বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৯ পূর্বাহ্ন
ব্যাংক বীমা অর্থনিউজ
জুলাই শহীদদের গেজেট ও কবর সংরক্ষণে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে: প্রতিমন্ত্রী ইশরাক বাংলাদেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়াতে আগ্রহী রাশিয়া : কম দামে দিতে চায় ইউরিয়া সার ঝিকরগাছায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের শ্লীলতাহানির অভিযোগের পর ‘থলের বিড়াল’ বের হতে শুরু করেছে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক দক্ষতা অর্জন করতে হবে — মষমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন কুমিল্লা তিতাসে দুই পরিবারের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা কুমিল্লা তিতাস উপজেলা বিএনপিকে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের তিতাস উপজেলা নবগঠিত কমিটির ফুলেল শুভেচ্ছা সরকার ৩২ ডিসিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (IOM) নবনিযুক্ত চিফ অব মিশনের সাক্ষাৎ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করলেন কর্মসংস্থান ও সুশাসনকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের নির্ভুল অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরির নির্দেশনা স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর

পদ্মার অতল ও আমাদের বিপন্ন মনস্তত্ত্ব — একটি সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত সংকটের নির্মম প্রতিচ্ছবি

মো: তোসিকুল আলম বাবুল
  • প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬
  • ২৮ বার পড়া হয়েছে

মোঃ তোসিকুল আলম বাবুল :

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আলীনগর ঘাটসংলগ্ন পদ্মা নদীতে দুই তরুণের নিখোঁজ হওয়া এবং দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর গোধূলির নিস্তব্ধ আলোয় তাদের নিথর দেহ উদ্ধার—এ কেবল দুটি প্রাণের মর্মান্তিক অবসান নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার এবং ব্যক্তিমানসের বহুমাত্রিক ব্যর্থতার এক নির্মম প্রতিফলন। প্রতিটি এমন মৃত্যু যেন আমাদের সম্মিলিত বিবেকের সামনে নীরব কিন্তু কঠিন এক প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়—আমরা কি সত্যিই প্রতিটি ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নিচ্ছি, নাকি শোকের ক্ষণস্থায়ী আবেগে ভেসে গিয়ে আবারও বিস্মৃতির অন্ধকারে ফিরে যাচ্ছি?

এই দুটি মৃত্যু কেবল দুটি পরিবারের স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎকে ছিন্নভিন্ন করেনি; বরং আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাবোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতাকেও নগ্ন করে তুলেছে। যে নদী একসময় জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি, সভ্যতা ও সমৃদ্ধির উৎস ছিল, সেই নদী আজ কেন বহু মানুষের কাছে মৃত্যুর প্রতিশব্দ হয়ে উঠছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের শুধু নদীর দিকে তাকালেই হবে না; তাকাতে হবে নিজেদের দিকেও।

বাংলাদেশের ইতিহাস নদীমাতৃক, কিন্তু আমাদের বর্তমান বাস্তবতা যেন নদী-বিমুখ। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা কিংবা তিস্তা—এসব নদী কেবল ভৌগোলিক সীমানা নয়; এগুলো একটি জাতির অস্তিত্ব, অর্থনীতি, সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি এবং সভ্যতার প্রবাহমান ইতিহাস। অথচ আজ সেই নদীগুলোর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ক্রমশ ভয়ের, অনিশ্চয়তার এবং নিরাপত্তাহীনতার সম্পর্কে রূপ নিচ্ছে। প্রকৃতির এই পরিবর্তনের পেছনে যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে, তেমনি রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীনতা, অব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা অবকাঠামোর ঘাটতি।

জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে নদীর চরিত্র আগের তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চিত ও অপ্রত্যাশিত হয়ে উঠেছে। কোথাও আকস্মিক গভীরতা, কোথাও ঘূর্ণিস্রোত, কোথাও চোরাবালি, আবার কোথাও নদীতলের নীরব পরিবর্তন—সব মিলিয়ে নদী যেন প্রতিনিয়ত নিজের ভাষা বদলে ফেলছে। গতকাল যে স্থান নিরাপদ ছিল, আজ সেখানেই লুকিয়ে থাকতে পারে মৃত্যুর অদৃশ্য ফাঁদ। ফলে বহু প্রজন্মের অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা নদী-সংস্কৃতিও আজ নতুন বাস্তবতার সামনে অনেকাংশে অকার্যকর হয়ে পড়ছে।

তবে প্রকৃতিকে এককভাবে দায়ী করা সহজ, কিন্তু যথার্থ নয়। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ তখনই মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়, যখন সমাজ তার জন্য প্রস্তুত থাকে না। আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট প্রকৃতির অনিশ্চয়তা নয়; বরং প্রস্তুতির অনিশ্চয়তা। নদীমাতৃক দেশে বসবাস করেও অসংখ্য মানুষ সাঁতার জানেন না—এটি নিছক ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, শিক্ষাব্যবস্থা এবং সামাজিক অগ্রাধিকারের এক গভীর ঘাটতির প্রতিফলন।

