বিশেষ প্রতিবেদনঃ বীমা খাতে সুশাসন, পেশাদারিত্ব ও ভালো পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি দিতে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) ‘আইডিআরএ ইন্স্যুরেন্স এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’ আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে। তবে পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত কোম্পানিগুলোর তালিকা প্রকাশের পর থেকেই খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি সত্যিকারের যোগ্যতার স্বীকৃতি, নাকি ‘অ্যাওয়ার্ড বাণিজ্য’-এর একটি রূপ?
আইডিআরএ জানিয়েছে, লাইফ ও নন-লাইফ খাত মিলিয়ে মোট ১৩টি প্রতিষ্ঠানকে এই পুরস্কার দেওয়া হবে। এর মধ্যে নন-লাইফ খাতে ৭টি এবং লাইফ খাতে ৬টি প্রতিষ্ঠানকে ‘সেরা’ হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। ১৮ জানুয়ারি আইডিআরএ’র নির্বাহী পরিচালক (নন-লাইফ) মনিরা বেগমের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বীমা খাতে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি, জনসাধারণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ভালো কাজকে উৎসাহিত করাই এই অ্যাওয়ার্ডের লক্ষ্য। আইডিআরএ’র ১৯২তম সভায় উদ্যোগটি অনুমোদনের পর লাইফ ও নন-লাইফ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর সুশাসন, পরিচালনা ও পারফরম্যান্স বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে প্রথম থেকে পঞ্চম স্থান নির্ধারণ করা হয়।
তবে প্রশ্ন উঠেছে—এই মূল্যায়নে কোন কোন মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে, সেই বিষয়ে আইডিআরএ কেন কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি? কোন সূচকে কত নম্বর, কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে—এসব কিছুই প্রকাশ করা হয়নি। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা নিয়েই সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১০-এর ১৫ ধারায় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ও কার্যাবলি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও, সেখানে কোথাও বীমা কোম্পানিকে ‘পুরস্কার’ দেওয়ার বিধান নেই। ফলে আইনগতভাবেও এই উদ্যোগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা হলো—কিছু প্রতিষ্ঠান আইন ও নিয়ন্ত্রক শর্ত লঙ্ঘন করেও ‘এক্সিলেন্স’ তালিকায় জায়গা পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বীমা আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া বাধ্যতামূলক। অথচ নির্বাচিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ধরে এ শর্ত পূরণ করছে না বলে খাত সংশ্লিষ্টদের দাবি।
এছাড়া আইন অনুযায়ী কোনো বীমা কোম্পানির সিইও পদ তিন মাসের বেশি শূন্য রাখা যায় না, প্রয়োজনে আরও তিন মাস সময় দেওয়া যায়। ছয় মাসের বেশি শূন্য থাকলে প্রশাসক নিয়োগের বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কিছু প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে সিইও পদ শূন্য থাকা সত্ত্বেও তারা পুরস্কারের তালিকায় এসেছে—যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভাবমূর্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচিত তালিকায় এমন কিছু প্রতিষ্ঠান আছে যারা এখনও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়। এর মধ্যে সাধারণ বীমা করপোরেশন, মেটলাইফ, জীবন বীমা করপোরেশন ও গার্ডিয়ান লাইফের নাম উঠে এসেছে। গার্ডিয়ান লাইফের ক্ষেত্রে জানা গেছে, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত সিইও পদ শূন্য ছিল।
এছাড়া প্রথম থেকে পঞ্চম স্থান নির্ধারণ করা হলেও কেন একই অবস্থানে একাধিক প্রতিষ্ঠানকে রাখা হয়েছে, সে বিষয়েও আইডিআরএ’র পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
নন-লাইফ খাতে প্রথম স্থানে প্রগতি ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড, দ্বিতীয় স্থানে সাধারণ বীমা করপোরেশন, তৃতীয় রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স পিএলসি, চতুর্থ গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি এবং পঞ্চম স্থানে যৌথভাবে ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স পিএলসি, সেনা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি ও ইউনাইটেড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড রয়েছে।
লাইফ খাতে প্রথম মেটলাইফ, দ্বিতীয় প্রগতি লাইফ, তৃতীয় ডেল্টা লাইফ, চতুর্থ জীবন বীমা করপোরেশন এবং পঞ্চম স্থানে যৌথভাবে ন্যাশনাল লাইফ ও গার্ডিয়ান লাইফ রয়েছে।
খাতের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, আইন ও নিয়ন্ত্রক শর্তে যেসব প্রতিষ্ঠান কার্যত অযোগ্য, তাদের ‘সেরা’ ঘোষণা করা হলে নিয়ম মেনে চলা প্রতিষ্ঠানগুলো নিরুৎসাহিত হবে। এতে ভালো কাজের সংস্কৃতির বদলে অনিয়মের পথই প্রশস্ত হয়।
তাদের অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠানের পারফরম্যান্স তুলনামূলকভাবে দুর্বল হলেও তারা তালিকায় এসেছে। এতে বোঝা যায়, পারফরম্যান্স নয়, অন্য বিবেচনাই এখানে মুখ্য ছিল। পাশাপাশি কোনো অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়নি, মূল্যায়নের কাগজপত্র বা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আইডিআরএ জানিয়েছে, অনুষ্ঠানের খরচ বহন করবে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলো। অনেকের কাছে এটি ‘সম্মান কিনে নেওয়া’র মতো মনে হচ্ছে।
একটি নির্বাচিত কোম্পানির সিইও বলেন, উদ্যোগটি ভালো, কিন্তু কিছু নাম দেখে আমরাও বিস্মিত। স্বচ্ছতা না থাকলে এমন আয়োজন বিতর্ক তৈরি করবেই।
অন্য একজন সিইও বলেন, আমাদের বলা হয়েছে খরচ বহন করতে হবে, কিন্তু কত টাকা—তা জানানো হয়নি। কোনো আলোচনা বা সমঝোতাও হয়নি।
আইডিআরএ’র মিডিয়া ও যোগাযোগ উপদেষ্টা ও মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, সরকারিভাবে এ খাতে কোনো বাজেট নেই। তাই কোম্পানিগুলো যৌথভাবে ব্যয় বহন করবে। তাঁর দাবি, এর বাইরে কোনো লেনদেন নেই।
আইন লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কার দেওয়ার অভিযোগে তিনি বলেন, “ওরকম কিছু নয়। সব ব্যাখ্যা পরে দেওয়া হবে।” অতালিকাভুক্ত কোম্পানির বিষয়ে প্রশ্ন করলে প্রথমে তিনি অস্বীকার করেন, পরে বলেন—সবকিছু পরে জানানো হবে।
এদিকে অনুষ্ঠান আয়োজনের সময় মিডিয়াকে অনুমতি না দেওয়াও সন্দেহ বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রশ্নের জবাব না এলে এবং নিয়মিতভাবে অনিয়মের বিষয়গুলো উন্মোচিত না হলে এ ধারা অব্যাহত থাকবে।