলতে হয়, আমি হয়তো বলতাম—
শারীরিকভাবে এক পা,
কিন্তু মানসিকভাবে অনন্ত পথে হাঁটা একজন মানুষ।
আমি কখনও নায়ক হতে চেয়েছি, এমনও না।
বরং আমার গল্পের নায়ক আসলে সংবাদপত্র আর মানুষের প্রতি আমার অদ্ভুত এক দুর্বলতা।
এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, চুয়াডাঙ্গার ছোট্ট শহর থেকে শুরু করে ঢাকার কাগজের অফিস পর্যন্ত, আমি শুধু চেষ্টা করেছি সত্যের পক্ষে একটু শব্দ সাজিয়ে দিতে।
আমার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা চুয়াডাঙ্গায়—
সেই শহর, যেখানে রেললাইনের ধারে ধুলো উড়ে,
আর চায়ের দোকানে বসেও জাতীয় রাজনীতি আর গ্রামের কিশোরের গল্প একই টানা গলায় বলা হয়।
এই শহর আমাকে শিখিয়েছে—
বড় মঞ্চ মানেই ঢাকা না,
বড় গল্প মানেই বড় মানুষের গল্প না।
গল্প থাকে গেরুয়া কাপড় পরা বয়স্ক এক কৃষকের চোখেও,
গল্প থাকে নিঃশব্দ এক ভোরে,
যেদিন প্রথমবার কেউ নিজের নাম কাগজের পাতায় দেখে।
আমার শারীরিক সীমাবদ্ধতা অনেকের কাছে প্রথম পরিচয়ের মতো।
আমার কাছে এটা ছিল নীরব এক শিক্ষক।
ছোটবেলা থেকেই বুঝে গেছি—
দৌড়ে যদি যেতে না পারি, তবে হেঁটে হেঁটেই যেতে হবে;
কিন্তু যেতেই হবে।
অনেকেই আমাকে দেখে ভেবেছে—
এই ছেলেটা কী করবে জীবনে?
আর আমি নিজেকে দেখে ভেবেছি—
দেখি, আমি কতটা মানুষ থাকতে পারি।
সাংবাদিকতা বেছে নেওয়াটা পরিকল্পিত ছিল না,
কিন্তু যে সময়ে আমি বড় হয়েছি,
সেই সময়ে সত্য আর সংবাদ
একা–একা হাঁটতে পারত না—
তাদের কারও না কারও হাত দরকার ছিল।
আমি সেই হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম,
হয়তো একটু অজ্ঞতা নিয়ে,
কিন্তু অদম্য কৌতূহল আর ন্যায়বোধ নিয়ে।
চুয়াডাঙ্গার প্রথম দৈনিক—দৈনিক মাথাভাঙ্গা—
যখন বের করলাম, তখন আমরা শুধু পত্রিকা করিনি,
আমরা ইতিহাসের পাতায় নিজেদের একটুখানি জায়গা কেটে নিয়েছি।
সেই লেটার প্রেসের যুগ—
টুয়েন্টি টু ক্যামেরা, ডার্করুম,
চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকায় ফিল্ম পাঠিয়ে
জিঙ্কের ব্লক বানিয়ে আনা—
প্রতিটি ধাপে ধৈর্য, শ্রম আর ভালোবাসার পরীক্ষা ছিল।
একবার চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক আব্দুল হক সাহেবের ছবি ও নাম ছাপতে গিয়ে
প্রেসের ‘ব্দ’ যুক্ত অক্ষর ভেঙে যাওয়ায় “আব্দুল”–এর বদলে
“আবদুল” লিখে বসি—
আজকের নতুন বানানের মতোই।
তারপর যা হলো, তা একদিকে হাসির, অন্যদিকে গভীর এক শিক্ষা।
তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে আমাকে ডেকে বললেন—
আমার ছবি নাকি তাঁকে বাঁদরের মতো বানিয়ে ফেলেছে,
এবং অনুরোধ করলেন,
আমাদের পত্রিকা থেকে যেন তাঁর নাম–ছবি চিরতরে বাদ দেওয়া হয়—
প্রতিদিন দুটো রসগোল্লা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি সহ!
