রাশেদুজ্জামান সুমন, জলঢাকা নীলফামারী প্রতিনিধি :
নীলফামারী জলঢাকায় শিক্ষা কর্মকর্তাদের তৎপরতা না থাকায় ও শিক্ষকদের উদাসীনতার কারণে ভেঙ্গে পড়েছে প্রাথমিকের শিক্ষা ব্যবস্থা। লেখা পড়ার মান কমে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা সরকারি বিদ্যালয় ছেড়ে সাধারণ কিন্ডার গার্ডেন স্কুলের দিকে ঝুঁকছে। যাদের বেতন সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের থেকে দশ ভাগের এক ভাগ। অন্যদিকে শিক্ষক, সরকারি, কর্মকর্তারাও তাদের সন্তানের সরকারি স্কুলে না পড়িয়ে তারাও বিভিন্ন বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করান। এতে করে ভেস্তে যাচ্ছে শিক্ষার মান বাড়ানোর জন্য সরকারের কোটি কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, উপজেলায় ২৪৮ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খাতা কলমে শিক্ষার্থী রয়েছে ৩৬ হাজার পাঁচশ ৭৭ জন। শিক্ষক, শিক্ষিকার সংখ্যা ১ হাজার তিনশত সতের জন । দপ্তরী কাম প্রহরী ৮২ জন। এদের তদারকি করার জন্য রয়েছেন একজন শিক্ষা অফিসার আট জন সহকারী শিক্ষা অফিসার ও দুইজন কর্মচারী। এদের পিছনে সরকার প্রতিমাসে শিক্ষকদের জন্য ৩ কোটি ৪২ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা। দপ্তরী কাম প্রহরীরদের বেতন ১৩ লক্ষ ৭৫ হাজার তিনশত ছিয়াশি টাকা এবং অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বেতন ছয় লক্ষ ৬০ হাজার টাকা। এসব বিদ্যালয়ের জন্য প্রতিমাসের বিদ্যুৎ বিল এক লক্ষ ৬০ হাজার টাকা। এছাড়াও ঈদ পূজার সহ বিভিন্ন ভাতা তো রয়েছে। সরকার শুধু এক উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষার জন্য এতগুলো টাকা খরচ করলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। সরেজমিনে গিয়ে লক্ষ্য করা গেছে, কোনো স্কুলে শিক্ষার্থী নেই। শিক্ষার্থী থাকলেও কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষক নেই। আবার কোনো স্কুলে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক থাকলেও পাঠদানের ঘাটতি। সিংহভাগ স্কুলে শিক্ষকরা সময়মতো বিদ্যালয়ে যায় না। গেলেও ছুটির আগেই চলে আসে। অথচ এসব বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে।
এসব বিষয় বিভিন্ন মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবগত হলেও শিক্ষকদের শোকজ শাস্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। পরবর্তীতে আর কোনো ব্যাবস্হা গ্রহণ করা হয় না। এই সামান্য শাস্তিতে শিক্ষকদেরও কিছু যায় আসে না। এজন্য তারা নিজের খেয়াল খুশি মতই বিদ্যালয়ে আসা যাওয়া করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সহকারী শিক্ষক জানান আমাদের এখানে দুই মাসেও একজন অফিসার আসে না। তাই কোনো জবাবদিহি নেই। তাই যে যার মত আসা যাওয়া করি। তবিবর রহমান নামের এক অবিভাবক জানান,” একটা সরকারি স্কুলের শিক্ষক বেতন পায় ৩০ হাজার টাকা। অথচ সেই শিক্ষকরা তাদের বাচ্চাদের পাঠিয়ে দেন মাত্র পাঁচ হাজার টাকা বেতনের এক বেসরকারি শিক্ষককের কাছে। এতেই বোঝা যায় তারা নিজের সন্তানকেও পড়ার ভরসা পাননা। অথচ সরকারি শিক্ষকরা কত ট্রেনিং করে বাচ্চাদের লেখাপড়া শেখারনোর জন্য। জলঢাকা সচেতন নাগরিক সমাজের আহবায়ক আনোয়ার হোসেন জানান ” জলঢাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গুলোতে ভালো করে লেখাপড়া হয় না। এজন্য শিক্ষক সহ সব সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীর ছেলেমেয়েরা কিন্ডার গার্ডেন স্কুলে লেখাপড়া করে। তাদের সন্তানদের যদি সরকারি স্কুলে পড়াতো তাহলে অন্য অবিভাবকরাও উৎসাহ পেতো। তারা এখন শুধু বেতন নেয়ার জন্য স্কুল যায়। তারা আগের শিক্ষকদের মত আন্তরিক নয়। আমিও তো প্রাইমারি স্কুলে পড়েছি। আমি কি মানুষ হইনি?’
জলঢাকা মডেল সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহমুদুল হক বলেন’ সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীর ছেলে মেয়েরা যদি সরকারি স্কুলে পড়ত তাহলে এর মান অনেক ভালো হতো। তাদের দেখে অনেক অভিভাবক উৎসাহ পেত। দুঃখের বিষয় জলঢাকায় এতো সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী থাকলেও এখানে চার পাচ জনের বাচ্চা লেখাপড়া করে । অথচ তারা সরকারের কাছ থেকে ঠিকই শিক্ষা ভাতা নিয়ে থাকে’। বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুলের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) আজিজার রহমান জানান” আমার এখানে স্কুল শাখায় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, কর্মচারীর প্রায় ২৫০ জন সন্তান লেখাপড়া করে। এরমধ্যে এক সহকারি শিক্ষা কর্মকর্তার সন্তানও রয়েছে”।
উপজেলা শিক্ষা অফিসার শরিফা আকতার বলেন ” প্রাথমিক শিক্ষাকে এগিয়ে নেয়ার জন্য অনেক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সামনে সবকিছুই পরিবর্তন হবে। আমার এখানে সহকারী শিক্ষা অফিসার কম থাকায় মনিটরিং কম হয়। সরকারি স্কুলে যদি সরকারি লোকের বাচ্চারা না পড়া দুঃখজনক”।