আলী কদর পলাশ :
বিশ্ব রাজনীতির অমর নাট্যমঞ্চে নূতন দৃশ্যাবলি কদাচিৎ দেখা যায় না কিন্তু সূত্র: ট্রুথ সোশ্যাল এবং রয়টার্স এ প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী যে দৃশ্যটির অবতারণা ঘটিয়াছে, তাহা কেবল অভূতপূর্ব নহে, ইহা যেন রাষ্ট্রবিদ্যার গ্রন্থকে সরাইয়া রাখিয়া বিজ্ঞাপনী পোস্টারের উপর পররাষ্ট্রনীতি রচনা করিবার দুঃসাহস।
প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি ছবি পোস্ট করিয়া নিজেকে ভেনেজুয়েলার ‘ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট’ ঘোষণা করিয়াছেন এবং ইহার পটভূমিতে এক সপ্তাহ পূর্বে মার্কিন সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক/অপহৃত করিয়া নিউইয়র্কে আনা, এমনকি প্রাণহানির ভয়াবহ হিসাবও উল্লিখিত। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব যেখানে সংবিধান, জনমত ও আন্তর্জাতিক আইনের দ্বারা সংরক্ষিত থাকার কথা, সেখানে একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে “শপথগ্রহণের দলিল” রূপে হাজির করিবার এই কৌশল, আধুনিক যুগের রাজনীতিকে কেবল বেপরোয়া করিয়াই তোলে না, রাজনীতির নৈতিক ভিত্তিকেও শূন্যগর্ভ করিয়া দেয়।
প্রতিবেদনের ভাষ্য যদি সত্যই ঘটনাবলির প্রতিচ্ছবি হয়, তবে প্রথম প্রশ্নটি শিষ্টাচারের নহে, আইন ও সভ্যতার। এক রাষ্ট্রের নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে অন্য রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী রাজধানীতে অভিযান চালাইয়া আটক করিবে। বিদেশভূমিতে লইয়া গিয়া বিচার প্রক্রিয়া শুরু করিবার প্রস্তুতি নিবে এবং তার পর অপর রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান সেই শূন্যতাকে সুযোগ মানিয়া নিজেকে “ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট” ঘোষণা করিবে- ইহা কূটনীতি নহে, ইহা শক্তির উপাসনা। আইনকে পাশ কাটাইয়া ক্ষমতার দম্ভে যে রাষ্ট্রীয় আচরণ গড়িয়া উঠে, তাহা সাময়িকভাবে প্রভাব বিস্তার করিলেও দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভাঙিয়া দেয়। আন্তর্জাতিক আইনের নাম মুখে থাকিলেও, কার্যত যদি নীতির স্থলে নিপীড়ন বসে, তবে বিশ্বের দুর্বল রাষ্ট্রগুলির জন্য আর অবশিষ্ট থাকে কেবল আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা।
এই নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কে তেল। প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি যুক্তরাষ্ট্র হাতে রাখিবে—এমন বার্তাও উচ্চারিত। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর উদ্ধৃতি অনুযায়ী “অনির্দিষ্টকালের জন্য” জ্বালানি খাত নিয়ন্ত্রণে রাখিবার কথাও বলা হইয়াছে, ভবিষ্যতে “উপযুক্ত সময়ে” পুনর্প্রদান- এই প্রতিশ্রুতির মোড়কে। উপযুক্ত সময় কথাটি রাজনীতিতে বহুবার শোনা গিয়াছে। ইহা এমন এক সময়, যাহা প্রায়ই শাসকের সুবিধামত প্রসারিত হয় এবং ভুক্তভোগীর অপেক্ষায় জীর্ণ হয়। তেলের মালিকানা যেন জনগণের নহে বরং যে শক্তি দখল করিতে পারে, তাহারই।