কুমিল্লা প্রতিনিধি, মোঃ রমিজ উদ্দিন :
কুমিল্লার তিতাস ও মেঘনা উপজেলার চরাঞ্চলে চর দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে নিহত কোহিনূর বেগম হত্যার সুষ্ঠু বিচার এবং সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া।
রবিবার সকালে তিনি প্রথমে মেঘনা উপজেলার আলীপুর ও চর বিনোদপুর এবং পরে তিতাস উপজেলার নতুন বাটেরাচর গ্রাম পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি নিহত কোহিনূরের পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেন এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন। পরে তিনি চলমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রশাসনকে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এমপি সেলিম ভূঁইয়া বলেন, “আজকে আমি এখানে এসে মানুষের যে হাহাকার দেখেছি ও শুনেছি, তা সত্যিই হৃদয়বিদারক। কোহিনূর একটি নিরীহ মেয়ে ছিল। সে কোনো রাজনীতি কিংবা চর দখলের বিরোধ বুঝত না। যারা তাকে হত্যা করেছে, তারা যেই হোক না কেন, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। আমি নিহতের পরিবারকে আশ্বস্ত করছি—কোহিনূর হত্যার বিচার অবশ্যই হবে।”
তিনি বলেন, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেউ যেন ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল বা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার সুযোগ না পায়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। অতীতে বিরোধ নিরসনের জন্য দুই উপজেলার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সংসদ সদস্য আরও বলেন, তিনি সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন। এসে জেনেছেন, হত্যা মামলায় ইতোমধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীরা কেউই আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে পারবে না।
এমপি সেলিম ভূঁইয়া বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা ও ক্ষয়ক্ষতির প্রতিকার চেয়েছেন। প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে লুটপাট ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আইন নিজের গতিতেই চলবে, কেউ যেন আইন নিজের হাতে তুলে না নেন।
এ সময় তিতাস থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মমিরুল হক, মেঘনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম, তিতাস উপজেলা বিএনপির সভাপতি ওসমান গনি ভূঁইয়া, মেঘনা উপজেলা ওদুদ চেয়ারম্যান, তিতাস উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সালাহউদ্দিন সরকার, সিনিয়র সহসভাপতি হাজী আলী হোসেন মোল্লা,সহসভাপতি
আশরাফুল আলম সরকার, মজিদপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মাজেদুল ইসলাম মিন্টু, মো.দেলোয়ার হোসেন সরকার,জসিমউদদীন চেয়ারম্যান, মজিদপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তন্ময় হাসান কাজলসহ দুই উপজেলার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে শনিবার সকালে তিতাস উপজেলার মজিদপুর ইউনিয়নের নতুন বাটেরাচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসীর উদ্যোগে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে গ্রামবাসী দাবি করেন, কোহিনূর হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় নিরীহ মানুষকে আসামি করায় প্রায় ৯০টি পরিবার গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। গ্রেপ্তার আতঙ্কে অধিকাংশ পুরুষ আত্মগোপনে থাকায় পুরো গ্রাম কার্যত নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, সংঘর্ষের পর একাধিক দফায় তাদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থ, গবাদিপশু, ট্রলার, বালুর শিপ, হাঁস-মুরগি ও ঘরের আসবাবপত্রসহ প্রায় ৯০টি পরিবারের আনুমানিক সাত কোটি টাকার সম্পদ লুট হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। বর্তমানে অনেক পরিবার রাস্তার পাশে, আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি কিংবা খোলা জায়গায় আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
গ্রামবাসীর লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়, গত ২৬ জুলাই তিতাস উপজেলার নতুন বাটেরাচর গ্রামের দুই ব্যক্তি ব্যক্তিগত কাজে মেঘনা উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে গেলে তাদের মারধর ও আটকে রাখার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই উপজেলার বাসিন্দাদের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। পরে টেঁটাযুদ্ধে অন্তত ৪০ জন আহত হন। সংঘর্ষ চলাকালে মেঘনা উপজেলার চর বিনোদপুর গ্রামের কোহিনূর বেগম গলায় টেঁটাবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
এ ঘটনায় নিহতের স্বামী কাবিল মিয়া বাদী হয়ে নতুন বাটেরাচর গ্রামের ৬১ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় ইতোমধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে গ্রামবাসী তিন দফা দাবি উত্থাপন করেন। তারা ফরেনসিক ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত হত্যাকারীদের শনাক্ত, হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের দাবি জানান।