মজার এই ঘটনার ভেতরেও আমি দেখেছিলাম
কীভাবে একজন মানুষের ইমেজ, সম্মান ও পরিচয়
একটি ছোট্ট ফন্ট–এর ভুলের মধ্যেও আটকে যেতে পারে।
সেই দিন থেকেই বুঝেছি—
সংবাদপত্র শুধু কাগজ আর কালি না,
এটা মানুষের আত্মপরিচয়ের আয়না।
দৈনিক মাথাভাঙ্গা থেকে শুরু করে
দৈনিক ঝিনাইদহ,
দৈনিক অধিবেশন—
প্রতিটি পত্রিকার জন্ম ও মৃত্যু
আমার জীবন থেকে একেকটি অধ্যায় কেটে নিয়েছে,
আবার কিছু নীরব গৌরবও উপহার দিয়েছে।
দৈনিক অধিবেশন বন্ধ হয়ে যাওয়া,
ধর্মীয় উগ্রবাদ ও রাজনৈতিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে লিখে
গ্রেফতার হওয়া,
প্রেস ফ্রিডমের নামে কাগজের ওপর অবরোধ—
এসব কিছুই আলাদা কোনো গল্প না,
এগুলো আমার রক্তের সঞ্চালনের অংশ।
আজ আমি যখন
দৈনিক এই আমার দেশ,
দৈনিক গড়ব বাংলাদেশ,
আর
The Business in Magazine
সম্পাদনা করি,
তখন মনে হয়—
আমার হাতে এখন আর শুধু পত্রিকা নেই,
এখন আমার হাতে আছে গত চার দশকের অভিজ্ঞতা,
ভুল, সাফল্য, অপমান, সম্মান
আর আরও বেশি করে মানুষের ভালোবাসা।
এই আত্মজৈবনিক লেখায় আমি নায়ক হতে চাই না।
আমি শুধু সাক্ষী হতে চাই—
একটি সময়ের,
একটি অঞ্চলের,
আর একটি পেশার,
যার নাম সাংবাদিকতা।
আমি জানতে চাই, আমার গল্প পড়ে
কেউ যদি একবারও ভাবে—
“শারীরিক সীমাবদ্ধতা শেষ কথা নয়,
মানসিক শক্তিই আসল দাঁড়িয়ে থাকার জায়গা”—
তাহলে এই লেখার উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে।
এই বইতে থাকবে
আমার ভুলের কথা, আমার পক্ষপাতের কথা,
আমার ভাঙা স্বপ্নের কথাও।
কারণ আমি বিশ্বাস করি—
শুধু সাফল্যের গল্প লিখলে
মানুষ পুরো মানুষ থাকে না।
আমি আলী কদর পলাশ।
চুয়াডাঙ্গার মাটিতে পা রেখে
বাংলাদেশের আকাশের নিচে হাঁটা একজন ছোট্ট মানুষ।
আমার জীবনের এই পথচলার টুকরো–টুকরো আলাপ
এবার তুলে দিচ্ছি তোমাদের সামনে—
পাঠকের আদালতে।
খণ্ড স্মৃতি
সেই দিনের জামিন দৈনিক অধিবেশন পর্ব-১
২০০২ সাল, সম্ভবত ফেব্রুয়ারি মাস। প্রচণ্ড শীত। দৈনিক অধিবেশন প্রকাশের দায়ে
আমি তখন জেলে। মামলার ধারাবাহিকতায় জামিনের জন্য কোর্টে গেছি। শুনানি হলো, যুক্তি–তর্ক হলো, আর আমি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মনে মনে অপেক্ষা করছি—আজ কি মুক্তি মিলবে?
