কুমিল্লা প্রতিনিধি, মোঃ রমিজ উদ্দিন :
গ্রামবাংলার সকাল যেমন কুয়াশা ভেজা, তেমনি তাঁর বুকজুড়ে ছড়িয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের নীরব জীবনসংগ্রামের গল্প। সেইসব গল্পেরই এক জীবন্ত নাম কুমিল্লার তিতাস উপজেলার বলরামপুর ইউনিয়নের মধ্য আকালিয়া গ্রামের শ্রী অমূল্য চন্দ্র দাস (৬০)। তাঁর জীবন যেন নারকেলের শলার মতোই—কঠিন, সরল, অথচ অসাধারণ উপযোগী। প্রয়াত মনোহর চন্দ্র দাসের ছেলে এবং প্রয়াত বাঁধা সাধু দাসের বংশধর অমূল্য তিন প্রজন্ম ধরে বয়ে চলেছেন গ্রামবাংলার এক প্রাচীন ঐতিহ্য—ঝাড়ু তৈরির শিল্প।
প্রায় অর্ধশত বছর আগে, যখন একটি ঝাড়ুর দাম ছিল মাত্র এক টাকা পঁচিশ পয়সা, তখনই বাপ-দাদার হাতের কাজকে নিজের জীবনের সঙ্গী করে নেন তিনি। সময়ের স্রোত অনেক দূর গড়িয়েছে। হাট-বাজারের রূপ পাল্টেছে, মানুষের ঘর-বাড়ি বদলেছে, জীবনযাত্রা আধুনিক হয়েছে। কিন্তু অমূল্যের আঙুলে নারকেলের শলা গেঁথে ঝাড়ু তৈরির যে শিল্প, তা আজও একই রকম জীবন্ত, একই রকম মমতামাখা।প্রতি সপ্তাহের বুধবার বাতাকান্দির হাটের দিন শুটকি বাজারের সামনে পুরনো বটগাছটির নিচে ছোট্ট একটি পিড়ি পেতে বসেন তিনি। সেই বটগাছ যেন তাঁর অর্ধশত বছরের নীরব সঙ্গী, সুখ-দুঃখের সাক্ষী। সামনে সারি করে রাখা থাকে নিজ হাতে তৈরি ঝাড়ু। প্রতি শনিবার দাউদকান্দি বাজার, রবিবার গৌরীপুরের সাপ্তাহিক হাট—এভাবেই হাট থেকে হাটে ঘুরে বেড়ায় তাঁর জীবন ও জীবিকা। মাটির ওপর পিড়ি পেতে বসা এই মানুষটিকে দেখলে মনে হয়, তিনি যেন গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা এক জীবন্ত লোকজ জাদুঘর।
এই ঝাড়ুর পেছনে লুকিয়ে আছে তাঁর ঘাম, ধৈর্য আর ভালোবাসার দীর্ঘ ইতিহাস। গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে প্রতি কেজি ৬০ টাকা দরে নারকেলের শলা সংগ্রহ করেন তিনি। তারপর অভিজ্ঞ হাতের নিপুণ বুননে সেই শলা রূপ নেয় সংসারের নিত্যসঙ্গী ঝাড়ুতে। বর্তমানে প্রতি বড় পিস ঝাড়ু ১০০ টাকা এবং ছোট ঝাড়ু ৬০ টাকায় বিক্রি করেন তিনি।
অমূল্য শুধু একজন ঝাড়ু কারিগর নন, তিনি একজন স্বপ্নবুননকারী পিতা। এই ঝাড়ু বিক্রির আয়ে তিনি চার মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। মেয়েরা এখন নিজ নিজ সংসারে সুখে-শান্তিতে আছেন। একমাত্র ছেলে শ্রী মানিক চন্দ্র দাস (২৮)-কে একসময় পাঠিয়েছিলেন মালয়েশিয়ায়, ভাগ্য বদলের আশায়। কিন্তু বিদেশের মাটিতে ভাগ্য সহায় না হওয়ায় পাঁচ বছর আগে দেশে ফিরে আসে মানিক। এখন সে বাবার পাশে দাঁড়িয়ে বাপ-দাদার ঐতিহ্যের এই হাল শক্ত হাতে ধরে রেখেছে।
আবেগভরা কণ্ঠে পাঁচ সন্তানের জনক অমূল্য চন্দ্র দাস বলেন, “বাপ-দাদার কাছ থেকেই শিখেছি ঝাড়ু তৈরির কাজ। এটা শুধু পেশা না, আমাদের ঐতিহ্য। নিজের হাতে নারকেলের শলা দিয়ে ঝাড়ু বানিয়ে হাটে-হাটে বিক্রি করেই জীবন চলে যাচ্ছে।”
তাঁর এই সরল স্বীকারোক্তির ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে গ্রামীণ বাংলার আত্মমর্যাদা, পরিশ্রম আর উত্তরাধিকার রক্ষার এক অনন্য কাব্য। আধুনিকতার ঝলমলে ভিড়ে যখন অনেক পুরনো পেশা হারিয়ে যাচ্ছে, তখন অমূল্য চন্দ্র দাসের হাতে তৈরি প্রতিটি ঝাড়ু যেন শুধু ধুলো ঝাড়ার উপকরণ নয়—এ যেন বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের ধুলো পড়া ইতিহাসকে আগলে রাখার এক নীরব অঙ্গীকার।
বটগাছের ছায়ায় বসে থাকা অমূল্যের মুখে সময়ের রেখা যতই গভীর হোক, তাঁর হাতে বোনা প্রতিটি ঝাড়ু আজও বলে যায়—ঐতিহ্য কখনও হারায় না, যদি কেউ ভালোবেসে তাঁকে ধরে রাখে।