মাহমুদ আলহাছান, জলঢাকা, নীলফামারী :
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আমেজ বইছে সারা দেশব্যাপী। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল পিআর ও জুলাই সনদ নিয়ে মাঠে আন্দোলনে থাকলেও সংসদ নির্বাচনে আসন ওয়ারী প্রার্থী নির্বাচন ও জনমত নিজেদের পক্ষে নিতে উঠোন বৈঠক, পথসভা সহ মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন তাদের প্রার্থীগন।
নীলফামারী-৩ (জলঢাকা) আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি আন্যান্য অনেক আসনের মতো এখনো তাদের প্রার্থী চুড়ান্ত করতে না পারলেও ধারনা করা হচ্ছে জলঢাকা উপজেলার সাবেক দুইবারের উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব সৈয়দ আলী সাহেব প্রার্থীতা প্রাপ্তীর দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন। তিনি ইতোপূর্বে জামায়াতের প্রত্যক্ষ সমর্থনে দুইবার জলঢাকা উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং জামায়াত সমর্থিত চেয়ারম্যান হওয়ার কারনে তৎকালীন আওয়ামী মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হক একবার জলঢাকায় তাঁর একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে ‘রাজাকার কেনো আমার অনুষ্ঠানে’ বলে উষ্মা প্রকাশ করে সভাস্থল ত্যাগ করেছিলেন।
জনাব সৈয়দ আলী সাহেব নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন, বিএনপি নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন, বিভিন্ন ইউনিয়নে পথসভা, উঠোন বৈঠক করে জনমত গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দুইবার উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার সুবাদে তাঁর একটা বড় ভোট ব্যাংক আছে বলে তাঁর কর্মী-সমর্থকগন মনে করেন।
বিগত আওয়ামী শাসনামলে জনাব সৈয়দ আলী সাহেব উপজেলা চেয়ারম্যান হিসাবে তাঁর দায়িত্ব পালনকালীন বিরোধী রাজনীতিক হওয়া সত্বেও সরকার বিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তেমন অংশগ্রহন না থাকায় তাঁকে জেল জুলুম সহ তেমন বড় কোনো রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হতে হয় নি। তবে রাজনৈতিক পরিমন্ডলের বাইরে বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা, মন্দিরে তাঁর অকাতর অনুদানের ফলে সাধারন জনগনের মাঝে জনাব সৈয়দ আলীর বিশেষ গ্রহনযোগ্যতা রয়েছে বলে সচেতন মহল মনে করেন।
বিএনপি’র অপর প্রার্থী জলঢাকা উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব জনাব মঈনুল ইসলামও প্রার্থীতার জন্যে জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতাদের দ্বারস্থ হচ্ছেন। আওয়ামী শাসনামলে নেতাকর্মীদের পাশে থাকা ও আন্দোলন সংগ্রামে সামনের সারিতে থাকার সুবাদে বারবার কারা নির্যাতিত নেতা হিসাবে স্থানীয় নেতাকর্মীদের কাছে তাঁর মোটামোটি গ্রহনযোগ্যতা রয়েছে বলে তিনি এই প্রতিবেদককে জানান। তিনিও মাঠে সক্রিয় রয়েছেন এবং বিএনপিকে তাঁর পক্ষে সংগঠিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
জলঢাকা বিএনপি’র সাবেক সভাপতি, জলঢাকা পৌরসভার সাবেক মেয়র জনাব ফাহমিদ ফয়সাল কমেট চৌধুরী জলঢাকায় বিএনপির রাজনীতিতে একটি বড় ফ্যাক্টর বলে বিএনপি নেতাকর্মীগন মনে করেন। জনাব চৌধুরীর একটি সংরক্ষিত ভোট ব্যাংক আছে এবং উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতাকর্মী তাঁর প্রতি আস্থাশীল বলে তিনি জানান।
তবে, বিগত ২০১৮ সালের ডামি নির্বাচনে আওয়ামীলীগের ডামি প্রার্থী সাদ্দাম হোসেন পাভেলের পক্ষে নির্বাচনে পরোক্ষ ভূমিকা রাখা, উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামিলীগের তৎকালীন উপজেলা সভাপতি জনাব আনছার আলী মিন্টুর উপজেলা নির্বাচনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহন করা ও দলের নির্দেশ অমান্য করে পৌরসভা নির্বাচনে অংশগ্রহন করার অভিযোগে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সংগঠন জনাব কমেট চৌধুরীকে দল থেকে বহিস্কার করে। বর্তমানে বহিস্কৃত এই নেতা তার বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহারে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, জনাব তারেক রহমান দেশে ফিরে এলেই তাঁর বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার হবে এবং এই আসনে বিএনপি’র নমিনেশন তিনিই পাবেন বলে দৃঢ়ভাবে আশাবাদি। এই লক্ষ্য নিয়ে তিনিও সবার অলক্ষ্যে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন এবং নেতাকর্মীদের সংগঠিত রাখার আপ্রান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
দলের মনেনয়ন প্রাপ্তির এই ত্রিমুখী লড়াইয়ে বিএনপি কতোটা নিজেকে সুসংগঠিত রাখতে পারবে এবং জাতীয় নির্বাচনে মেলে ধরতে পারবে সে বিষয়ে কথা থেকেই যায়।
উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে সংঘটিত ১১ টি সংসদ নির্বাচনের মধ্যে ১৯৯৬ সালে বিএনপি’র করা বিতর্কিত নির্বাচনে জনাব কমেট চৌধুরীর মরহুম পিতা জনাব আনোয়ারুল কবির চৌধুরী ১৫ দিনের জন্যে এমপি নির্বাচিত হওয়া ছাড়া এই আসনে কখনোই বিএনপি নির্বাচিত হতে পারে নি। সেই পরিসংখ্যান অনুসারে এবারের নির্বাচনে বিএনপি কতোটা সফল হবে তা নির্ভর করছে তাদের মধ্যেকার দলীয় বিভাজন ও পারস্পরিক মতানৈক্য ভুলে তারা কতেটা সংগঠিত হতে পারেন এবং জনগনের আস্থা অর্জন করতে পারেন তার উপর।
অপরপক্ষে এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সালাফী। সাবেক এই ছাত্রনেতা ছাত্রজীবনে জলঢাকা উপজেলা শিবিরের সভাপতি, রংপুর মহানগর সভাপতি, কেন্দ্রীয় সেক্রেটারিয়েটের সদস্য ও রংপুর মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি ছিলেন। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অধিকারী এই জামায়াত নেতা জলঢাকার গ্রামে গঞ্জে ছুটে বেড়াচ্ছেন, গণসংযোগ, পথসভা করছেন, জনসমর্থন পক্ষে নেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
নীলফামারী-৩ (জলঢাকার) এই আসনটি বরাবরই জামায়াতের জন্যে একটি উইনিং স্পট। স্বাধীনতার পরে যে ক’টি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তার মধ্যে তিনবার জামায়াতের প্রার্থী এমপি নির্বাচিত হয়েছে। ১৯৮৬ সালে মরহুম জবান উদ্দিন আহমদ, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম মিজানুর রহমান চৌধুরী এই আসনে জামায়াতের টিকেটে এমপি নির্বাচিত হন। জামায়াতের সাংগঠনিক ট্রাডিশন ও সিস্টেমের কারনে কোনো আসনেই তাদের একাধিক প্রার্থী হওয়ার তেমন সুযোগ নেই। এইদিক থেকে নিজ দলীয় প্রতিপক্ষ মোকাবেলায় শক্তিক্ষয়ের ঝামেলা না থাকায় নির্ভার ওবায়দুল্লাহ সালাফী নির্ঝঞ্ঝাটে নির্বাচনী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এই আসনে জামায়াতের গণভিত্তি বেশ মজবুত, এটি তাদের নির্বাচনী কার্যক্রমে বাড়তি সুবিধা যোগ করছে নিসন্দেহে।
তবে, দীর্ঘদিন নিজ এলাকার বাইরে অবস্থান করা ও এলাকার সাথে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা না থাকায় সাধারন ভোটারের কাছে তাঁর পরিচিতির সঙ্কট রয়েছে। জামায়াতের বিগ-ফেস খ্যাত কিছু নেতার নির্লিপ্ততা, বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্টের আমলে নির্যাতিত নিপীড়িত নেতা কর্মীদের সাথে উপজেলা নেতৃত্বের সমন্বয়হীনতা ও অবমুল্যায়ন, হিন্দু ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষনে ব্যার্থতা, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস জামায়াতের জন্য সম্ভাবনাময় এই আসনকে চ্যালেঞ্জিং করে তুলতে পারে বলে সচেতন মহল মনে করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জলঢাকা পৌর জামায়াতের একজন কর্মী এই প্রতিবেদককে বলেন- কর্মীসভা ডেকে শুধু রুকন নেতাগন বক্তব্য দেয়, কর্মীদের কথা, সমস্যা, পরামর্শ কোনোকিছুই বলার সুযোগ দেয় না, এটা তো কর্মীবান্ধব কোনো সংগঠনের চরিত্র হতে পারে না।
জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপি জলঢাকায় শুরুতে সম্ভাবনা সৃষ্টি করলেও ধীরে ধীরে জলঢাকার রাজনীতিতে নিজেদের অপ্রাসঙ্গিক করে তুলছে। জুলাই আন্দোলনের স্টেক হোল্ডার তরুনদের নিয়ে দলটির যাত্রা জনমনে আশার সঞ্চার করলেও জলঢাকায় দলটির নেতৃত্বের সঙ্কট, অন্তঃকলহ, নেতাদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অভাব, আস্থাহীনতা, দলটির ভিতরে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। উপজেলা কমিটিতে থাকা ২৩ সদস্যের মধ্যে প্রথম সারির কয়েকজন নেতার ইতোমধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে।
এনসিপি নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের জন্য প্রাথমিকভাবে মনোনিত হলেও এখনও তাদের প্রতীক বরাদ্দ হয় নি। জলঢাকায় তারা সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী দিবে কি না কিংবা দিলেও প্রার্থী কে হবেন সেটা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে ধারনা করা হচ্ছে এনসিপি এই আসনে নির্বাচন করলে এনসিপি’র কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সংগঠক আবু সাঈদ লিওন প্রার্থী হতে পারেন।
দলের আভ্যন্তরীন সঙ্কট কেটে পরিপক্ক ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব সৃষ্টি করে জনগনের আস্থা অর্জন করতে পারলে এবং বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলেো জন আকাঙ্খা পূরনে ব্যার্থ হলে এনসিপি পরবর্তী নির্বাচনে চমক দেখাতে পারে।