আলী আহসান রবি :
ঢাকা : ২৮ জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
বাংলাদেশে ব্যবসা শুরুর গড় সময় ৩৫৫ দিন থেকে কমিয়ে ১৪ দিনের মধ্যে নতুন কোম্পানিকে মেশিনপত্র আমদানির এলসি খোলার পর্যায়ে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির।
রোববার জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করতে লাইসেন্স, ক্লিয়ারেন্স ও পারমিট প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের সংস্কার আনা হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু থেকে কার্যক্রমে যেতে প্রায় ৩৫৫ দিন সময় লাগে। এটি কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে একটি নতুন কোম্পানি মেশিনপত্র আমদানির এলসি খোলার পর্যায়ে যেতে মাত্র ১৪ দিন লাগবে।”
তবে সব ধরনের লাইসেন্স ১৪ দিনের মধ্যে দেওয়া সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ফায়ার লাইসেন্সসহ কিছু ক্ষেত্রে সরেজমিন পরিদর্শন ও যাচাই প্রয়োজন হবে।
তিনি জানান, বিভিন্ন সংস্থার পরিদর্শন কার্যক্রম সমন্বিত করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় কাঠামো গঠন করা হচ্ছে।
ট্রেড লাইসেন্স অনলাইনে
ট্রেড লাইসেন্স প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইনে নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে আর সরাসরি যেতে হবে না।
তিনি বলেন, “একটি অনলাইন পোর্টালে প্রবেশ করে আবেদন ও ফি জমা দিলেই ট্রেড লাইসেন্স ডাউনলোড করা যাবে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফি পৌঁছে যাবে।”
একই সঙ্গে আরজেএসসি, শেয়ার হস্তান্তর ও কোম্পানি অবসায়ন প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজ করার উদ্যোগ চলছে বলেও জানান তিনি।
বিনিয়োগ ও বাজেট প্রসঙ্গ
বাজেটের প্রশংসা করে মুক্তাদির বলেন, এবারের বাজেট তার প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তিনি বাজেটকে “স্টেবিলিটি, ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড গ্রোথ”-নির্ভর বলে উল্লেখ করেন।তিনি বলেন, বাজেটের মূল ফোকাস মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১৩.১ শতাংশে এবং স্বাস্থ্য খাতে ৬.৭১ শতাংশে উন্নীত করার তথ্যও তিনি তুলে ধরেন।
প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ও বিনিয়োগ কৌশল
মন্ত্রী বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে হলে ধারাবাহিক উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন জরুরি। তিনি বলেন, “৮.৫ থেকে ৯ শতাংশ বাস্তব প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব যদি বিনিয়োগ ও উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানো যায়।”
পাবলিক ও প্রাইভেট উভয় খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি আইসিওআর (ICOR) কমানোর ওপর জোর দেন তিনি।
লজিস্টিক ও মূল্যস্ফীতি
লজিস্টিক খরচ কমানোকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের অন্যতম উপায় হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে লজিস্টিক খরচ জিডিপির ১৬ শতাংশ, যা বৈশ্বিক মানের তুলনায় বেশি।
চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বাড়ালে পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
কৃষিপণ্যের দামে উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে বড় ব্যবধানের কথা তুলে ধরে তিনি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর জোর দেন।
জ্বালানি সংকট ও শিল্প উৎপাদন
জ্বালানি ঘাটতির কারণে ৫–৬ হাজার কোটি টাকার শিল্প প্রকল্প বন্ধ আছে বলে জানান মন্ত্রী।তিনি বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে অনেক উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তবে এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সার কারখানার জন্য পৃথক এলএনজি নেটওয়ার্ক তৈরির সম্ভাব্যতা নিয়েও কাজ চলছে বলে তিনি জানান।
সম্ভাবনাময় খাত
চামড়া ও পাট খাতকে ভবিষ্যতের বড় রপ্তানি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। চামড়া খাতে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সিইটিপি উন্নয়নের মাধ্যমে রপ্তানি ১০–১২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী।
পাট খাতে গবেষণা ও বহুমুখীকরণের মাধ্যমে নতুন বাজার তৈরির পরিকল্পনার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
মন্ত্রী আরো বলেন, বাজেটের লক্ষ্য হলো স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, বর্তমান নীতিমালার মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাবে।