আলী কদর পলাশ
আজ ১৭ নভেম্বর ২০২৫—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন ও বিতর্কিত অধ্যায় যুক্ত হলো। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে জুলাই ২০২৪-এর ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানের দমন-পীড়নের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে। এই রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার, আইন উপদেষ্টা, ডাকসু ভিপি থেকে শুরু করে শহীদ পরিবারের প্রতিনিধি—অনেকেই একে “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিজয়”, “চূড়ান্ত বিজয়” বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
এই রায়কে বুঝতে হলে ফিরতে হয় গত বছরের জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোতে। কোটা সংস্কার থেকে শুরু হওয়া ছাত্রদের আন্দোলন দ্রুতই রূপ নেয় সর্বগ্রাসী গণ-অভ্যুত্থানে, যেখানে সরকারি হিসাব ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে ধারণা করা হয়, সহিংস দমন-পীড়নে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত এবং বহু হাজার মানুষ আহত হন। এই রক্তপাতের মধ্য দিয়েই ১৫ বছরের টানা ক্ষমতাশালী এক সরকারের পতন ঘটে, ভেঙে পড়ে ভয়ের প্রাচীর, এবং গড়ে ওঠে “জুলাই গণ-অভ্যুত্থান”—বাংলাদেশের নতুন এক রাজনৈতিক মাইলফলক।
অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ছিল—জুলাইয়ের গণহত্যা, গুম, নির্যাতনসহ সব মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা। সেই পথ ধরে পুনর্গঠিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল; দীর্ঘ তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে আজকের রায়। ট্রাইব্যুনাল যে অপরাধগুলোকে “মানবতাবিরোধী” হিসেবে স্বীকৃতি দিল—সেগুলোর কেন্দ্রে ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, বাছাই করে ছাত্রনেতা ও বিরোধী কণ্ঠস্বরের ওপর আক্রমণ, এবং শান্তিপূর্ণ বা আধা-শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ওপর সামরিক ও আধাসামরিক শক্তি ব্যবহার।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে রায়টি শুধু দুই সাবেক ক্ষমতাধর ব্যক্তির বিরুদ্ধে একটি দণ্ডাদেশ নয়; বরং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি—জুলাই ২০২৪-এ যা ঘটেছে, তা কোনো “আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার স্বাভাবিক অভিযান” ছিল না, ছিল বেসামরিক নাগরিকের বিরুদ্ধে ব্যাপক হামলা; ছিল মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এই স্বীকৃতি শহীদ পরিবারগুলোর জন্য এক নৈতিক সান্ত্বনা ও দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বীকৃতি—তাদের প্রিয়জনেরা “দাঙ্গাবাজ”, “উচ্ছৃঙ্খল” বা “রাষ্ট্রদ্রোহী” ছিলেন না; বরং তারা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিহত হয়েছেন।
তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য টেনে নেওয়া জরুরি। ন্যায়বিচারের বিজয় ও প্রতিশোধের উল্লাস এক জিনিস নয়। শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান উভয়েই বর্তমানে ভারতের আশ্রয়ে আছেন এবং পুরো বিচার প্রক্রিয়াকে তারা শুরু থেকেই “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে আখ্যা দিয়ে আসছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একাংশও মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্নে বরাবরই আপত্তিকর অবস্থান নিয়েছে; তারা বিশেষত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারেও মৃত্যুদণ্ড এড়িয়ে যাবার পক্ষে।
সুতরাং, এই রায়কে যদি “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিজয়” বলা হয়, তার অর্থ হওয়া উচিত—ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি; কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধপরায়ণ আনন্দোৎসব নয়। নৈতিক প্রশ্নগুলো—বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের যৌক্তিকতা, অনুপস্থিত আসামির বিচার, আপিল প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা—এসব নিয়ে গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও আইনি মহলে যে বিতর্ক আছে, তা উপেক্ষা করা যাবে না। বরং সেসব প্রশ্নেরই পরিপ্রেক্ষিতে এই রায়কে আরো স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রামাণ্য করে তোলার দাবি উঠবে।
