আলী আহসান রবি :
০৪ জুন, ২০২৫
আপনারা হয়ত অবগত আছেন যে, মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আগামী ১০ থেকে ১৩ জুন ২০২৫ তারিখে যুক্তরাজ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক সরকারি সফরে যাচ্ছেন। সফরটি উপলক্ষ্যে তিনি আগামী ৯ জুন ২০২৫ তারিখে লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন এবং সফর শেষে আগামী ১৪ জুন ২০২৫ তারিখে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করবেন।
আপনারা জানেন, য ক্তরাজ্য বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম একটি দেশ। দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে।
যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রথম দিকের দেশগুলোর মধ্যে একটি, যারা বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় আট লক্ষ প্রবাসী বাংলাদেশী বসবাস করছে, যারা বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে। তাছাড়া, দেশটি বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্যও উচ্চশিক্ষার একটি পছন্দের গন্তব্য হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার এবং বিনিয়োগকারী দেশ। যুক্তরাজ্য দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক খাতে বাংলাদেশকে নিয়মিতভাবে সহায়তা করে যাচ্ছে।
তাছাড়া, কমনওয়েলথভুক্ত দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের সাথে একযোগে কাজ করে আসছে। রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলা এবং সন্ত্রাসবাদ দমনের মতো বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ইস্যুতে যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায়ও যুক্তরাজ্যের সমর্থন বাংলাদেশের জন্য সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
এসকল বিষয়াদি বিবেচনায় এই সফরটি বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে বিদ্যমান চমৎকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ও ফলপ্রসূ করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে আশা করছি।
তবে, এগুলোর বাইরেও আরো কয়েকটি কারণে সফরটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
প্রথমতঃ, বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা প্রথমবারের মতো ইউরোপের কোন দেশে দ্বিপাক্ষিক সফরে যাচ্ছেন।
দ্বিতীয়তঃ, যুক্তরাজ্য একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং তারা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গণতান্ত্রাক মূল্যবোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দেয়। এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে চলমান সংস্কার কার্যক্রম, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অঙ্গীকারের বিষয়টি তুলে ধরা সম্ভব হবে।
এবং সর্বোপরি একজন নোবেল বিজয়ী ও বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তি হিসেবে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার বিশ্বজুড়ে একটি স্বতন্ত্র ও ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে। তাঁর মতো একজন ব্যক্তিত্বের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে যুক্তরাজ্য সফর বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সমুজ্জ্বল ও সুসংহত করবে।
আলোচ্য সফরে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা যুক্তরাজ্যের রাজা তৃতীয় চার্লসের সাথে সাক্ষাৎ (audience) করবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। আপনারা জানেন, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে যুক্তরাজ্যের রাজার অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে, রাজা চার্লসের সাথে সাক্ষাতের বিষয়টি একটি সম্মানজনক কূটনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
সফরকালে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার-এর সাথে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া, যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন বিষয়ক সেক্রেটারি অফ স্টেট জনাব ডেভিড ল্যামি, কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, রাজনৈতিক নে্যুন্দ ও থিংক ট্যাঙ্কের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ মাননীয় উপদেষ্টার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে পারেন বলে আশা করা যাচ্ছে।
আপনারা জানেন যে, ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্যের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের নতুন দিক উন্মোচন হয়েছে। উক্ত বৈঠকগুলোতেও বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হবে। বিশেষ করে, যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, জিএসপি প্লাস প্রাপ্তি, নতুন ব্রিটিশ বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরো গতিশীল করার ক্ষেত্রে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা রাখছি। তাছাড়া, শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিনিময়, তথ্য-প্রযুক্তি, সামাজিক উদ্ভাবন, মানবাধিকার, অভিবাসন, জ্বালানি ও নিরাপত্তা সহযোগিতাসহ বিভিন্ন খাতে সয়াহতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হবার কথা রয়েছে।
একই সাথে এই সফরে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক
সহযোগিতা গভীরতর করা। সহায়তা ও প্রযুক্তি বিনিময়ের বিষয়
লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যুক্তরাজ্যের বে বলে ধারণা করা যাচ্ছে।
আপনারা জানেন, রোহিঙগা সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সহযোগিতা গভীরতর করা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যুক্তরাজ্যের সহায়তা ও প্রযুক্তি বিনিময়ের বিষয়গুলোও প্রাধান্য পাবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে।
আপনারা জানেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
যুক্তরাজ্য বরাবরই আন্তর্জাতিক ফোরামে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন দিয়ে আসছে। এই সফরে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন এবং এই মানবিক সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে আরও জোরালো সমর্থন ও সহায়তা চাইবেন।
এর পাশাপাশি দু’দেশের পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। এই আলোচনাগুলো উভয় দেশের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তাছাড়া, সফরকালে কমনওয়েলথ এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্র চলাচল সংস্থা (International Maritime Organization) এর মহাসচিবদ্বয় মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে পারেন।
দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ছাড়াও মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা আগামী ১১ জুন ২০২৫ তারিখে লন্ডনের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান Chatham House-এ একটি বিশেষ আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন। এই আলোচনায় তিনি বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবেন।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুরা,
আপনারা জেনে আনন্দিত হবেন যে, মানুষ, প্রকৃতি ও পরিবেশের মধ্যে সঙ্গতিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিতকরণ, সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন সাধন এবং একটি শান্তিপূর্ণ, সৌহার্দ্যময় ও টেকসই পৃথিবী বিনির্মাণের চলমান প্রচেষ্টায় অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ যুক্তরাজ্যের মহামান্য রাজা তৃতীয় চার্লস এ বছরের সম্মানজনক ‘King Charles III Harmony Award’ -এর জন্য মাননীয় প্রধান উপদেষ্টাকে মনোনীত করেছেন।
আগামী ১২ জুন ২০২৫ তারিখে লন্ডনের সেন্ট জেমস’স প্যালেসে আযোজিতব্য এক অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা রাজা তৃতীয় চার্লসের কাছ থেকে এই পুরস্কার গ্রহণ করবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। এটি কেবল মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বাংলাদেশের জন্যও এক অসামান্য মর্যাদা ও গৌরবের অনন্য স্বীকৃতি। এই পুরস্কার বিশ্ব মঞ্চে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে আরও দৃপ্ত ও উজ্জ্বল করবে।
আপনাদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি যে, সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা, টেকসই সম্প্রদায় গঠন, প্রায়োগিক ও বাস্তবসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও স্থাপত্যকলার লালন ও প্রসার এবং সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী উদ্যোগসমূকে উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে রাজা তৃতীয় চার্লস তথা
তৎকালীন প্রিন্স অব ওয়েলস ১৯৯০ সালে ‘দ্য কিংস ফাউন্ডেশন’ নামক যুক্তরাজ্যভিত্তিক দাতব্য সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেন। গত বছর অর্থাৎ, ২০২৪ সালে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলা ও টেকসই উন্নয়নে অনবদ্য অবদান রাখায় ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব জনাব বান কি-মুনকে সম্মানসূচক King Charles III Harmony Award- এ ভূষিত করা হয়।
তাছাড়া, দ্য কিংস ফাউন্ডেশন তার ৩৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আগামী ১১ জুন ২০২৫ তারিখ সন্ধ্যায় একটি বিশেষ নৈশভোজের আয়োজন করেছে। মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা এই নৈশভোজেও যোগ দেবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, এই সফর বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার ঐতিহ্যবাহী বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরো গভীর ও সুসংহত করবে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করবে। দু’দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেবে এবং চলমান গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।