নিজস্ব প্রতিবেদক :
সাংবাদিকতা মূলত সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর এক দুরূহ পেশা। কলম হাতে নেওয়া মানেই ক্ষমতার সামনে মাথা নত না করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তোলা। অথচ এই সত্য বলার দায়িত্বই আজ সাংবাদিকদের জন্য হয়ে উঠছে মৃত্যুর ফাঁদ। প্রখ্যাত সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের লাশ আমাদের সামনে শীতল অথচ গভীর এক সত্য উন্মোচন করে দিয়েছে—এই দেশে সত্য লিখে বাঁচা সম্ভব নয়।
সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার জীবনের প্রতিটি পরতে সত্য বলার চেষ্টা করেছেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপসহীন ছিলেন। দুর্নীতি, রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা কিংবা সমাজের গোপন অন্ধকার—যে দিকেই চোখ পড়েছে, কলম থামিয়ে রাখেননি। কিন্তু এরই ফল হিসেবে বারবার হুমকি, ভয়ভীতি, চাপ এবং অবশেষে মৃত্যুর নির্মম বাস্তবতা তাঁকে গ্রাস করেছে। তাঁর লাশ যেন সাংবাদিক সমাজের জন্য এক প্রতীক—যে প্রতীক প্রমাণ করে, এখানে সত্যের মূল্য এখনো রক্তে পরিশোধ করতে হয়।
এমন মৃত্যু কেবল একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ সংকেত। কারণ, সাংবাদিকের কলম যদি থেমে যায়, তবে সমাজ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যু যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—সত্য উচ্চারণকারী কণ্ঠগুলোকে নিশ্চুপ করে দেওয়ার এক অশুভ প্রবণতা দেশে ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
আজ প্রশ্ন উঠছে—একজন মানুষ সত্য লিখতে গিয়ে প্রাণ হারাবে, অথচ রাষ্ট্র চুপচাপ থাকবে কেন? গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু কাগজে-কলমে থাকবে, বাস্তবে সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত আতঙ্কে জীবন কাটাবে—এ কেমন গণতন্ত্র?
বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যু আমাদের দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাঁর লাশ শুধু শোক নয়, আমাদের কাছে এক কঠিন বার্তা রেখে গেছে—“সত্য লিখে বাঁচা সম্ভব না”। তবে আমরা যদি নীরব থাকি, যদি কলমকে ভয়ে আটকে রাখি, তবে সেই বার্তাই স্থায়ী সত্য হয়ে যাবে। অথচ ইতিহাস সাক্ষী, কোনো দমননীতি কখনো সত্যকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। সত্যের শক্তিই একদিন অন্ধকার ভেদ করে আলো ছড়ায়।
আজ প্রয়োজন, সাংবাদিক সমাজের ঐক্য, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলতা এবং জনগণের সোচ্চার ভূমিকা। বিভুরঞ্জন সরকারের আত্মাহুতি যেন শেষ মৃত্যু না হয়, বরং হোক এক নতুন জাগরণের সূচনা। আমরা চাই না আর কোনো সাংবাদিকের লাশ প্রমাণ হয়ে দাঁড়াক যে এই দেশে সত্য লিখে বাঁচা যায় না।