এই মনোভাব যদি রাষ্ট্রনীতির নিয়ম হইয়া দাঁড়ায়, তবে আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা ও নিরাপত্তা কাঠামো ক্রমে রণনীতির পরিণত রূপই ধারণ করিবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হইয়াছে, মাদুরো আটক/অপহৃত হওয়ার পর ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করে এবং সেনাবাহিনীও সমর্থন দেয়। অতএব একই রাষ্ট্রে একসঙ্গে দুই ‘ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট’ দাবিদার।একজন দেশীয় আদালতসমর্থিত, অন্যজন বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানের সোশ্যাল মিডিয়া-সমর্থিত। ইহা সার্বভৌমত্বের উপর দ্বৈত ছুরি। একদিকে প্রশাসনিক স্থবিরতা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দড়ি টানাটানি, আর মাঝখানে সাধারণ মানুষ। যাহাদের জীবন তর্কের উপকরণ এবং মৃত্যু সংবাদশিরোনামের সংখ্যা। শক্তিশালীর সংস্কার শব্দটি অনেক সময় দুর্বলের দখল বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। রাষ্ট্রীয় সংস্কারের নামে যদি বিদেশি নিয়ন্ত্রণকে বৈধতা দেওয়া হয়, তবে সেই সংস্কার সভ্যতার নহে- আধিপত্যের।
এখানে কেবল ট্রাম্পের চরিত্র বিশ্লেষণ করিলে কাহিনির গভীরতাকে অবমূল্যায়ন করা হইবে। ইহা একটি প্রবণতার উপসর্গ—যেখানে রাষ্ট্রপতি-প্রতিষ্ঠান, বিচার-নৈতিকতা, গণতান্ত্রিক অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ক্রমে “দর্শকসারির শালীনতা” মাত্র। মূল খেলাটি চলে শক্তি, সম্পদ ও প্রচারণার ত্রিভুজে। রাষ্ট্র পরিচালনা যদি ‘পোস্ট’ ও ‘প্রপাগান্ডা’র গতিতে চলে, তবে সত্য পরিণত হয় একটি সুবিধাজনক বয়ান। আর আইন পরিণত হয় ক্ষমতার পরিচারক। রবীন্দ্রনাথের সেই সতর্ক বাণী স্মরণযোগ্য—“যেখানে ভয়, সেখানে লজ্জা।” ভয় যখন রাষ্ট্রনীতির চালিকাশক্তি হয়, তখন ন্যায়বোধ নীরব হয়, সভ্যতা সংকুচিত হয়, এবং মানবতার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়।
অতএব, প্রতিবেদনে বর্ণিত ঘটনাপ্রবাহকে যদি আমরা “নজিরবিহীন” বলিয়া থামাই তবে তাহা হবে অসম্পূর্ণ। ইহা নজিরবিহীন নহে, ইহা নজির তৈয়ারির চেষ্টা। একটি বিপজ্জনক নজির, যেখানে শক্তিধর রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ক্ষমতার শূন্যতা সৃষ্টি করিয়া, সেই শূন্যতাকে নিজের পদচিহ্নে পূর্ণ করিতে চায়। আজ যাহা ভেনেজুয়েলা, কাল তাহা অন্য যে কোনো রাষ্ট্র হইতে পারে। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রকৃত পরীক্ষা এইখানেই—রাষ্ট্রসমূহ আইনকে মান্য করিবে, না কি আইনকে মান্য করানোর ক্ষমতা কেবল শক্তিধরের হাতে থাকিবে।
এই নাটকে ‘ভারপ্রাপ্ত’ শব্দটি বড়ই মজার- কিন্তু হাসিবার অবকাশ কম, কারণ ভার যদি পড়ে, তাহা পড়ে সাধারণ মানুষের উপরই। আর রাষ্ট্রনীতি যদি পরিণত হয় পরশ্রীকাতর সাম্রাজ্য-চর্চায়, তবে ইতিহাস একদিন জিজ্ঞাসা করিবে—তোমরা কি আইন রক্ষা করিলে, না কি কেবল শক্তির সামনে মাথা নত করিলে।