আলী কদর পলাশ
বাংলাদেশের রাজনীতিকদের জন্য গতপরশুর ট্রাম্প–মামদানি বৈঠকটি এক ধরনের আয়না হয়ে দাঁড়াতে পারে। মাসের পর মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নিউইয়র্কের নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি মুখোমুখি বিরোধে ছিলেন—কঠোর সমালোচনা, কটুক্তি, আদর্শিক সংঘাত—কিছুই বাদ ছিল না। অথচ হোয়াইট হাউসে তাদের প্রথম সরাসরি বৈঠক হলো হাসিমুখ, সৌজন্য আর পারস্পরিক প্রশংসায় ভরা।
দুই ভিন্ন দলের, ভিন্ন মতাদর্শের, ভিন্ন প্রজন্মের এই দুই রাজনীতিক অভিবাসন থেকে অর্থনীতি—বেশিরভাগ প্রশ্নেই একে অন্যের সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে। তবু বৈঠকের পর ট্রাম্প বললেন, তিনি যা ভাবতেন তার চেয়েও বেশি বিষয়ে মামদানির সঙ্গে একমত হতে পেরেছেন; আর মামদানি বললেন, মতবিরোধের বিষয়গুলোকে পাশে রেখে নিউইয়র্কবাসীর সেবা করার সাধারণ লক্ষ্য নিয়েই আলোচনা হয়েছে। একসময়ের ‘কমিউনিস্ট’ তকমা দেওয়া তরুণ প্রতিপক্ষের কাঁধে হাত রেখে প্রশংসা করতে ট্রাম্পের দ্বিধা হয়নি, আবার বিতর্কিত প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও গঠনমূলক বৈঠকের জন্য মামদানির কৃতজ্ঞতা প্রকাশে কোনো সংকোচ দেখা যায়নি।
এই ছবিটা বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে তুলনা করলে ফারাকটা খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রায়ই ব্যক্তিগত শত্রু হিসেবে দেখা হয়, সমালোচনায় শিষ্টাচার হারিয়ে যায়, বিরোধীদের সঙ্গে একই টেবিলে বসে কথা বলাটাও অনেক সময় ‘দুর্বলতা’ হিসেবে বিবেচিত হয়। নির্বাচন, সংসদ, আন্দোলন—সব ক্ষেত্রেই যেন প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করা রাজনীতির প্রধান এজেন্ডা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ট্রাম্প–মামদানি আমাদের মনে করিয়ে দেন, রাজনীতি মানে কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়; নীতিগত বিরোধের মধ্যেও ব্যক্তিগত সৌজন্য অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব। গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য নির্ভর করে এই সক্ষমতার ওপর—আপনি তীব্র সমালোচনা করবেন, কিন্তু প্রয়োজনে হাসিমুখে বসে জনস্বার্থে কাজ করার পথও খুঁজে নেবেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি সত্যিই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে চান, তবে তাদের প্রথম পাঠ হতে পারে রাজনৈতিক শিষ্টাচার পুনরুদ্ধার। প্রতিপক্ষকে শত্রু না ভেবে নীতিগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা, কটূক্তির বদলে সংলাপের ভাষা শেখা, এবং ক্ষমতার হিসাবের বাইরে গিয়ে জনগণের কল্যাণকে ন্যূনতম অভিন্ন লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা—এগুলো কোনো বিলাসিতা নয়, টিকে থাকা রাষ্ট্রের শর্ত।
ট্রাম্প বা মামদানি কেউই নিখুঁত নন, তাদের রাজনীতি নিয়েও বিতর্ক আছে। কিন্তু মতবিরোধের মাঝেও সৌহার্দ্য ও সম্মানের যে পাঠ তারা এক বৈঠকে দেখালেন, তা আমাদের রাজনীতির জন্য এখন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এক শিক্ষা