নিজস্ব প্রতিবেদক:
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) মাত্র ১০ কর্মদিবসে নিয়োগ কার্যক্রম শেষ করার নির্দেশ দেওয়ায় সংস্থার ভেতরে ও বাইরে উদ্বেগ ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। নিয়োগের এমন তড়িঘড়ি উদ্যোগ স্বচ্ছতা ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
গত বছরের এপ্রিলে আইডিআরএ ১৯টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলেও সাড়ে আট মাসেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। অথচ ভোটের তফসিল ঘোষণার পর চলতি মাসে হঠাৎ করেই দ্রুত নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তা নতুন করে আলোচনায় আসে।
নির্দেশনা অনুযায়ী একজন সদস্যকে আহ্বায়ক, একজন উপসচিবকে সদস্যসচিব এবং একজন নির্বাহী পরিচালককে নিয়ে বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন প্রতিনিধি ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) একজন প্রতিনিধি থাকলেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি। আপাতত ষষ্ঠ ও সপ্তম গ্রেডের দুটি পদে ছয়জনকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
আইডিআরএ সূত্র জানায়, ৩১ জানুয়ারি লিখিত পরীক্ষা এবং পরদিন মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে দ্রুত চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। শুরুতে লিখিত পরীক্ষার নম্বর ছিল ৫০, পরে তা বাড়িয়ে ৯০ করা হয় এবং মোট ১০০ নম্বরের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এভাবে হঠাৎ নম্বর কাঠামো বদলানো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক গণমাধ্যমে বলেন, “মাত্র ১০ দিনে নিয়োগ কীভাবে সম্ভব—তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিষয়টি আমি খোঁজ নেব।” তাঁর বক্তব্যে প্রক্রিয়ার গতি ও মানদণ্ড নিয়ে সংশয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
আইডিআরএর প্রবিধানমালায় বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষ এক বা একাধিক বাছাই কমিটি গঠন করতে পারবে। তবে কমিটির সদস্যসংখ্যা, কাঠামো ও প্রতিনিধিত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে এই বিধান দুর্বলতা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, স্পষ্ট কাঠামো না থাকায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জায়গা সংকুচিত হয়।
চাকরি বিধিবিধান বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া বলেন, “লিখিত পরীক্ষার আগে প্রার্থীদের প্রস্তুতির জন্য কমপক্ষে ১৫ কর্মদিবস সময় দেওয়া একটি প্রচলিত মানদণ্ড। ১০ দিনে সব শেষ করার নজির নেই। এতে আইনি চ্যালেঞ্জ আসার সম্ভাবনা আছে।” তিনি আরও বলেন, তড়িঘড়ি প্রক্রিয়া আদালতে প্রশ্নবিদ্ধ হলে পুরো নিয়োগ বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান এম আসলাম আলমকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি ২০১২ সালে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার পর ওই বিভাগ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তড়িঘড়ি নিয়োগ প্রসঙ্গে জানতে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ফোন করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। প্রশ্ন পাঠিয়েও কোনো উত্তর মেলেনি।
এদিকে আইডিআরএর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ উঠেছে। কয়েকটি কোম্পানির সিইও নিয়োগের ক্ষেত্রে আইন-কানুন শিথিল করা হয়েছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কোম্পানির সিইও বলেন, “ যোগ্যতার মাপকাঠিতে নয় তদবিরের মাপকাঠিতে উক্ত কোম্পানিতে ইতিমধ্যে সিইও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বড় গ্রুপের কোম্পানিগুলো মোটা অঙ্কের তদবির করে এই প্রক্রিয়ায় সফল হয়েছে।” তিনি আরও দাবি করেন, যোগ্যতার মানদণ্ড ও প্রক্রিয়ার শর্তে শিথিলতা এনে নির্দিষ্ট প্রার্থীদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সময়, কাঠামো ও নম্বর বণ্টনে হঠাৎ পরিবর্তন—সব মিলিয়ে স্বচ্ছতার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সংস্থায় নিয়োগে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হলে পরিষ্কার গাইডলাইন, পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সময়, এবং প্রতিনিধিত্বশীল বাছাই কমিটি অপরিহার্য। অন্যথায় আস্থার সংকট বাড়বে এবং আইনি জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
সার্বিকভাবে, আইডিআরএতে ১০ কর্মদিবসে নিয়োগ শেষ করার নির্দেশ শুধু প্রশাসনিক তড়িঘড়ি নয়, বরং নীতিগত প্রশ্নও তুলছে। অভিযোগগুলো যথাযথভাবে খতিয়ে দেখে স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত না করা হলে এই নিয়োগ ভবিষ্যতে বড় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে বলে মনে করছেন