এম এম হোসাইন আহমেদ :
সাহিত্যের আঙিনায় কেউ আসেন নিছক আনন্দের খোরাক জোগাতে, আবার কেউ আসেন যুগের দাবি মেটাতে। মোঃ তোসিকুল আলম বাবুল দ্বিতীয় ঘরানার এমন একজন কারিগর, যার কাছে শব্দ মানেই শোষিত মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর কলম মানেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক তীক্ষ্ণ শাণিত কৃপাণ। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এই অস্থির সময়ে তিনি একাধারে সাহসী কবি, সংবেদনশীল ঔপন্যাসিক এবং তৃণমূল মানুষের প্রতিনিধি। তাঁর সাহিত্য কেবল কল্পনার বিলাসিতা নয়, বরং তা সমাজের এক নির্মোহ জলছবি।
তৃণমূলের দহন ও সাহিত্যের দায় মোঃ তোসিকুল আলম বাবুলকে বুঝতে হলে তাঁর সৃষ্টির শেকড়কে বুঝতে হবে। তিনি এমন এক লেখক, যিনি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে কল্পকাহিনী বোনেন না; বরং ধুলোবালিমাখা মানুষের ঘামের গন্ধ শুঁকে শব্দের মালা গাঁথেন। তাঁর উপন্যাস ‘পদ্মা পারে কান্না’ কিংবা ‘দহনের জনপদ’ পড়লে বোঝা যায়, গ্রামীণ রাজনীতি, বাল্যবিবাহ আর ভিলেজ পলিটিক্সের যাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর হৃদয়ে কতটা রক্তক্ষরণ হয়। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন লেখকের সার্থকতা তখনই, যখন তিনি প্রান্তিক মানুষের বঞ্চনা ও হাহাকারকে জাতীয় দরবারে তুলে ধরতে পারেন।
কল্পবিজ্ঞানে নতুনের সন্ধান: ‘লিকআর্থ’
কেবল সমাজবাস্তবতা নয়, বাবুলের সৃষ্টিশীলতার বিচরণ মহাকাশ আর অলৌকিক বিজ্ঞানের গূঢ় রহস্যেও। তাঁর সাম্প্রতিক সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘লিকআর্থ’ কেবল একটি রহস্যময় গল্প নয়, এটি অমরত্ব আর মানবিক অস্তিত্বের এক দার্শনিক বিশ্লেষণ। অমরত্বের আকাঙ্ক্ষায় মানুষ যে যন্ত্রণা ভোগ করতে পারে এবং বিজ্ঞানের দর্প যে প্রকৃতির নিয়মের কাছে তুচ্ছ—তা তিনি নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এখানে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, তিনি শুধু অতীতের চারণ নন, বরং ভবিষ্যতের স্বপ্নদ্রষ্টাও।
বিবেকের দর্পণে কাব্য ও সুর
কবিতার ক্ষেত্রে বাবুল এক অনন্য মরমী রূপকার। ‘বিবেকের জলছবি’ কিংবা ‘নীল চোখ’ কাব্যগ্রন্থে তিনি প্রেমকে যেমন দেখেছেন আধ্যাত্মিক আর শুদ্ধ চেতনার নিরিখে, তেমনি সমাজকে বিদ্ধ করেছেন শাণিত বিদ্রুপে। তাঁর কাব্যে প্রকৃতি আর মানবতা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আবার সুরের ভুবনে তাঁর সংকলন ‘সুরপুর’ প্রমাণ করে, তাঁর ভেতর লুকিয়ে থাকা এক সংগীতপ্রেমী সত্তাকে, যা শব্দকে ছন্দ আর সুরে প্রাণবন্ত করে তোলে।
শিশুতোষ সাহিত্যে নৈতিকতার বুনন
আগামী প্রজন্মের প্রতি দয়া ও দায়িত্ববোধ থেকে তিনি রচনা করেছেন ‘ছড়ায় ছড়ায় বর্ণ শিখি’ বা ‘আলোর মিছিল’-এর মতো আকর গ্রন্থ। আজকের প্রযুক্তিনির্ভর যান্ত্রিক জীবনে শিশুরা যখন মানবিক মূল্যবোধ হারাতে বসেছে, তখন তাঁর ‘আদর্শ শিশু গল্প’ যেন এক স্নিগ্ধ আলোর মশাল। শিশুদের জন্য তাঁর প্রতিটি শব্দ সহজ, সরল অথচ শিক্ষণীয়।
একনজরে শব্দ-যোদ্ধার সৃজন সম্ভার
উপন্যাস (বাস্তবতা ও রহস্যের মেলবন্ধন):
লিকআর্থ: মহাকাশ, অমরত্ব ও বিজ্ঞানের এক রোমাঞ্চকর আখ্যান।
মানুষ এবং মানুষ: মানবিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের গভীর চালচিত্র।
পদ্মা পারে কান্না: নদীমাতৃক জীবনের অবিনাশী সংগ্রাম।
সময় যখন থেমে যায় ও বর্ডার: অস্তিত্বের লড়াই ও ভৌগোলিক সংকটের প্রতিচ্ছবি।
কাব্য ও সুর:
তোমাকেই বলছি, বিবেকের জলছবি, নীল চোখ ও লাল নীল সবুজ: চেতনার রঙে রাঙানো কাব্যমালা।
সুরপুর: গানের ভুবনে এক মনোজ্ঞ বিচরণ।
গল্প ও সমাজ-বিশ্লেষণ:
দহনের জনপদ: গ্রামীণ রাজনীতি ও বাল্যবিবাহের নির্মম বাস্তব।
প্রযুক্তির যুগে: যান্ত্রিক জীবনের সুফল ও কুফলের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।
আঁধার চেরা রেখা ও বিকৃত মস্তিষ্ক: মনস্তত্ত্ব ও ভাসমান জীবনের আড়ালে থাকা সত্য।
ইতিহাস ও শিশুসাহিত্য:
মুজিব ও বাংলাদেশ (১ম ও ২য় খণ্ড): দেশপ্রেম ও ইতিহাসের সচিত্র দলিল।
খোকন সোনা ও আলোর মিছিল: শিশুদের মনন গঠনের নিপুণ কারিগরি।
উপসংহার: আলোর অভিযাত্রী
মোঃ তোসিকুল আলম বাবুলের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন ‘শব্দ যোদ্ধা’। তাঁর নিজের ভাষায়, “বিবেকের দায়ে লিখি—আলোয় ফেরার বিশ্বাসে।”
প্রতিকূল রাজনৈতিক আর সামাজিক পরিবেশেও তাঁর কলম কখনো নতজানু হয়নি। অন্যায়ের অন্ধকার চিরে তিনি সর্বদা এক ফালি আশার রেখা এঁকে দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, কলমের প্রতিটি আঁচড় যদি অন্তত একজনের হৃদয়ে মানবতা জাগিয়ে তুলতে পারে, তবেই লেখকের জনম সার্থক।
সাহিত্যের এই দীর্ঘ পথে তিনি কেবল একজন স্রষ্টা নন, তিনি পথহারা মানুষের জন্য এক আলোকবর্তিকা।
মোঃ তোসিকুল আলম বাবুল—যিনি শব্দের আশ্রয়ে মানুষকে মানুষ হতে শেখান এবং সমাজকে বিবেকের দর্পণে দাঁড় করান।