কুমিল্লা তিতাস, মোঃ রমিজ উদ্দিন :
কুমিল্লা তিতাস নারান্দিয়া কলিমিয়া উচ্চ বিদ্যালয় এর প্রতিষ্ঠাতা ডঃ এম. আর. খাঁন ১৩২৮ বঙ্গাব্দের ২১ শে বৈশাখ নারান্দিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মৌলভী আব্দুর রশিদ খাঁন, দাদা কলিমুদ্দিন মুন্সি। তিনি তার দাদার প্রতিষ্ঠিত নারান্দিয়া জুনিয়র মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে পরবর্তীতে ঢাকা ইসলামিয়া হাই মাদ্রাসা থেকে পাঁচটি বিষয়ে স্টার মার্ক সহ তদানীন্তন বাংলাদেশের সমগ্র ঢাকা বোর্ডের মেট্রিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯৪১ সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে একই বোর্ডের অধীনে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় তৃতীয় স্থান লাভ করেন। ১৯৪৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণীতে অনার্স ও ১৯৪৫ সালে পুষ্টিবিজ্ঞানে এমএসসি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে চাকরি গ্রহণ করেন। কলেজ জীবনে ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।
উচ্চতর ডিগ্রি লাভের জন্য তিনি ১৯৪৬ সালে কানাডায় গমন করেন। সেখানে তাঁর গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল প্রখ্যাত সামুদ্রিক মাছ হেলিবার্ট প্রায় বিলুপ্তির কারণ নির্ণয় করা। কৃতিত্বপূর্ণ গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ১৯৪৮ সালেএম.এ ও ১৯৫০ সালে একই বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করেন। ডিগ্রি লাভের পর ডক্টর খান দেশে ফিরে আসলে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাঁকে করাচিতে কেন্দ্রীয় সামুদ্রিক মৎস্য বিভাগের উপপরিচালক নিয়োগ করেন। পরবর্তীতে পাকিস্তানের পূর্বাংশে চট্টগ্রামে অনুরূপ একটি সামুদ্রিক মৎস্য বিভাগ সংগঠনের দায়িত্ব দেয়া হলে মাত্র এক বছরে ডক্টর খাঁন কেন্দ্রীয় পূর্ব শাখা গঠন করেন এবং বঙ্গোপসাগরে মৎস্য সম্পদ আহরণ, সংরক্ষণ ও বিতরণ ইত্যাদি বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের নিকট একটি ৭ মালা পরিকল্পনা পেশ করেন। মূলত তার প্রচেষ্টায়ই ১৯৫৩ সালে করাচিতে ও পরে চট্টগ্রামে মৎস্য পোত হিসেবে গড়ে ওঠে। মৎস্য শিল্প উন্নয়নে তাঁর কৃতিত্বের জন্য জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা থাকে ব্যাংকক, এশিয়া ও দূর প্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য মৎস্য সম্পদ উন্নয়ন উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থায় প্রধান কার্যালয় রোমে মৎস্য সম্পদ সংক্রান্ত বিশ্ব সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত সমগ্র ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে খাদ্য ও কৃষি গবেষণায় FAO এর সকল প্রযুক্তি ও আর্থিক সাহায্যের সমন্বয় করেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ তথা সুদান, ইরাক, ইরান, ইয়েমেনে FAO এর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। এসময় বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ১৯৭১ সালের পহেলা এপ্রিল FAO থেকে ছুটি নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ের জন্য তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক সফর শুরু করেন। ১৯৭৪ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের বিশ্ব শিশু তহবিলের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালে ড. খাঁন শিশু ও কৃষি সংস্থা থেকে পদত্যাগ করে তার নিজ গ্রাম নারান্দিয়ায় ফিরে আসেন এবং উন্নয়নের দার্শনিক ভিত্তি ত্রিবর্গীয় জনগণ, জমি ও জল এই তিনের শতকরা ৯০ ভাগ বাংলার পল্লীতে বিদ্যমান আছে দেখে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে নিজ গ্রাম নারান্দিয়া সহ পার্শ্ববর্তী ৫টি গ্রামের সমন্বয়ে একটি স্বনির্ভর কর্মসূচির পরিকল্পনা প্রণয়ন করলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সমর্থনে এর বাস্তবায়ন শুরু হয়। কিন্তু পরে উহা বেশিদূর এগোয়নি। ১৯৭৩ সালে তিনি নারান্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করেন। বিপুল ভোট পাওয়া সত্ত্বেও তৎকালীন সরকার তাকে জোর করে হারিয়ে দেয়।
১৯৭৭ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি জিয়াউর রহমান সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইউপি নির্বাচন ১৯৭৩, উপনির্বাচন ১৯৮১ জুন, ১৯৮১ সালে তিনি সংসদ পদে দাউদকান্দি থানায় উপ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিযোগিতা করেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন ইলিয়টগঞ্জের মুন্সিবাড়ির জনাব আলী মুন্সী। নির্বাচন সারা দাউদকান্দির আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছিলো ড. এম. আর খাঁন। সাধারণ মানুষ চেয়েছিল এম.আর. খাঁনকে সংসদ সদস্য হিসেবে পেতে, কিন্তু সরকারের কালো হাত তাকে জোর করে পরাজিত করে। তার পঞ্চাশটির মতো প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও পুস্তিকা প্রকাশিত হয়েছে। জাতিসংঘে চাকুরী করা কালে দক্ষিণ আমেরিকান দেশসমূহ ছাড়া পৃথিবীর খুব কম দেশই আছে যেখানে তিনি ভ্রমণ করেননি।
১৯৬৫ সালে তিনি হজ্ব পালন করেন। আজীবন অধ্যবসাই ড. খান এর ব্যক্তিগত পাঠাগারটি ছিল বেশ উন্নত মানের। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে শুরু করে বিশ্বের সব দার্শনিক, চিন্তাবিদ, বৈজ্ঞানিক ও সাহিত্যিকদের মৌলিক রচনাবলী ডক্টর খাঁনের পাঠাগারে রক্ষিত ছিল। সঙ্গীত চর্চা ও নাট্যাভিনয়ের প্রতি তার গভীর অনুরাগ ছিল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি সাহিত্য চর্চা করতেন। তাঁর দুই ছেলে দুই মেয়ে। তারা ৫ ভাই। ১. ড.এম.আর খাঁন, ২. ড. কর্নেল মোশারফ, ৩. মশিউর রহমান, ৪. মাহবুবুর রহমান ও ৫. মাহফুজুর রহমান। তিনি ১৯৮২ সালে হঠাৎ অকালে মৃত্যুবরণ করেন। তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান “নারান্দিয়া কলিমিয়া উচ্চ বিদ্যালয়” যা আজীবন তার স্মৃতিকে ধরে রাখবে এবং স্মরণ করবে। তাঁর জীবনী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।