জামিন মঞ্জুর হয়েছে—এটা আমি প্রথমে কাগজ দেখে নয়, জেলা ও দায়রা জজের চোখের ভাষা দেখে বুঝতে পেরেছিলাম। তিনি আমার অতি পরিচিত, বহু দিনের। তাঁর চোখ যেন নীরবে বলছিল,
“বিষয়টা গোপন রাখো।”
কোর্টের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো, আর বিকেলে অন্য আসামিদের সঙ্গে আমাকেও আবার সেই পরিচিত লোহার খাঁচাওয়ালা গাড়িতে তুলে জেলে ফিরিয়ে আনা হলো।
জেলে একটা অদ্ভুত নিয়ম—
বিকেল চারটার পর আসামিদের আর বাইরে থাকার সুযোগ নেই।
সবার সেলের মোটা রডের দরজা বন্ধ, কয়েদিদের রুম বন্ধ—
যেন সন্ধ্যার আগেই সবাইকে “খোয়ারে” ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।
সব পশুপাখি যেখানে গোধূলি বেলায় নিজ নিজ ঘরে ফেরে,
জেল–কয়েদিদের সেখানে আরো আগেই বন্দী করে রাখা হয়।
আমি ইন্দারার পাশের ছোট্ট ফুলবাগানের ধারে বসে আছি।
এমন সময় জেলার সাহেব এসে হেসে বললেন—
“সম্পাদক সাহেব, ঘরে যান। আজও আপনার জামিন আসেনি।”
আমি হাসলাম।
মুচকি হেসে ধীরে ধীরে ফিরে এলাম আমার সেই ‘ঘরে’—
ঘর, মানে সেল।
ফাঁসির আসামিদের জন্য বানানো ছোট্ট কামরা—
উঁচু দেয়াল, দাঁত বার করা ইটের গাঁথুনি দিয়ে ঘেরা অ্যাটাচড বাথরুম,
একটি মাত্র ভেন্টিলেটর,
আর দরজা বলতে বড় বড় লোহার রড,
সেই রডে ঝোলানো ইয়া বড় তালা।
এই ঘরের মধ্যেই গোসল, নামাজ, প্রাকৃতিক কাজ, খাবার—
সব একসঙ্গে সেরে নিতে হয়।
ঘরে ঢুকে একটু মন খারাপই হলো।
বারবার মনে পড়ছিল জেলা জজের চোখের কথা।
আমি নিশ্চিত ছিলাম—
আজ শেষ মামলার জামিন হয়ে গেছে,
আজ আমি খোলা আকাশের নিচে হাঁটব।
কিন্তু দৃশ্যত কিছুই হচ্ছে না।
সন্ধ্যা পেরিয়ে অন্ধকার নেমে এসেছে।
ঠিক তখনই হঠাৎ সেলের সামনে কড়া নাড়ার শব্দ,
তালার ঝনঝনানি।
দরজা খুলে গার্ডের গলা—
“স্যার, আপনার জামিন হয়েছে।
জেলার সাহেব অফিসে বসে আছেন, আপনাকে মুক্তি দিতে।”
এর আগে অনেকবারই জামিন পেয়েছি।
কিন্তু জেলখানায় কাগজ পৌঁছানোর আগেই
বিএনপি–জামায়াত জোট সরকারের স্থানীয় প্রতিনিধিরা
একটার পর একটা নতুন মিথ্যা মামলা ঠুকে
আমাকে আবারও আটকে রাখত।
সম্ভবত সেই কারণেই
পরিচিত জজ সাহেব সেদিন জামিনের খবরটি ইচ্ছে করেই গোপন রেখেছিলেন—
যাতে আর কেউ নতুন মামলা ঠুকে
আমাকে ফের থামিয়ে রাখতে না পারে।
তার আড়ালে ছিল এক ধরনের সুরক্ষা,
একটি নীরব ভালোবাসা—
তার প্রিয় “সম্পাদক” যেন সত্যি সত্যিই মুক্তি পায়।
২. কুষ্টিয়ায় আত্মগোপন আর “প্রতিদিনের ঈদ”
জেল থেকে জামিন পাওয়ার পরে সরাসরি ঝিনাইদহের বাসায় যাইনি।
নিরাপত্তার স্বার্থে সোজা চলে গেলাম কুষ্টিয়ায়।
জেলের ভেতরেই শুনেছি—