এখানে মূল প্রশ্নটি রাজনৈতিকও বটে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তন মানেই ছিল “জয়ী পক্ষের উল্লাস” ও “পরাজিত পক্ষের নিশ্চিহ্নকরণ”—রাজনীতি থেকে, প্রশাসন থেকে, কখনো কখনো ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তক থেকেও। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় তরুণ প্রজন্ম যেভাবে রাস্তায় নেমে “দায়মুক্তির সংস্কৃতি” ভাঙার দাবি তুলেছিল, আজকের রায় তাদের সেই দাবিরই একটি আইনি প্রতিফলন। কিন্তু যদি এই রায়কে ধরে নিয়ে আবারও এক ধরণের প্রতিপক্ষ-দমন-রাজনীতি শুরু হয়—তবে বিজয় শূন্যতায় পর্যবসিত হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের এখানেই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব—এই রায়কে কেন্দ্র করে যেন “বিজয়ী পক্ষের বিচার” নয়, “রাষ্ট্রের বিচার”—এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠা করা যায়। কারণ, আদালত যদি ক্ষমতার পালাবদলের এক হাতিয়ার হয়ে পড়ে, তবে আজকের রায় আগামী দিনের সন্দেহের কারণ হয়ে থাকবে। বিচার প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা, পূর্ণাঙ্গ যুক্তিতর্ক, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রমাণ মূল্যায়ন—এসব নিশ্চিত করা না গেলে “রাজনৈতিক প্রতিশোধ” তত্ত্বকে পুরোপুরি খণ্ডন করা যাবে না।
“জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিজয়” তাই প্রথমত নৈতিক এক বিজয়—মুখ্য রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও যে দায়মুক্তির ঊর্ধ্বে রাখা যাবে না, সেই বার্তা। দ্বিতীয়ত, এটি প্রজন্মান্তরের জন্য এক সতর্কবার্তা—রাষ্ট্রক্ষমতা কখনোই সীমাহীন নয়; গণদাবির বিরুদ্ধে গুলি ছোড়া, গুম, নির্যাতন, তথ্য-অবরোধ—এসবের হিসাব একদিন না একদিন চাওয়া হবেই। কিন্তু তৃতীয়ত, এও মনে রাখতে হবে—রাস্তায় অর্জিত বিজয়কে যদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, সত্য কমিশন, নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহি ও বিশ্ববিদ্যালয়–ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে টেকসই করা না যায়, তবে আজকের রায় কেবল প্রতীকী থেকেই যাবে।
শহীদ ও আহত পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষা আংশিক হলেও আজ ফলপ্রসূ হয়েছে—তারা দেখতে পাচ্ছেন, রাষ্ট্র তাদের ক্ষতিকে অন্তত ভাষায় স্বীকৃতি দিয়েছে, অপরাধীদের নাম উল্লেখ করেছে, অপরাধের প্রকৃতি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সংজ্ঞায়িত করেছে। কিন্তু এর পরের ধাপ হলো পুনর্বাসন—মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক। পরিবারগুলো যাতে বিচার-প্রক্রিয়ার বাইরে থেকেও শিক্ষা, চিকিৎসা, পুনর্গঠনসহ নানাবিধ সহায়তা পায়, সে ব্যবস্থাও এখন থেকেই নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে, “চূড়ান্ত বিজয়” আসলে কী? কোনো ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া—না কি এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠা, যেখানে ভবিষ্যতে আর কোনো সরকারই জনগণের ওপর এভাবে গুলি চালাতে সাহস না পায়? আমাদের বিশ্বাস, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সত্যিকার চূড়ান্ত বিজয় হবে সেই দিন, যেদিন বাংলাদেশে ক্ষমতা বদল হবে কেবল ব্যালটের মাধ্যমে, কখনোই গুলির মাধ্যমে নয়; যখন কোনো ছাত্র, কোনো নাগরিক, কোনো ভিন্নমতাবলম্বীকে রাষ্ট্রের বেআইনি সহিংসতার মুখোমুখি হতে হবে না।
আজকের রায় সেই কাঙ্ক্ষিত দিনের পথে এক ভারী, ঐতিহাসিক পদক্ষেপ—কিন্তু পথ এখনো অনেক বাকি। “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিজয়” যাতে শুধু শ্লোগান না হয়ে বাস্তব পরিবর্তনের শক্তি হয়ে ওঠে, সেই দায়িত্ব এখন রাষ্ট্র, রাজনীতি আর নাগরিক সমাজ—সবার।