আলী কদর পলাশ
গতকালের ভূমিকম্প আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—ঢাকা শহর কেবল যানজট, বায়ুদূষণ আর রাজনৈতিক অস্থিরতার নগরী নয়; এটি এক ভয়াবহ ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ শহর। ভবনগুলো দাঁড়িয়ে আছে, রাস্তাঘাটে জীবন চলাচল করছে স্বাভাবিক ছন্দে—কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমরা সবাই যেন এক অদৃশ্য টাইম বোমা বয়ে বেড়াচ্ছি।
সমস্যা হলো, ভূমিকম্পকে আমরা এখনো “দূরের” বিপদ হিসেবেই দেখি। ভূমিকম্প মানে যেন টেলিভিশনের পর্দায় দেখা তুরস্ক, নেপাল বা জাপানের ধ্বংসস্তূপ; ঢাকা যেন তার বাইরে কোনো নিরাপদ দ্বীপ। অথচ ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতা বলছে—এ অঞ্চল সক্রিয় ফল্টলাইনের কাছে, রাজধানী অতিরিক্ত জনবহুল, আর ভবনের বড় অংশ নির্মিত হয়েছে দুর্বল তদারকি ও দায়হীনতার সংস্কৃতিতে।
একদিকে অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, অন্যদিকে দুর্বল অবকাঠামো—এই দুইয়ের যোগফলই একটি সম্ভাব্য ভূমিকম্পকে মানবসৃষ্ট মহাদুর্যোগে রূপান্তরিত করতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—আমরা কি সত্যিই এই ঝুঁকিকে “ঝুঁকি” হিসেবে দেখছি?
সরকারি নীতিমালায় বিল্ডিং কোড রয়েছে, ভূমিকম্প-সহনশীল নকশার কথা রয়েছে, বিভিন্ন সময়ে মহড়া ও সচেতনতা কর্মসূচির কথাও বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে? অধিকাংশ মানুষের ঘরে, অফিসে, স্কুলে, কারখানায়—ভূমিকম্প হলে কী করতে হবে, কোথায় আশ্রয় নিতে হবে, কার কী দায়িত্ব—তা কেউই স্পষ্ট জানে না।
আমাদের বেশির ভাগ বহুতল ভবনে নেই নির্ধারিত খালি স্থান, নেই জরুরি সিঁড়ি ঠিকঠাক, নেই বের হওয়ার খোলা পথ। গলাকাটা প্লট ভাগ, রাস্তা দখল, সিঁড়ি ঘর গুদাম, ছাদে অবৈধ নির্মাণ—সব মিলিয়ে ভূমিকম্পের মুহূর্তে ভবন থেকে বের হওয়াটাই অনেকের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক ঘটনা; কিন্তু মৃত্যু ও ধ্বংসের মাত্রা নির্ধারণ করে মানুষের নিজের আচরণ, পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি। যে দেশ আগে থেকে হিসাব করে, শক্তিশালী ভবন গড়ে, নাগরিককে প্রশিক্ষণ দেয়—সেই দেশ কাঁপলেও দাঁড়িয়ে থাকে। আর যে সমাজ চোখ বুজে “কিছু হবে না” বলে দিন কাটায়, সেখানেই ভূমিকম্প প্রকৃতির পরীক্ষাকে মানুষের জন্য শাস্তিতে পরিণত করে।
ঢাকার প্রেক্ষাপটে এখন জরুরি তিনটি জিনিস—
প্রথমত, কার্যকর বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন। এটি আর কাগজে-কলমে রেখে লাভ নেই। ভবন অনুমোদন থেকে নির্মাণ ও ব্যবহার—সব স্তরে কঠোর মনিটরিং এবং আইনভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাব যেন এই প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে যেতে না পারে, সে নিশ্চয়তা তৈরি না করলে কোনো পরিকল্পনাই ফলপ্রসূ হবে না।
দ্বিতীয়ত, ব্যাপক জনসচেতনতা ও অনুশীলন। ভূমিকম্পের সময় আতঙ্ক নয়, অভ্যাসই জীবন বাঁচায়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস, গণমাধ্যম, শিল্পকারখানা—সব জায়গায় নিয়মিত ড্রিল, প্রশিক্ষণ ও মহড়া চালু করা প্রয়োজন। বাচ্চারা যেমন আগুন লাগলে বা সড়ক পারাপারে কী করবে তা শেখে, তেমনি “ভূমিকম্প হলে কী করব”—এটিকেও প্রাত্যহিক জ্ঞানের অংশ করে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, শহর পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদি সংশোধন। সংকীর্ণ গলি, ঘিঞ্জি বসতি, উঁচু-নিচু ভবনের জঙ্গল—এই বাস্তবতায় ভূমিকম্প ঘটলে উদ্ধারকর্মীরাও ঢুকতে পারবে না অনেক এলাকায়। তাই নগর নবীকরণ, বিপজ্জনক ভবনের তালিকা ও ধাপে ধাপে অপসারণ, খালি মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ—এসবকে এখন কেবল “প্রকল্প” হিসেবে নয়, জীবনরক্ষার অপরিহার্য কৌশল হিসেবে দেখতে হবে।
আমাদের আরেকটি বড় ঘাটতি হলো মানসিকতা। আমরা দুর্যোগকে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিতে পছন্দ করি। “আল্লাহ বাঁচালে বাঁচব”—এ কথা বিশ্বাসের জায়গায় ঠিক আছে, কিন্তু রাষ্ট্র ও নাগরিকের দায়িত্ব এভাবে এড়ানো যায় না। সচেতন পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক বোধ, নৈতিক দায়িত্ববোধ—এই তিনটি ছাড়া কোনো শহরই নিরাপদ হয় না।
ঢাকার মানুষ আজও মনে রেখেছে ভবনের ফাটল, হেলে পড়া দালান, টালমাটাল আলোর ঝিলিক—কিন্তু সেই স্মৃতিকে কাজে লাগিয়ে আমরা কী শিখেছি?
এই শহরে কোটি মানুষের স্বপ্ন, শ্রম, স্মৃতি, সংগ্রাম—সব গাঁথা আছে ইট-বালি-সিমেন্টের ভেতর। ভূমিকম্পের প্রকৃত ঝুঁকি শুধু এই দেয়াল ভেঙে পড়ার ভয় নয়; ঝুঁকি হলো আমাদের গাফলতি, উদাসীনতা আর অল্প লোকের লোভের জন্য অগণিত মানুষের জীবনকে বাজি রাখা।
ভূমিকম্প ঠেকানো যায় না—কিন্তু ধ্বংস ঠেকানো যায়।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি এখনো ঘুমিয়ে থাকব, নাকি কাঁপনের আগেই জেগে উঠব?