আমার বাড়ির তালা ভেঙে প্রকাশ্যে সব লুট হয়ে গেছে।
পত্রিকা অফিস, নিউজরুম, কম্পিউটার সেকশন, প্লেট সেকশন,
এমনকি বিশাল বড় অফসেট প্রেসটাও
শাসক দলের লোকজন লুট করে নিয়ে গেছে।
শুধু তাই নয়, আমার ব্যবহৃত প্রাইভেট কারটিও
আগে মূল্যবান যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে,
তারপর আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে।
স্বাভাবিকভাবেই, সোজা ওই শহরে গিয়ে বসা মানে
নিজেকেই ঝুঁকিতে ফেলে দেওয়া।
তাই রাতেই ঝিনাইদহ থেকে কুষ্টিয়ায় চলে গেলাম,
আত্মগোপনে থাকলাম অনেক দিন।
কিন্তু আমার কুষ্টিয়ার স্টাফরা
নিয়মিত সেই বাসায় যেত–আসত, খবর রাখত সব।
সেই সময় আমি নিয়মিত হুইস্কি খেতাম—
এক–আধ পেগ না;
কাজ শেষ হলে গলা পর্যন্ত ঢেলে
গভীর ঘুমে শরীরকে এলিয়ে দিতাম।
মনের ওপর যে পরিমাণ চাপ,
শরীরের ওপর তারও বেশি,
তখন নিজেদের মতো করে একটা “নেশার আশ্রয়” দরকার ছিল—
সেটা হয়তো ঠিক, হয়তো ভুল,
কিন্তু ছিল ভীষণ বাস্তব।
একদিন আমারই এক স্টাফ, লতিফ,
ভীষণ কাচুমাচু মুখে এসে বলল—
“বস, আমরা তো ঈদের দিন খাই,
আর আপনি তো প্রতিদিন খান…
তাহলে কি আপনার প্রতিদিনই ঈদ?”
এই একটি বাক্য যেন অন্ধকার ঘরে হঠাৎ আলো জ্বেলে দিল।
আমার দুঃসময়ের মধ্যে
ওদের এই নির্ভেজাল রসবোধ, দুষ্টুমি আর কাছে থাকার ইচ্ছাই
আমাকে মানুষ হিসেবে ধরে রেখেছে।
কুষ্টিয়ার সেই দিনগুলো,
প্রতিদিনের এই তথাকথিত “ঈদ”
আর স্টাফদের সঙ্গে এইসব ছোট–ছোট সংলাপই
আমার সংকটের ভেতর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ছিল।
শিক্ষক-ছাত্রের পুনর্মিলন
আলী কদর পলাশ
শৈলকুপার পথে সেদিনের যাত্রাটা ছিল অন্য রকম।
এটা ছিল সাধারণ কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়;
বরং আমার জীবনের সঙ্গে জড়িত একজন মানুষের জন্য
একটা ঐতিহাসিক মুহূর্তের শুরু।
দৈনিক এই আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি, আমার ব্যবসায়ী অংশীদার, পরম শ্রদ্ধেয়
পাঁচবারের এমপি, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সাবেক প্রতিমন্ত্রী, প্রয়াত জননেতা আব্দুল হাই এমপি—
তার বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দিতে যাচ্ছিলেন।
আমি ছিলাম তাঁর সঙ্গে, সাংবাদিকদের একটি দল নিয়ে।
দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, সংগ্রাম—সব মিলিয়ে
এটা আমার জন্যও ছিল এক প্রকার নিজের বাড়ির পথ ধরা।
শৈলকুপা পৌঁছানোর পর স্থানীয় প্রেসক্লাব সভাপতি সাংবাদিক মুসা ও অন্যরা
বলল—
“পলাশ ভাই, আপনার ভিজে স্কুলের এক শিক্ষক এখনো জীবিত আছেন।
গেম টিচার বাবু অহিন্দ্র কুমার সাহা।
