মাহমুদ আল-হাছান, বিশেষ প্রতিনিধি, নীলফামারী :
২১ ফেব্রুয়ারি, শনিবার
জামায়াত সাধারনতঃ যে কোনো নির্বাচনে হোক সেটি জাতীয় কিংবা স্থানীয়, তাদের প্রার্থীতা কমপক্ষে এক বৎসর কিংবা তারও আগেই নির্ধারন করে ফেলে। সংগঠন হিসাবে দেশে প্রচলিত অন্যান্য রাজনৈতিক দল থেকে এটি জামায়াতের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য।
২০২৫ এর প্রথম দিকেই জামায়াত সারাদেশে প্রতিটি আসনে জাতীয় সংসদে তাদের দলীয় প্রার্থী নির্ধারনে তৎপর হয়ে ওঠে। নীলফামারী-৩ (জলঢাকা) আসনে প্রার্থীতার জন্যে ভোটাভোটি হলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় চাকুরি অথবা ব্যাবসায়িক কারনে বসবাস করা জামায়াতের রুকন সদস্যগনের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। মতবিরোধ নিরসনে কেন্দ্র এই আসনে পুনরায় ভোটিং দেয়। রুকনদের অধিকাংশের ভোটে জলঢাকা আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসাবে মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সালাফীর নাম উঠে আসে যিনি নিজেও তখন রংপুর বসবাসকারি একজন রুকন এবং রংপুর মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি।
সিদ্ধান্ত ঘোষিত হলে জামায়াতের তৃনমূলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। একেকজন একেক নেতার পক্ষে সাফাই দিতে থাকে। জলঢাকায় থাকেনই না এমন একজনকে ডেকে এনে কেনো প্রার্থী করতে হবে এ প্রশ্নও করতে থাকেন অনেক কর্মী। কিন্ত জামায়াতের গৃহিত ও ঘোষিত সিদ্ধান্ত সাংগঠনিক আনুগত্যের প্রশ্নে সকলকে মেনে নিতে হয়। শুরু হয় এক নতুন মিশন বাস্তবায়নের সংগ্রাম।
রংপুর প্রবাসী মাওলানা সালাফী সপ্তাহে ৩/৪ দিন জলঢাকায় সময় দিতে লাগলেন। ছুটে চলতে লাগলেন গ্রাম থেকে গ্রামে, পাড়ায় পাড়ায়, বাড়ী বাড়ী। ২৫ এর অক্টোবর মাসে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের রোড ম্যাপ ঘোষনা করলে সংগঠন সালাফীকে রংপুরের দায়িত্ব থেকে অবমুক্ত করে নীলফামারী জেলায় সংযুক্ত করে দেয়। সালাফীকে নীলফামারী জেলা মজলিশে শুরার সদস্য মনোনিত করা হয়। তিনি পুরোদস্তুর গনসংযোগে নেমে পড়েন।
মাওলানা সালাফীর গ্রামের বাড়ী জলঢাকার খুটামারা ইউনিয়নের। তিনি রাজারহাট আলিম মাদরাসা থেকে দাখিল এবং আলিম পাশ করেন এবং এখানে অধ্যায়নরত অবস্থায় তিনি পর্যায়ক্রমে ইসলামী ছাত্রশিবিরের জলঢাকা সাথী শাখার সেক্রেটারি এবং সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে ছিট মীরগঞ্জ শালনগ্রাম মাদরাসা থেকে ফাজিল পাশ করেন। আলিম পাশ করার পরে তিনি রংপুর কারমাইকেল কলেজে বাংলায় অনার্সে ভর্তি হন। জলঢাকা সাথী শাখা থেকে বিদায় নেয়ার পরে তিনি পর্যায়ক্রমে রংপুর কারমাইকেল কলেজ শাখা শিবিরের সেক্রেটারি, সভাপতি, রংপুর শহর সভাপতি, শিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকরি পরিষদ সদস্য এবং এক সময় শিবিরের অত্যন্ত প্রেস্টিজিয়াস পদ ‘সেক্রেরারিয়েট সদস্য’ নির্বাচিত হন। ছাত্রজীবন শেষ হলে তিনি রংপুর শহরেই স্থায়ীভাবে বসবাসে মনস্থির করেন এবং শহরে দুটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে পরিচালনা করতে থাকেন। তিনি রংপুর শহর জামায়াতের বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন এবং সর্বশেষ রংপুর মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
রংপুরে বসবাস করার কারনে জলঢাকার সাধারন মানুষের সাথে তেমন একটা মেলবন্ধন তৈরী হয়নি মাওলানা সালাফীর। আওয়ামী বিরোধী আন্দোলন চলাকালীন তিনি বহুবার জেল জুলুমের শিকার হয়েছেন এবং জলঢাকার বিভিন্ন সাংগঠনিক অনুষ্ঠানে মাঝে মাঝে অতিথী হিসেবে উপস্থিত থাকলেও একেবারে সাধারন্যে তার তেমন পরিচিতি ছিলো না বললেই চলে।
জনসংযোগের মুল চ্যালেঞ্জই ছিলো মাওলানা সালাফীকে জন মানুষের কাছে পরিচিত করে তোলা। জামায়াতের মজবুত সাংগঠনিক ভিত্তি আর মাওলানা সালাফীর নিরলস পরিশ্রমে দিনে দিনে পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে। সালাফী আজ শিমুলবাড়ী তো কাল কৈমারী, সকালে গোলমুন্ডায় তো বিকেলে মীরগঞ্জ – এভাবে অবিরাম ছুটতে থাকেন। একজন মানুষ যে কতোটা পরিশ্রমি হতে পারে সেটা মাওলানা সালাফীকে না দেখলে জানা হতো না। পুরো নির্বাচনে গনসংযোগে তিনি যেভাবে জনে জনে সাক্ষাত করেছেন, ভোট প্রার্থনা করেছেন সাধারনত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীরা তেমনটা করে থাকেন। চমৎকার বাগ্মী ও যুক্তিবাদী বক্তা মাওলানা সালাফীর মাঝে মানুষ মরহুম অধ্যক্ষ আজিজুল ইসলামের ছায়া খুঁজে পেয়েছিলো। জামায়াতের নিজস্ব নেতাকর্মী ছাড়াও শিবিরের সেই সময়কার নেতাকর্মীগন ভ্যানগার্ড হিসেবে তাঁকে আগলে দাঁড়ায় এবং সালাফীর জন্যে ভোট প্রার্থনায় নেমে পড়ে। অবস্থা এমন হয়েছিলো যে – তারা সবাই যেনো একেকজন সালাফী হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
নির্বাচনের ১০ দিন পুর্বে পুরো নির্বাচনী এলাকাটিকে জামায়াত কয়েকটি জোনে বিভক্ত করে অত্যন্ত দক্ষ ও চৌকস নেতাদের বিভিন্ন জোনের দায়িত্ব দেয়। এই কৌশলটি বেশ কার্যকর ও সফল কৌশল বলে প্রমাণিত হয়। এই দশদিনে নির্বাচনী গতিধারা অভাবনীয় মোড় নেয়, বদলে যায় মাঠের সব হিসাব নিকাশ।
নেতাকর্মীদের সংগঠিত রেখে মাঠে কার্যকরভাবে সক্রিয় করে অবিরাম ছুটে চলে, অপরিচিতর তকমা ভেদ করে এক বছরের প্রচেষ্টায় যে জনতার হৃদয়ের মনিকোঠায় স্থান পাওয়া যায়, নন্দিত জননেতা হওয়া যায়, মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সালাফী তার প্রকৃষ্ট উদাহরন।