পৃথিবীর বহু দেশে সাঁতার শেখা জীবনরক্ষাকারী মৌলিক দক্ষতা হিসেবে স্বীকৃত। অথচ বাংলাদেশে এটি এখনো অনেকাংশে পারিবারিক উদ্যোগ কিংবা ব্যক্তিগত সৌভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রতিবছর অসংখ্য শিশু, কিশোর ও তরুণ এমন মৃত্যুর শিকার হয়, যা সামান্য প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ থাকলে হয়তো এড়ানো সম্ভব ছিল।

কিন্তু সংকট শুধু শারীরিক নয়; এটি গভীরভাবে মনস্তাত্ত্বিকও। একের পর এক নদী দুর্ঘটনা মানুষের মধ্যে একটি সমষ্টিগত নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, যখন একটি সমাজ ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হয় অথচ কার্যকর প্রতিকার প্রত্যক্ষ করে না, তখন মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে এক ধরনের স্থায়ী ভীতিবোধ জন্ম নেয়। সেই ভয় কেবল নদীকে ঘিরে থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে মানুষের সিদ্ধান্তে, আচরণে, সন্তান লালন-পালনের পদ্ধতিতে এবং ভবিষ্যৎ কল্পনার ভেতরেও।

আজ নদীর ধারে যেতে ভয় পায় শিশু; অভিভাবক সন্তানকে নদীর কাছে যেতে নিরুৎসাহিত করেন; মাঝি, জেলে কিংবা কৃষকও আগের মতো নিশ্চিন্ত নন। নদীর প্রতি মানুষের এই পরিবর্তিত মনস্তত্ত্ব আসলে একটি বৃহত্তর সামাজিক সংকেত—আমরা শুধু নদীর ওপর নয়, নিজেদের প্রস্তুতির ওপরও আস্থা হারাতে শুরু করেছি।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, প্রতিটি দুর্ঘটনার পর আমাদের প্রতিক্রিয়া প্রায় একই রকম। আমরা শোক প্রকাশ করি, মানববন্ধন করি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহানুভূতির ঢেউ ওঠে, কিছুদিন আলোচনা হয়—তারপর সবকিছু আবার আগের মতো চলতে থাকে। কিন্তু দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান, নীতিগত পরিবর্তন কিংবা দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের উদ্যোগ তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ফলে ট্র্যাজেডি পুনরাবৃত্ত হয়, আর শোক হয়ে ওঠে আমাদের সামাজিক অভ্যাস।

এই বাস্তবতা বদলাতে হলে বিচ্ছিন্ন নয়, সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

নদীতীরবর্তী প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক সাঁতার শিক্ষা চালু করা সময়ের দাবি। সাঁতার কোনো বিলাসিতা নয়; এটি জীবনরক্ষাকারী দক্ষতা। পাশাপাশি প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ নদীঘাটে আধুনিক নিরাপত্তা অবকাঠামো—গভীরতা নির্দেশক, সতর্কবার্তা, লাইফ বয়া, লাইফ জ্যাকেট, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে প্রয়োজন স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, নৌ-পুলিশ, রেড ক্রিসেন্ট, স্কাউট ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী নদী-নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দুর্ঘটনার প্রথম কয়েক মিনিটই সবচেয়ে মূল্যবান; আর সেই মুহূর্তে দক্ষ উদ্ধারব্যবস্থাই জীবন ও মৃত্যুর পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে নদী গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ এবং তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনার ওপর আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। নদীর স্রোত, গভীরতা, তলদেশের পরিবর্তন এবং ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে জনগণকে আগাম সতর্ক করা সম্ভব। নিরাপত্তা কেবল প্রতিক্রিয়ার বিষয় নয়; এটি পূর্বপ্রস্তুতিরও বিষয়।

তবে সবশেষে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি প্রয়োজন আমাদের চিন্তায়। নদীকে ভয় করাও সমাধান নয়, আবার অজ্ঞতার কারণে অবহেলাও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকৃতিকে জয় করার অহংকার নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে সহাবস্থান করাই একটি পরিণত জাতির পরিচয়।

আলীনগর ঘাটের এই সলিলসমাধি আমাদের সামনে আবারও এক কঠিন প্রশ্ন রেখে গেছে—আমরা কি কয়েক দিনের শোক শেষে সব ভুলে যাব, নাকি এই মৃত্যুকে ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে গ্রহণ করব? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পরিণত জাতি কখনো ট্র্যাজেডিকে শুধু কান্নার কারণ বানায় না; তারা তাকে শিক্ষা, নীতি এবং পরিবর্তনের ভিত্তিতে রূপান্তরিত করে।

আজ আমাদের প্রয়োজন আবেগের চেয়ে অধিক দায়িত্ববোধ, সমবেদনার চেয়ে অধিক প্রস্তুতি এবং শোকের চেয়ে অধিক কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। কারণ প্রতিটি প্রাণ শুধু একটি পরিবারের সম্পদ নয়; একটি জাতির সম্ভাবনা। পদ্মার স্রোতকে থামানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু সেই স্রোতে অপ্রস্তুতির কারণে আর কোনো স্বপ্ন, সম্ভাবনা কিংবা ভবিষ্যৎ যেন হারিয়ে না যায়—এই অঙ্গীকারই হোক আমাদের সভ্যতার নতুন শপথ।

লেখকঃ কবি, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

এ বিভাগের আরো সংবাদ
©1992 All rights reserved
Design by: POPULAR HOST BD
themesba-lates1749691102