চলুন, যাই—আপনাকে দেখে তিনি খুশি হবেন।”
এক মুহূর্তে মনে পড়ে গেল—
ভিক্টোরিয়া জুবিলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়…
ভিজে স্কুলের লাল দোতলা দালান…
উঁচু সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা
ক্রাচে ভর দেওয়া ছোট্ট আলী কদর।
সেই বালককে প্রথমবার গেম টিচারই বলেছিল
“তুই অনেক দূর যাবি।”
আমরা গাড়ির বহর ঘুরিয়ে শৈলকুপা বড়বাজারের ভেতরে
স্যারের বাড়ির সামনে এসে থামলাম।
সেদিন আমার চারপাশে রাজনৈতিক ভিড় ছিল,
ক্যামেরা ছিল, সাংবাদিক ছিল—
কিন্তু ঘরের দরজা খোলা মাত্র
সবাই যেন এক মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
অহিন্দ্র কুমার সাহা স্যার আমাকে দেখেই থমকে দাঁড়ালেন।
তারপর—কোনো ভূমিকা ছাড়াই—
আমাকে জড়িয়ে ধরলেন।
দু’চোখ ভিজে গেল তাঁর।
আমার নিজের দু চোখেও জল,
হৃদয় ছিড়ে চিৎকার করে কান্না আসছে
কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে স্যার বললেন—
“আমার আলী কদর…
ওরে, তুই এভাবে আমার কাছে আসবি—
আমি ভাবতেই পারিনি…”
আমি স্যারের পায়ে হাত রাখলাম,
কাকিমার পায়েও।
পুরো পরিবেশ হঠাৎ ভরে উঠল
এক অদ্ভুত আবেগের ভারে।
যে সাংবাদিকরা আমাকে সাক্ষাৎকার নেন,
যারা নেতাদের নিয়ে লেখেন—
সেদিন তাদের চোখেও জল।
কারণ দৃশ্যটা কোনো সাধারণ দৃশ্য ছিল না।
একজন শিক্ষক—
যিনি তাঁর ছাত্রের হাঁটতে শেখা দেখেছেন,
ক্রাচে ভর দিয়ে সিঁড়ি ভাঙার সংগ্রাম দেখেছেন,
ক্লাসের ফলাফলের আনন্দ দেখেছেন—
সেই ছাত্র আজ শত মানুষের ভিড়ে এসে
তাঁর বুকে মাথা রাখলো।
স্যার কান্না থামাতে পারছিলেন না।
বলে উঠলেন—
“আমি তোদের সংসার–সংগ্রাম সব দেখেছি আলী কদর…
আজ আমার বুক ভরে গেল।”
সাংবাদিকরা ভিডিও করল;
অন্যরা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
কারণ রাজনৈতিক মাঠের ভিড়ে
শিক্ষক-ছাত্রের এমন
নির্মল, নির্ভেজাল
মানবিক পুনর্মিলন
দেখা যায় না প্রতিদিন।
আমি মনে মনে ভাবছিলাম—
কত মানুষ আসে যায়,
কত নেতা ওঠে পড়ে যায়—
কিন্তু শিক্ষক নামের এই মানুষগুলো
সারা জীবনের পাথেয়।
সেদিন আমার কাছে মনোনয়ন জমা দেওয়ার চেয়েও
গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই দেখা—
এই আলিঙ্গন, এই চোখের জল,
এই স্বীকারোক্তি—
গাড়িতে ফেরার সময় আমার বুক কাঁপছিল।
আমি যেন আবার হয়ে গেছি—
ভিজে স্কুলের সেই এক পায়ের ছেলে—
যার পৃথিবী বদলে দিয়েছিলেন
অহিন্দ্র কুমার সাহা নামের
একজন শিক্ষক, ডিজে স্কুলের সকল শিক্ষক, কর্মকর্তা কর্মচারী—
যিনি আজও আমার হৃদয়ে অসাধারণ হয়ে আছেন। যে সকল শিক্ষকের কাছে আমি চিরঋণী।
চলবে…..