কুমিল্লা প্রতিনিধি, মোঃ রমিজ উদ্দিন :
কুমিল্লার তিতাস উপজেলার ঐতিহ্যবাহী আসমানিয়া বাজারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পূর্বঘোষিত উচ্ছেদ অভিযানটি আজ মঙ্গলবার আকস্মিকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য, ইউপি জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষের মানবিক সুপারিশে জেলা পাউবো যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাকে আসমানিয়া বাজারের হাজারো খেটে খাওয়া মানুষ এবং সচেতন মহল আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাচ্ছে।
আপাতদৃষ্টিতে একশত ছিয়ানব্বই সাল থেকে গড়ে ওঠা এই বাজারের একশত বাইশটি ব্যবসায়ী পরিবারের জন্য একে সাময়িক স্বস্তি মনে হলেও, এই স্থগিতাদেশকে কেন্দ্র করে পর্দার আড়ালে এক নতুন সমীকরণ ও মুখরোচক গুঞ্জন ডালপালা মেলতে শুরু করেছে।
আজ একজন দায়িত্বশীল সংবাদকর্মী হিসেবে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে যে সত্য ও আইনি বাস্তবতা উঠে এসেছে, তা জনস্বার্থে ও আইনি সুরক্ষার্থে নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো।
অবৈধ ঘুষ, নাকি অস্তিত্ব রক্ষার আইনি লড়াই?
উচ্ছেদ অভিযান স্থগিত হওয়ার পরপরই একটি বিশেষ মহল বাজারে সুনির্দিষ্ট অপপ্রচার চালাচ্ছে যে উচ্ছেদ ঠেকাতে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা চাঁদা বা তহবিল তোলা হয়েছে এবং তা সংশ্লিষ্ট মহলে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের নিরপেক্ষ অনুসন্ধানে জানা যায়, বাজারে টাকা তোলার এই গুঞ্জনটি হয়তো পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এর পেছনের সত্যটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। জায়গাটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের হওয়ায় এবং দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে এখানে ব্যবসা পরিচালনা করায় মূল পজিশন হোল্ডার বা স্থাপনার মালিকরা একটি উগ্র উচ্ছেদ চক্রের আইনি ষড়যন্ত্র থেকে নিজেদের বৈধ ব্যবসা ও কোটি কোটি টাকার স্থাপনা রক্ষা করতে শেষ মুহূর্তে সম্মিলিতভাবে একটি ‘আইনি ও প্রশাসনিক লবিং ফান্ড’ বা ‘অস্তিত্ব রক্ষা তহবিল’ গঠন করতেই পারেন। যখন একটি পুরো বাজারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে, তখন নিজেদের টিকিয়ে রাখতে ব্যবসায়ীদের এমন সম্মিলিত প্রতিরোধ বা আইনি লড়াইয়ের চেষ্টা অত্যন্ত স্বাভাবিক ও যৌক্তিক।
অপপ্রচারকারীরা এই তহবিলের দায় ঢালাওভাবে সাধারণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর চাপালেও প্রকৃত সত্য হলো বাজারে মাসিক ভাড়ার ভিত্তিতে দোকান নিয়ে বসা শত শত নিরীহ ‘ভাড়াটে’ দোকানদারের সাথে এই কথিত তহবিলের দূরতম কোনো সম্পর্ক ছিল না। মূল পজিশন হোল্ডাররা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় কী প্রশাসনিক বা আইনি কৌশল অবলম্বন করেছেন, তা তদন্তের বিষয়; কিন্তু বড় বাস্তবতা হলো, এই স্থগিতাদেশের ফলে সবচেয়ে বড় উপকার হয়েছে সেই খেটে খাওয়া সাধারণ ভাড়াটে ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর। আজ উচ্ছেদ হলে হয়তো বড় বড় পজিশন হোল্ডারদের ব্যবসায়িক ক্ষতি হতো, কিন্তু শত শত নিরীহ ভাড়াটে দোকানদারকে সপরিবারে আজই রাস্তায় গিয়ে বসতে হতো।
জনপ্রতিনিধিরা উচ্ছেদ স্থগিতের সুপারিশ করে মূলত এই নিরীহ ভাড়াটেদের কান্নার প্রতিই সম্মান জানিয়েছেন।
আসল ‘অবৈধ’ ড্রেজিং সিন্ডিকেট নিয়ে নীরবতা কেন?
আসমানিয়া বাজারকে যারা আজ অবৈধ বলছেন, তাদের চোখ কেন বাজারের নাকের ডগায় চলমান প্রকৃত অপরাধের দিকে যায় না?
দড়িকান্দি ঈদগাহ ও কবরস্থানের সামনে দিন-রাত যে অবৈধ ড্রেজিং ও বালু বাণিজ্যের মহোৎসব চলছে, তা তো ১০ কোটি ৭৫ লাখ টাকার মেগা গার্ডার সেতুকে নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সাধারণ মানুষের ও প্রবাসীদের ১১ লাখ টাকার কষ্টের তহবিলে গড়া ঈদগাহ প্রতিরক্ষা দেয়াল ধসে পড়ার ঝুঁকির মুখে রয়েছে তার জন্য তো এই বালু সিন্ডিকেট দায়ী, বাজারের নিরীহ কোনো ভাড়াটে দোকানদার নয়।
কিলোমিটারের পর কিলোমিটার বিস্তৃত অবৈধ বালুর পাইপলাইন যা সরকারি বেড়িবাঁধ সড়কের নিচে বহাল তবিয়তে রেখে দেওয়া হয়েছে সেখানে কেন উচ্ছেদ আইনের হাত এত ছোট?
আসমানিয়া বাজারের মূল জায়গাটি কার বা কারা সেখানে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করেছে, সেটি দেখার দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসনের। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবিকা এবং একশত বাইশটি খেটে খাওয়া ভাড়াটে ব্যবসায়ী পরিবারের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের ও আমাদের নাগরিক দায়িত্ব।
আমরা স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি কোনো উসকানিমূলক নোংরা অপপ্রচারে কান না দিয়ে, এই ক্ষুদ্র ও ভাড়াটে ব্যবসায়ীদের স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা আগে করা হোক। মেগা প্রজেক্ট ধ্বংসকারী প্রকৃত বালু মহলের অবৈধ ড্রেজিংয়ের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হোক। জনগণের পেটে লাথি মেরে নয়, সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচিয়েই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব।সংবাদ সংগ্রহ সাংবাদিক সাকিব।