আলী আহসান রবি :
ঢাকা, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের আওতাধীন পদ্মা সেতুতে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ETC) ব্যবস্থাপনা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের মাইলফলক অর্জন করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী সারা বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ETC) এর মাধ্যমে টোল কালেকশন নতুন গতি পেয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ী ম্যানুয়াল টোল আদায় ব্যবস্থার পরিবর্তে সারাদেশে একক ও অভিন্ন পদ্ধতিতে ক্যাশলেস ও ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করার লক্ষ্যে করার লক্ষ্যে গৃহীত এই উদ্যোগটি সেতু ব্যবহারকারীদের দ্রুত আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
২৬ জুলাই ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত ETC-এর মাধ্যমে মোট টোল আদায় হয়েছে ১০,০৮,২৪,৬০০ টাকা, যা ১০ কোটি টাকার মাইলফলক অতিক্রমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এছাড়া, পদ্মা সেতুতে নিয়মিত যাতায়াতকারী দূরপাল্লার বাস, বাণিজ্যিক ট্রাক ও ব্যক্তিগত গাড়িসহ ETC-তে নিবন্ধিত মোট যানবাহনের সংখ্যা ১,০০৮-এ উন্নীত হয়েছে। পরিষেবাটি চালুর পর থেকে ২৬ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত মোট ৫৬,৪০৬টি যানবাহন ইলেকট্রনিক উপায়ে (ক্যাশলেস) টোল প্রদান করে নির্বিঘ্নে সেতু অতিক্রম করেছে।
এই যুগান্তকারী অর্জন উপলক্ষ্যে সেতু বিভাগের সচিব এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক জনাব মোহাম্মদ আবদুর রউফ তাঁর বিশেষ অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, সড়ক পরিবহণে শৃঙ্খলা আনয়নের লক্ষ্যে এবং ETC-এর মাধ্যমে যানবাহনের টোল আদায় করত: জনগণকে স্বস্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য প্রদানের নিমিত্ত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী এবং মাননীয় প্রতিমন্ত্রীর সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনা, নিবিড় তদারকি এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শের কারণে পদ্মা সেতুতে আধুনিক অটোমেটেড টোল কালেকশন ব্যবস্থা অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
সেতু সচিব আরও বলেন, ETC সিস্টেমে ১০ কোটি টাকার বেশি টোল সংগ্রহ এবং ১ হাজারের বেশি যানবাহন নিবন্ধিত হওয়া শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের গণপরিবহন খাতকে প্রযুক্তিবান্ধব ও ক্যাশলেস করার ক্ষেত্রে এক বিরাট সাফল্য ও অগ্রগতি । আমি এই অর্জনের জন্য সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী, কারিগরি অংশীদার, পরিবহন মালিক সমিতি এবং আস্থা রাখা সকল সেতু ব্যবহারকারীকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই।
সেতু ব্যবহারকারীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে পদ্মা সেতুর টোল আদায় প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত সহজ ও দ্রুততর করা হয়েছে। যেকোনো গ্রাহক ‘ট্যাপ’, ‘বিকাশ’, ‘নগদ’, ‘উপায়’-এর মতো জনপ্রিয় মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের মোবাইল ও ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে অতি সহজেই টোল পরিশোধ করতে পারছেন। এর ফলে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে নগদ টাকায় লেনদেনের ভোগান্তি পুরোপুরি নিরসন হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস এর অ্যাপ এবং ট্রাস্ট ব্যাংকের TAP অ্যাপ, মিডল্যান্ড ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের অ্যাপ-এর মাধ্যমে পদ্মা সেতুর টোল পরিশোধ করা যাচ্ছে।
ব্যবহারকারীরা সংশ্লিষ্ট অ্যাপে “D-Toll” অপশনের অধীনে “মোটরযান রেজিস্ট্রেশন করুন”-এ প্রবেশ করে গাড়ির নম্বর এবং চেসিস নম্বরের শেষ ৪ (চার) ডিজিট প্রদান করে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে পারবেন। নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়ার পর “D-Toll Top-Up” সেবার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পরিমাণ অর্থ রিচার্জ করতে হবে। এরপর প্রথমবারের জন্য পদ্মা সেতুর মাওয়া টোল প্লাজার নিকটস্থ রেজিস্ট্রেশন বুথ অথবা টোল বুথে গিয়ে বিআরটিএ অনুমোদিত RFID ট্যাগ যাচাইয়ের মাধ্যমে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। একবার নিবন্ধন সম্পন্ন হলে ব্যবহারকারীরা ETC লেন ব্যবহার করে নির্বিঘ্নে পদ্মা সেতু পারাপার করতে পারবেন। ETC ব্যবহারের জন্য BRTA কর্তৃক প্রদত্ত RFID ট্যাগ সচল থাকলেই হবে; পৃথক কোনো RFID ট্যাগের প্রয়োজন নেই।
ইতোমধ্যেই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রুটে চলাচলকারী শীর্ষস্থানীয় বাস অপারেটর—যেমন ইমাদ পরিবহন, দোলা পরিবহন, সার্বিক পরিবহন, গোল্ডেন লাইন পরিবহন-সহ অসংখ্য বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগত যানবাহনের মালিকগণ ETC-তে রেজিস্ট্রেশন করতঃ এই সুবিধা নিয়মিত ব্যবহার করছেন।
ETC লেনে প্রবেশকারী যানবাহনসমূহকে টোল প্লাজায় থামতে হয় না; বরং প্রায় ৬০ কিলোমিটার/ঘণ্টা গতিসীমার মধ্যে থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল পরিশোধ করে নির্বিঘ্নে অতিক্রম করতে পারে। এর সুদূরপ্রসারী সুফল হিসেবে রয়েছে এবং টোল প্লাজায় অপেক্ষমাণ সময় শূন্যে নেমে এসেছে। এছাড়া, ঈদের মতো ব্যস্ত সময়গুলোতেও প্লাজা এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে না। যানবাহন না থামার কারণে অতিরিক্ত জ্বালানি অপচয় রোধ হচ্ছে। গাড়ি স্টপ-অ্যান্ড-গো না হওয়ায় কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাচ্ছে, যা টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত হচ্ছে ।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, পদ্মা সেতুর এই ETC মডেলটি দেশের সামগ্রিক মহাসড়ক ও সেতু ব্যবস্থাপনায় এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ভবিষ্যতে পদ্মা সেতুর শতভাগ টোল আদায়কে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার আওতায় আনার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য প্রধান সেতুসমূহ, এক্সপ্রেসওয়ে, টানেলেও ইটিসি’র মাধ্যমে ক্যাশলেস ব্যবস্থা চালুর প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ সকল পরিবহন মালিক ও চালকদের দ্রুততম সময়ে নিজ নিজ যানবাহনে ETC নিবন্ধন সম্পন্ন করার উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছে এবং জনগণের জন্য আরও দ্রুত, নিরাপদ ও বিশ্বমানের আধুনিক সড়ক সেবা নিশ্চিত করতে নিজেদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছে।