আলী আহসান রবি :
ঢাকা, ২৫ এপ্রিল ২০২৬:
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো: শফিকুল ইসলাম খান বলেছেন একই রাস্তা যেন বারবার খোড়াখুড়ি না করা লাগে এজন্য এখন থেকে আমরা কোনো রাস্তার কাজ শুরুর আগে ওয়াসা, বিটিসিএল, তিতাস গ্যাস সহ অন্যান্য সকল সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে চিঠি পাঠাবো যেন একবারেই সকল প্রতিষ্ঠানের ইউটিলিটি লাইন স্থাপন করে ফেলা যায়।
আজ শনিবার সকালে গুলশানের একটি হোটেলে ‘ঢাকা কি মৃত নগরী হতে যাচ্ছে? সমাধানে করণীয়’ শীর্ষক এক নগর সংলাপের প্রধান অতিথির বক্ত্যবে ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান এসব কথা বলেন। নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম বাংলাদেশ আয়োজিত এ নগর সংলাপে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির সভাপতি মতিন আব্দুল্লাহ।
এসময় প্রশাসক আরো বলেন, নগর সমস্যার সমাধানে কেবল সেমিনার নয়, বাস্তব কাজের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, “আমাদের দরকার কাজ করা। সেমিনার কম করবো, যতটুকু কাজ করবো তারপর সেমিনারে তা উপস্থাপন করবো।”
তিনি আরো বলেন, ফুটপাত থেকে হকারদের উচ্ছেদ করে দেয়া স্থায়ী সমাধান নয়। তাদের পুনর্বাসন না করলে উচ্ছেদ অভিযান করে কোনো লাভ হবে না। তাই হকারদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ৬টি খোলা মাঠে পাইলটিং আকারে বসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যেখানে নিবন্ধন নম্বরসহ তাদের বসানো হবে।
তিনি জানান, প্যারিস খাল গত দুই মাসে ৯ বার পরিষ্কার করা হলেও পুনরায় ময়লা ফেলার কারণে একই অবস্থা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, নাগরিক সচেতনতা ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
এছাড়া তিনি বলেন, নগরে শব্দদূষণ কমাতে হলে গাড়ি শোরুম থেকেই হর্নবিহীন গাড়ি বাজারজাত করার বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে।
শফিকুল ইসলাম খান আরও বলেন, ‘নগরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমরা যা করি, তার অধিকাংশই সাময়িক। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।’ ওয়াসা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে একটি কর্তৃপক্ষের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হাসান ইমনের সঞ্চালনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নগর অধিকার কর্মী ও গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার ওমর সাদাত৷
সংলাপে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘নগর সেবাগুলোকে এক ছাতার নিচে আনা গেলে সমন্বয়হীনতা কমবে এবং সেবার মান বাড়বে। তথ্যের ঘাটতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে।’
কড়াইল বস্তি নিয়ে রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, ‘কড়াইলে বহুতল ভবন নয়, বস্তি বহাল রেখেই নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা হবে। প্রধানমন্ত্রী কড়াইল বস্তির বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করছেন, এজন্য রাজউকের পক্ষ থেকে আমরা সেখানে বারবার গিয়েছি; বস্তিবাসী সেখানে বহুতল ভবন চান না বলেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রাজধানীর যানজট নিরসনে পার্কিং স্পেস উদ্ধারে কাজ চলছে। যেসব ভবন পার্কিং এর স্থানে অবকাঠামো করে রেখেছেন তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে৷ এ সময় তিনি গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নতির বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি পূর্বাচল প্রকল্পকে সক্রিয় করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
ঢাকা ওয়াসার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আলমগীর হাছিন আহমেদ বলেন, ‘নগরীর বিভিন্ন স্থানে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণাধীন থাকলেও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কাজ ব্যাহত হচ্ছে। দেখা গেছে একই প্রকল্প পাঁচ বছরে শেষ করার কথা থাকলেও সেটি ১২ বছর লেগে যায়৷ এতে করে কোন কাজ সময় মতো করতে পারছি না৷ আমরা মেঘনা, শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা থেকে পানি আনছি৷ প্রায় ৫১ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে পানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে৷ প্রয়োজনে ১৫০ কিলোমিটার করা হবে৷ বাধ্য হলে বঙ্গোপসাগর থেকে পানি আনার ব্যবস্থা করতে হবে৷’
স্থপতি সুজাউল ইসলাম খান বলেন, ‘শুধু কাগজে পরিকল্পনা থাকলে হবে না, তা বাস্তবায়ন করতে হবে। রাজধানীর অধিকাংশ সুবিধা গুলশান-বনানীর মতো অভিজাত ৫ শতাংশ মানুষের জন্য সীমাবদ্ধ, অথচ কড়াইল বস্তির মতো এলাকায় সেই সুবিধা পৌঁছায়নি। আমরা শুধু পরিকল্পনাই করছি কিন্তু কোন বাস্তবায়ন নাই৷’
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের ডেপুটি ট্রান্সপোর্ট প্লানার ধ্রুব আলম বলেন, ‘ঢাকা মহানগরী গণপরিবনের জন্য ২০ বছরের একটি পরিকল্পনার কাজ চলমান রয়েছে৷ বিভিন্ন বাস মালিক সংগঠনগুলোর সাথে আমরা সমন্বয় করে ঢাকার ৪২ টি রুট থেকে কমিয়ে ৩২টিতে আনার চেষ্টা করছি৷ একটি রুটে এক কম্পানিরই বাস চলবে৷ এভাবে বাস চলাচল হলে ঢাকার গণপরিবহন শৃঙ্খলা হবে৷ এ বছরের মধ্যেই এই পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস রুটে নামানো হবে৷’
অনুষ্ঠানে এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান, পরিবেশবিদ আইনজীবী সৈয়দ মাহবুবুল আলম প্রমুখ৷