মোঃ তোসিকুল আলম বাবুল :
পদ্মার পলিমাখা স্রোত যখন একটি যাত্রীবাহী বাসকে নিমিষেই গিলে খায়, তখন সেই যন্ত্রণার ঢেউ কেবল নদীর পাড়েই আছড়ে পড়ে না, বরং তা প্রতিটি বিবেকবান মানুষের হৃদয়ে কম্পন তৈরি করে। দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাস ডুবে যাওয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আধুনিকায়নের এই যুগেও আমাদের নূন্যতম যাতায়াত নিরাপত্তা কতটা ঠুনকো। এটি কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি আমাদের নৌ-পরিবহন খাতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বাঁধা অব্যবস্থাপনা, জরাজীর্ণ অবকাঠামো এবং দায়িত্বহীনতার এক দীর্ঘস্থায়ী প্রামাণ্য দলিল। স্বজন হারানো মানুষের আর্তনাদ যখন বাতাসের সাথে মিশে যায়, তখন আমাদের অবকাঠামোগত উন্নয়নের দম্ভ বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়ে।
ভুলের ব্যবচ্ছেদ: মৃত্যুর ফাঁদ পাতা যেখানে
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার গভীরে তাকালে কয়েকটি মৌলিক ভুল ও গাফিলতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে:
১. জরাজীর্ণ পন্টুন ও পকেট গিট: দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটের অনেক পন্টুন বছরের পর বছর সংস্কারহীন। ফেরি যখন পন্টুনে ভেড়ে, তখন যে প্রবল কম্পন তৈরি হয়, তা সহ্য করার মতো স্থিতিস্থাপকতা অনেক পন্টুনের নেই। পন্টুনের যে অংশে (পকেট) বাস রাখা হয়, সেখানকার নিরাপত্তা চেইন বা গার্ডরাইলগুলো নামমাত্র। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এগুলো মরিচা ধরা এবং জীর্ণ, যা একটি কয়েক টন ওজনের বাসের ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা রাখে না।
২. লোডিং-আনলোডিংয়ে বিশৃঙ্খলা: ফেরিতে গাড়ি তোলার সময় কোনো সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় না। অনেক সময় ফেরির ভারসাম্য বজায় না রেখে একপাশে ভারী যানবাহন তোলা হয়। ফলে ফেরি যখন হেলে পড়ে, তখন পন্টুন ও ফেরির র্যাম্পের মাঝে বড় ধরণের ফাঁক বা উঁচু-নিচু তৈরি হয়। এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থাই বাস পিছলে পড়ার মূল কারণ।
৩. ফেরির যান্ত্রিক অক্ষমতা: আমাদের বহরে থাকা অনেক ফেরিই এখন ‘স্ক্র্যাপ’ বা ভাঙার যোগ্য। এগুলোর ব্রেকিং সিস্টেম এবং র্যাম্প নিয়ন্ত্রণ করার হাইড্রোলিক ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। ফেরি যখন ঘাটে ভেড়ে, তখন সেটিকে স্থির রাখার জন্য যে শক্তিশালী রশি বা চেইন প্রয়োজন, অনেক সময় তা ছিঁড়ে গিয়ে ফেরি পন্টুন থেকে দূরে সরে যায়, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই বাসটি নদীর গহ্বরে তলিয়ে যায়।
৪. মানবিক অবহেলা ও তদারকির অভাব: বাস ফেরিতে ওঠার পর চালকের সিটে থাকা বাধ্যতামূলক হলেও অনেক সময় চালকরা অদক্ষ হেলপারদের হাতে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে নিচে নেমে আসেন। অন্যদিকে, বিআইডব্লিউটিসি-এর মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের তদারকি ঘাটগুলোতে একেবারেই নগণ্য। নিয়ম অনুযায়ী ফেরি ছাড়ার আগে প্রতিটি গাড়ির চাকার নিচে ‘উডেন ব্লক’ বা কাঠের টুকরো দেওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে তা খুব কমই দেখা যায়।
স্থায়ী সমাধান: আর কত রক্তে ভিজবে পদ্মা?
দুর্ঘটনা পরবর্তী তদন্ত কমিটি গঠন করা আমাদের দেশে একটি প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু সেই রিপোর্টের বাস্তবায়ন আমরা খুব কমই দেখি। এই মৃত্যুমিছিল থামাতে হলে আমাদের প্রয়োজন আমূল পরিবর্তন:
স্মার্ট পন্টুন ও অটোমেটিক লক সিস্টেম: প্রতিটি পন্টুনকে আধুনিকায়ন করে সেখানে স্বয়ংক্রিয় হাইড্রোলিক লক সিস্টেম বসাতে হবে। গাড়ি পন্টুনে ওঠার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে লোহার মজবুত দেয়াল বা ব্যারিয়ার উঠে আসবে, যা কোনো অবস্থাতেই গাড়িকে নদীতে পড়তে দেবে না।
যাত্রী সুরক্ষা প্রটোকল: আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী, ফেরি বা জাহাজে গাড়ি ওঠার পর যাত্রীদের ভেতরে বসে থাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশে আইন করে বাধ্যতামূলক করতে হবে যে, ফেরি চলাকালীন যাত্রীরা বাসের ভেতরে থাকতে পারবেন না। বাসের দরজা খোলা রাখা এবং যাত্রীদের নির্দিষ্ট লাউঞ্জে অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে।
ডিজিটাল মনিটরিং ও সেন্সর: প্রতিটি ফেরি ও ঘাটে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং লোড-ব্যালেন্সিং সেন্সর স্থাপন করতে হবে। যদি ফেরি একদিকে বেশি হেলে পড়ে, তবে স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ম বেজে উঠবে। এতে করে চালক ও কর্মীরা তাৎক্ষণিক সতর্কতা অবলম্বন করতে পারবেন।
ফিটনেস সার্টিফিকেট ও কঠোর দণ্ড: যে সকল ফেরি বা পন্টুন মেয়াদোত্তীর্ণ, সেগুলোকে অবিলম্বে স্ক্র্যাপ ঘোষণা করতে হবে। কোনো ফিটনেসবিহীন যান বা ফেরি ঘাটে পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা (ফৌজদারি মামলা) নিতে হবে।
জরুরি উদ্ধারকারী দল: দৌলতদিয়া ও পাটুরিয়ার মতো বড় ঘাটগুলোতে ২৪ ঘণ্টা শক্তিশালী ক্রেন এবং প্রশিক্ষিত ডুবুরি দল মোতায়েন রাখতে হবে। দুর্ঘটনার প্রথম ১০-১৫ মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এই সময়ে উদ্ধারকাজ শুরু করা গেলে প্রাণহানি অর্ধেক কমিয়ে আনা সম্ভব।
নদীমাতৃক এই বাংলাদেশে পানি যেন কারো মরণফাঁদ না হয়। আমরা পদ্মা সেতু করেছি, যা আমাদের সক্ষমতার প্রতীক। কিন্তু ঘাটের এই ক্ষুদ্র অব্যবস্থাপনা যখন বড় কোনো ট্র্যাজেডি ডেকে আনে, তখন আমাদের পুরো অর্জনই ম্লান হয়ে যায়। দৌলতদিয়ার জলে যে হাহাকার আমরা দেখেছি, তা যেন বাংলাদেশের অন্য কোনো ঘাটে আর প্রতিধ্বনিত না হয়। উন্নয়ন মানে কেবল পিচঢালা পথ বা কংক্রিটের দালান নয়; উন্নয়ন মানে প্রতিটি নাগরিকের নিশ্চিন্তে ঘরে ফেরার গ্যারান্টি। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার বলি হয়ে আর একটি প্রাণও যেন পদ্মার গহ্বরে সলিল সমাধি না হয়—এটাই আজ সমগ্র জাতির প্রাণের দাবি।