এম হোসাইন আহমদ, বিশেষ প্রতিবেদনঃ
সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়—এটি একটি দায়িত্ব, একটি প্রতিরোধ এবং একটি নৈতিক অবস্থান। সমাজের বিবেক ও রাষ্ট্রের দর্পণ হিসেবে পরিচিত সাংবাদিক সমাজ যখন নানামুখী সংকট, অবহেলা ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে পথ চলেছে, তখন ঐক্যই ছিল তাদের একমাত্র শক্তি। সেই ঐক্যের চার দশকেরও বেশি সময়ের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের সাক্ষী হয়ে আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার উদ্যোগে জাতীয় সাংবাদিক সম্মেলন ২০২৫।
২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে দিনব্যাপী এই সম্মেলন ও কর্মশালায় দেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা থেকে আগত প্রায় ১২০০ সাংবাদিক অংশগ্রহণ করছেন। সম্মেলনে উপস্থিত রয়েছেন দেশের বরেণ্য সাংবাদিক, বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ এবং জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন ইউনিটের নেতৃবৃন্দ। বিশেষভাবে উপস্থিত রয়েছেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি মুহাম্মদ আলতাফ হোসেন—যার হাত ধরে গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ সাংবাদিক সংগঠন।
সাংবাদিকদের সংগ্রাম ও বাস্তবতা
একজন সাংবাদিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বহুবার অপমানিত হয়েছেন, নাজেহাল হয়েছেন, আহত হয়েছেন, এমনকি প্রাণও দিয়েছেন। সত্য প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, হুমকি ও শারীরিক হামলা নতুন কিছু নয়। রাজনৈতিক দল, প্রভাবশালী মহল ও ব্যক্তিস্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর রোষানলে পড়েও সাংবাদিক সমাজ কখনো সত্য প্রকাশে আপস করেনি।
বাস্তবতা হলো—সাংবাদিকদের সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে তাদের আর্থিক অবস্থার কোনো সামঞ্জস্য নেই। বহু সাংবাদিক পরিবার নিয়ে ন্যূনতম নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন যাপন থেকেও বঞ্চিত। বিলাসিতা তো দূরের কথা, স্বাভাবিক মানবিক চাহিদা পূরণও অনেকের জন্য কষ্টসাধ্য। তবুও রাষ্ট্র ও সমাজের অনিয়ম, দুর্নীতি, মজুদদারি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং জুলুমবাজদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকরাই সবচেয়ে দৃঢ় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিরস্ত্র কলমের লড়াই
সাংবাদিকদের হাতে কোনো অস্ত্র নেই। তাদের সম্বল একটি কলম, একটি ক্যামেরা আর অদম্য মনোবল। অথচ এই নিরস্ত্র সাংবাদিকদের ওপর জঙ্গি কায়দায় হামলা হয়েছে, ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়েছে, মারধর করা হয়েছে। বহু ক্ষেত্রে প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েও সাংবাদিকরা ব্যর্থ হয়েছেন। তারপরও বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের প্রতিবাদ কখনো থেমে থাকেনি, থামবেও না।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—সাংবাদিকরা সাংঘাতিক না হলে সমাজের অপরাধচক্র, দুর্নীতির সিন্ডিকেট ও ক্ষমতার অপব্যবহার কীভাবে উন্মোচিত হতো? প্রতিদিন সকালে রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও অনলাইন মাধ্যমে যে খবর মানুষ পায়, তা সাংবাদিকদের নিরলস শ্রম ও ঝুঁকির ফসল।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: সাংবাদিক ঐক্যের শেকড়
বাংলাদেশে সাংবাদিক অধিকার আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯৫১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। সেদিন ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক সভায় পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন (ইপিইউজে) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় বাংলাদেশ সাংবাদিক ফেডারেশন, যা পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) নামে আত্মপ্রকাশ করে। অন্যদিকে ১৯৬১ সালে গঠিত হয় মফস্বল সাংবাদিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি। কিন্তু সংবাদপত্রের সংখ্যা বাড়লেও এবং সাংবাদিকতা ছড়িয়ে পড়লেও দেশের সর্বস্তরের সাংবাদিকদের জন্য একটি সর্বজনীন প্ল্যাটফর্ম তখনও অনুপস্থিত ছিল। বিশেষ করে সাপ্তাহিক, সাময়িক ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাংবাদিকরা মূলধারার সংগঠনে জায়গা পাচ্ছিলেন না।
জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার জন্ম ও ভূমিকা
এই বাস্তবতা গভীরভাবে অনুধাবন করেন মুহাম্মদ আলতাফ হোসেন। তার সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, সাহস ও দায়বদ্ধতা থেকেই জন্ম নেয় জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা।
১৯৮২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক নবজাগরণ পত্রিকার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় মাত্র ১১ জন সাংবাদিক নিয়ে গঠিত হয় জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার আহ্বায়ক কমিটি। লক্ষ্য ছিল—দেশের সব স্তরের সাংবাদিকদের জন্য একটি অরাজনৈতিক, নিরপেক্ষ ও কল্যাণমুখী সংগঠন গড়ে তোলা।
সংগঠন গঠনের অল্প সময়ের মধ্যেই সামরিক শাসন জারি হলেও জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার অগ্রযাত্রা থামেনি। বাধা, সমালোচনা ও বিরোধিতার মুখেও মুহাম্মদ আলতাফ হোসেন সারাদেশে সংগঠনের পরিধি বিস্তৃত করেন। আজ জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা সরকারি নিবন্ধনপ্রাপ্ত, অরাজনৈতিক ও নিরপেক্ষ সংগঠন হিসেবে দেশে-বিদেশে হাজারো সদস্য নিয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত।
প্রতিষ্ঠাতার অবদান ও নৈতিক দায়
৪৪ বছর ধরে মুহাম্মদ আলতাফ হোসেন সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। অনেক সংগঠন প্রতিষ্ঠাতা হারিয়ে ফেলে, কিন্তু জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা তার প্রতিষ্ঠাতাকে ধারণ করে এগিয়ে চলছে। সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও ইউনিট নেতৃবৃন্দের দায়িত্ব—তার আদর্শ ধারণ করা এবং আজীবন প্রতিষ্ঠাতার মর্যাদা বাস্তবায়ন করা।
আজ বার্ধক্য তাকে স্পর্শ করলেও কর্মচেতনায় তিনি এখনও তরুণ। সাংবাদিক সমাজের অধিকার আদায়ে তার ভূমিকা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সম্মেলনের তাৎপর্য ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা
জাতীয় সাংবাদিক সম্মেলন ২০২৫-এ সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি, কল্যাণ তহবিল, আইনি সহায়তা, প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ ও আন্তর্জাতিক সংযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হচ্ছে। এই সম্মেলন সাংবাদিক ঐক্যের নতুন প্রত্যয় ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা নির্ধারণ করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
উপসংহার
জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার উদ্যোগে আয়োজিত এই জাতীয় সাংবাদিক সম্মেলন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়; এটি সাংবাদিক সমাজের আত্মমর্যাদা, ঐক্য ও নৈতিক অবস্থানের পুনর্নিশ্চয়তা। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো এই সংগঠন আগামীতেও সাংবাদিকদের পাশে থাকবে—এই প্রত্যাশাই আজকের সম্মেলনের মূল বার্তা।
লেখক পরিচিতি:
এম হোসাইন আহমদ
প্রচার সচিব, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ
জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা