ফারজানা ফারাবী, ফিচার রিপোর্টঃ
ঢাকার প্রাণকেন্দ্র ফকিরাপুল কালভার্ট রোড এর সন্দীপ টাওয়ারের সামনে রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক, চারপাশে গাড়ির হর্ন, মানুষের পদচারণা, দোকানের কোলাহল। কিন্তু সেই কোলাহলের মাঝেই ফুটপাতে শুয়ে আছে এক মানুষ। শরীরে মলিন কাপড়, পায়ের ময়লা যেন তার দীর্ঘ পথচলার সাক্ষী। মাথার নিচে নেই বালিশ, বিছানা নেই—কঠিন সিমেন্টই তার বিছানা, আকাশ তার চাদর। কে জানে, কতদিনের ক্ষুধা আর কষ্টে ক্লান্ত শরীরটা আজ নিস্তেজ হয়ে পড়েছে!
কিন্তু এই নিঃসঙ্গ মানুষের পাশে আছে এক অপ্রত্যাশিত সঙ্গী। একটি পথকুকুর।
মানুষটির হাতের পাশে মাথা রেখে শুয়ে আছে সে। যেন পাহারা দিচ্ছে, যেন বলছে—“তুমি একা নও, আমি আছি।”
এ দৃশ্য দেখে প্রশ্ন জাগে—মানুষ যখন মানুষকে ভুলে যায়, তখন কি সত্যিই একটি নির্বাক প্রাণীই হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে কাছের?
এক নীরব বন্ধন
অসহায় মানুষটির ঘুম ভাঙলেও হয়তো সে কিছু খেতে পাবে না, হয়তো কেউ তাকে ডাকবে না। কিন্তু তার পাশে শুয়ে থাকা এই কুকুরটি প্রমাণ করে দিলো—ভালোবাসা মানে কেবল ভাষা নয়, মানে কেবল রক্তের সম্পর্ক নয়। ভালোবাসা মানে হৃদয়ের টান।
কুকুরটি যেন পুরো পৃথিবীর অবহেলাকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। দুজনেই প্রান্তিক, দুজনেই অবহেলিত—তাদের এই একসঙ্গে শুয়ে থাকা যেন মানবতার নতুন সংজ্ঞা লিখে দিল।
সমাজের আয়না
এই দৃশ্য আসলে সমাজের আয়না।
আমরা প্রতিদিন অসংখ্য অভাবী মানুষকে ফুটপাতে পড়ে থাকতে দেখি। কেউ সাহায্য করি না, বরং দূরে সরে যাই। অথচ এক পশু দাঁড়িয়ে যায় তার পাশে।
আমরা পথকুকুরকে তাড়াই, লাঠি মারি, অনেক সময় নিপীড়ন করি। অথচ তারাই মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা দেখায়।
একজন ক্ষুধার্ত মানুষ আর এক অবহেলিত প্রাণীর এই একসঙ্গে ঘুমানো আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো ঘটনা।
মানবতার ডাক
আজকের এই দৃশ্য আমাদের শিখিয়ে দেয়, মানবতা আসলে বড় বড় বক্তৃতায় নয়, মানবতা লুকিয়ে থাকে ক্ষুদ্রতম আচরণে। হয়তো এক টুকরো রুটি, হয়তো এক গ্লাস পানি, হয়তো একটি সহানুভূতির হাত—এসবই হতে পারে একজন অভাবী মানুষের বেঁচে থাকার শক্তি।
এই মানুষ আর কুকুরের ছবি আমাদের সামনে নীরব এক প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কি সত্যিই মানুষকে ভালোবাসতে পারি? নাকি কেবল নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্যের বৃত্তেই আটকে আছি?
শেষ কথা
মানুষ আর কুকুরের এই বন্ধন শুধু করুণার নয়, এটি এক নীরব প্রতিবাদ। প্রতিবাদ আমাদের উদাসীনতার বিরুদ্ধে, প্রতিবাদ আমাদের ভুলে যাওয়া মানবতার বিরুদ্ধে।
এই দৃশ্য যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—মানুষের পাশে দাঁড়াতে হলে বড় কিছু নয়, দরকার শুধু সামান্য মানবিকতা।