আলী আহসান রবি :
ঢাকা, ০৮ জুন ২০২৬
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান গত ০৮ জুন মস্কোতে রুশ ফেডারেশনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন। দুই নেতা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সকল দিক এবং জাতিসংঘসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে তাদের ব্যাপকতর সম্পৃক্ততা ও সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন। উভয় নেতা স্মরণ করেন, চার দশক আগে জাতিসংঘে নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের বন্ধুত্বের সূচনা হয়েছিল।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উপস্থিত প্রতিনিধিরা ছিলেন হুমাইউন কবির ও জনাব নজরুল ইসলাম। পররাষ্ট্রমন্ত্রী রহমান বর্তমানে তার রুশ প্রতিপক্ষের আমন্ত্রণে মস্কো সফর করছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব রহমান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ঐতিহাসিক অবদানের কথা স্মরণ করেন। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানকারী প্রথম দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল। উভয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ২০২৭ সালে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫৫তম বার্ষিকীর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব সের্গেই ল্যাভরভ বাংলাদেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে উষ্ণ অভিনন্দন জানান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে তার প্রার্থিতায় সমর্থনের জন্য রাশিয়াকে ধন্যবাদ জানান।
বৈঠক চলাকালে দুই নেতা শিল্প, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, কৃষি, গবেষণা ও প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, পর্যটন, পরিবহন এবং প্রতিরক্ষার মতো খাত ও ক্ষেত্রগুলোতে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার মূল্যায়ন করেন এবং এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণ ও গভীর করার সংকল্প গ্রহণ করেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেন এবং বাংলাদেশের পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত কোটামুক্ত (ডিএফকিউএফ) বাজারের ব্যাপারে রাশিয়া সরকারের কাছে অনুরোধ জানান। তিনি বাংলাদেশি পণ্যের নিবন্ধন প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। তিনি রাশিয়াকে বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগ করার জন্য অনুরোধ করেন, যার মধ্যে হালকা থেকে ভারী প্রকৌশল, খাদ্য ও কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, পেট্রোকেমিক্যাল, ইস্পাত উৎপাদন, তথ্যপ্রযুক্তি ইত্যাদি উদীয়মান খাত অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তিনি আরও অনুরোধ করেন, বাংলাদেশ ও ইউরেশিয়া অর্থনৈতিক কমিশনের (ইইসি) মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনে বাংলাদেশকে সমর্থন করার জন্য রাশিয়া যেন সহায়তা করে। বর্তমানে ইইসি-র পাঁচটি সদস্য রয়েছে, যথা রাশিয়া, বেলারুশ, আর্মেনিয়া, কাজাখস্তান এবং কিরগিজস্তান। তিনি ব্রিকস ও এসসিও-র আনুষ্ঠানিক সদস্য হওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রতি রাশিয়ার সমর্থন কামনা করেন, যার জবাবে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিবাচক সাড়া দেন।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের জন্য রাশিয়া সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিকল্পিতভাবে দ্বিতীয় ইউনিটের কমিশনিং ত্বরান্বিত করতে পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার জন্য রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন।
দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিরাপদ ও সুরক্ষিত কর্মসংস্থানের জন্য বাংলাদেশ থেকে আরও জনশক্তি নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা করেন। তাঁরা বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে মুলতবি থাকা সকল সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি, যার মধ্যে পুনপ্রবেশ চুক্তি এবং মানবসম্পদ চুক্তি নামক দুটি চুক্তিও রয়েছে, দ্রুত সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাশিয়ায় আটকে পড়া বেশ কয়েকজন বাংলাদেশির নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য অনুরোধ করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভ বিষয়টি তাঁর সরকার কর্তৃক পূর্ণ বিবেচনার আশ্বাস দেন।
উভয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদ, সুরক্ষিত ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন নিয়ে আলোচনা করেন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভ ইঙ্গিত দেন যে, এই সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধানে রাশিয়া সরকার সহায়তা করতে ইচ্ছুক।
মস্কোতে তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্য রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর রুশ প্রতিপক্ষকে পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।