আলী আহসান রবি :
ঢাকা: ১২ মে ২০২৬ শুক্রবার
বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত হতে ১২ জুন শুক্রবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ পাওয়ার গ্রিড ও এনএলডিসি পরিদর্শন করেন। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পাওয়ার গ্রিড) দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সামগ্রিক পরিস্থিতি, বিদ্যমান কারিগরি ও পরিচালনগত চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে মন্ত্রীকে বিস্তারিতভাবে অবহিত করেছে। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর, পাওয়ার গ্রিডে ১ম বার পরিদর্শনে আসেন তিনি। পরিদর্শনকালে মন্ত্রী Protection & Automation Lab এবং ডে-কেয়ার সেন্টারের শুভ উদ্বোধন করেন। মন্ত্রীকে জাতীয় গ্রিড পরিচালনা ও দক্ষতা উন্নয়ন , ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি, বিতরণ ব্যবস্থার পরিচালনা ও গ্রিড স্থিতিশীলতা রক্ষায় গৃহীত ব্যবস্থা ও ঢাকা রিং ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক সম্পর্কে অবহিত করা হয়।
পরিদর্শনকালে জাতীয় গ্রিডের সিস্টেম প্রটেকশন ও মিটারিং সার্কেলের আওতায় নবনির্মিত অত্যাধুনিক Protection & Automation Lab শুভ উদ্বোধন করেন মাননীয় মন্ত্রী। Protection & Automation Lab হচ্ছে ‘Simulation to Solution’-এর একটি আধুনিক পূর্ণাঙ্গ প্ল্যাটফর্ম। এই ল্যাবটিকে পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার একটি বিশ্বমানের Research Center হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে এই ল্যাব জাতীয় গ্রিডের Fault ও Disturbance Analysis এবং যুগোপযোগী গ্রিড প্রটেকশন ব্যবস্থার বাস্তবায়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশাবাদ ব্যাক্ত করেন মাননীয় মন্ত্রী।বিশেষত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপদ পরিচালনা এবং জাতীয় গ্রিডের নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধিতে এই ল্যাব কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট আগামী নভেম্বরে চালু করার লক্ষ্য বাস্তবায়নে সময় খুব বেশি হাতে নেই। তাই সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎমন্ত্রী আরও বলেন, স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে উৎপাদন ও সঞ্চালনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হয়নি। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন সক্ষমতা ঠিক থাকলেও সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি রয়ে গেছে। ফ্যাসিস্ট সরকার বিদ্যুৎ খাত সম্প্রসারণ করতে গিয়ে অপরিকল্পিতভাবে প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু কার্যকর সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি।
উৎপাদন ও সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকলেও ফ্যাসিস্ট সরকার অপরিকল্পিতভাবে বিতরণ লাইন স্থাপন করায় অনেক এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এর মূল কারণ বিতরণ লাইনের সমস্যা। এসব সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। তাদেরকে প্রতিটি সমস্যা সনাক্ত করে তা দূরীকরনের জন্য বিস্তারিত প্রস্তাব দ্রুত উপস্থাপনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যাতে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে সমস্যাগুলো সমাধান করা যায়।
বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার এর সময়ের ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়ে তিনি বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জের নামে আগের সরকার বড় ধরনের আর্থিক বোঝা এই সরকারের ঘাড়ে রেখে গেছে। তবে নতুন সরকার চাইলেই তাৎক্ষণিকভাবে সবকিছু পরিবর্তন করতে পারে না। বিষয়গুলো আইনি প্রক্রিয়ার সমাধান করতে হবে। আইন মন্ত্রণালয় বিষয়গুলো পর্যালোচনা করছে। রাতারাতি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব নয়। তবে বিদ্যমান চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কোম্পানীর কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকে জাতীয় গ্রিড পরিচালনা ও দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ে মন্ত্রীকে জানানো হয় যে, ঢাকা এবং এর পার্শ্ববর্তী ঘোড়াশাল, হরিপুর, সিদ্ধিরগঞ্জ, মেঘনাঘাট, ময়মনসিংহ ও আশুগঞ্জ অঞ্চলের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সমূহ এবং বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হলে জাতীয় গ্রিড আরও দক্ষ ও অর্থ সাশ্রয়ীভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। ফলে দূরবর্তী অঞ্চল থেকে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পাবে, সিস্টেম লস কমবে এবং গ্রাহক পর্যায়ে ভোল্টেজ স্থিতিশীল রাখাসহ মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সহজ হবে।
বৈঠকে উল্লেখ করা হয় যে, পাওয়ার গ্রিড ইতোমধ্যেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিতব্য বিদ্যুৎ নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও নিরবচ্ছিন্নভাবে জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণ এবং সংশ্লিষ্ট পরিচালনগত সক্ষমতা উন্নয়নের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করছে।
ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানানো হয় যে, স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় এ অঞ্চলের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিভিন্ন জটিলতার কারণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সঞ্চালন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে। তবে শম্ভুগঞ্জ গ্রিড উপকেন্দ্র, টাঙ্গাইল গ্রিড উপকেন্দ্র এবং সংশ্লিষ্ট সঞ্চালন লাইনসমূহ চলতি বছরের মধ্যে চালু হলে ওই অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে বলে আশা করা যায়।
বৈঠকে বিদ্যুতের বিতরণ ব্যবস্থার পরিচালনা সম্পর্কেও বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। প্রতিকূল আবহাওয়া কিংবা স্বল্পমাত্রার ঝড়-বৃষ্টির সময় অপ্রয়োজনীয় ট্রিপিং এবং ম্যানুয়ালি ফিডার বন্ধ রাখার প্রবণতা জাতীয় গ্রিডের স্থিতিশীলতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এ কারণে গ্রিডের নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে সকল বিতরণ সংস্থার সমন্বিত, দায়িত্বশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিচালনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
ঢাকা মহানগরী ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মোকাবিলা এবং সঞ্চালন ব্যবস্থার সক্ষমতা, নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘ঢাকা রিং ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক’ নির্মাণের উদ্যোগ ও অগ্রগতি সম্পর্কেও মাননীয় মন্ত্রীকে অবহিত করা হয়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির সরকারি উদ্যোগ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে পাওয়ার গ্রিড ‘Grid Studies and Innovation Facility (GSIF)’ প্রতিষ্ঠা করেছে। এই অত্যাধুনিক সুবিধার মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির গ্রিড সংযুক্তি, সিস্টেমের স্থিতিশীলতা এবং পিজিসিবির দক্ষ প্রকৌশলীগণ এর তত্ত্বাবধানে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জটিল কারিগরি বিশ্লেষণ ও সিমুলেশন স্টাডি এখন দেশেই সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।