আলী আহসান রবি:
শনিবার ৩১ শে মে ২০২৬
অনেক সচেতন নাগরিক নির্ধারিত স্থানে পশু কোরবানি করে এবং বর্জ্য ব্যাগে ভরে নির্দিষ্ট স্থানে রেখে আমাদের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের মাঠপর্যায়ে দারুণ সহযোগিতা করেছেন। ঈদের আগে আমরা জাতীয় দৈনিকে গণবিজ্ঞপ্তি, টেলিভিশনে সচেতনতামূলক টিভিসি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কনটেন্ট প্রচার এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে মাইকিংয়ের মাধ্যমে নগরবাসীর সহযোগিতা চেয়েছিলাম। নাগরিকদের উদ্বুদ্ধ করতে ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডে ৪৬ টন ব্লিচিং পাউডার, ২১০ গ্যালন (১০৫০ লিটার) স্যাভলন এবং ১ লাখ ৪০ হাজার বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ বিতরণ করা হয়েছিল।
সচেতন নাগরিকের সংখ্যা হয়তো এখনো শতভাগ নয়, তবে আমরা জানি ইতিবাচক পরিবর্তন রাতারাতি আসে না। ধীরে ধীরে অধিকাংশ নগরবাসী সচেতন হয়ে উঠবেন এবং নাগরিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে আমরা একটি কাঙ্ক্ষিত ও পরিচ্ছন্ন ঢাকা বিনির্মাণ করতে পারব বলে আমি আশাবাদী।
দ্বিতীয়ত, আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই আপনাদের-
পবিত্র ঈদুল আযহার আগে পশুর হাট চলাকালীন, কোরবানির দিন এবং বিগত তিন দিন আপনারা নিরলসভাবে আমাদের বার্তাগুলো নগরবাসীর কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। আপনাদের এই ভূমিকা জনসচেতনতা তৈরিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ডিএসসিসির সাফল্যের সংবাদ প্রকাশ করে যেমন আপনারা পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের মনোবল বাড়িয়েছেন, ঠিক তেমনি এই বিশাল কর্মযজ্ঞের কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ত্রুটি-বিচ্যুতিও বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরেছেন, যা আমাদের সংশোধনের সুযোগ করে দিয়েছে। আপনাদের এই চমৎকার পেশাদারিত্বের জন্য আমি গভীর কৃতজ্ঞতা ও সাধুবাদ জানাচ্ছি।
প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
আপনারা বিগত কয়েকদিন সার্বক্ষণিক আমাদের সাথে মাঠপর্যায়ে ছিলেন। আপনারা নিশ্চয়ই অনুধাবন করেছেন যে, বিদ্যমান বাস্তবতায় এত বিপুল পরিমাণ বর্জ্য দ্রুততম সময়ে অপসারণ করা কতটা বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ৩,২০০ থেকে ৩,৫০০ টন বর্জ্য অপসারিত হয়, সেখানে প্রায় একই জনবল ও সম্পদ ব্যবহার করে কোরবানির দিনগুলোতে দৈনিক প্রায় ৫ গুণেরও বেশি বর্জ্য অপসারণ করতে হয়। ফলে সর্বোচ্চ চেষ্টার পরও কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ত্রুটি থেকে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। ধৈর্য ধরে ডিএসসিসির ওপর আস্থা রাখার জন্য আমি নগরবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
বিগত তিন দিনে ডিএসসিসির নিজস্ব ও পিসিএসপিসহ (PCSP) প্রায় ১৩,৪৫৩ জন কর্মী মাঠপর্যায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ছিলেন। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে ৩৮২টি বিশেষ যান-যন্ত্রপাতিসহ মোট ২,১১৭টি ছোট-বড় গাড়ি ব্যবহার করা হয়েছে।
৫টি ওয়ার্ডে ডিএসসিসি কর্তৃক ৩৫৭টি স্থান পশু কোরবানির জন্য নির্ধারিত ছিল, যেখানে গত তিন দিনে মোট ১৭,৩১৫টি পশু কোরবানি করা হয়েছে।
আপনারা জানেন, এ বছর তিন দিনে কোরবানির পশুর হাট ও বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল মোট ৩৩,৯৪২ টন। আনন্দের বিষয়, সকলের সহযোগিতায় ঈদের দিন থেকে গতকাল (৩০ মে) রাত ১২টা পর্যন্ত আমরা মোট ৩৬,০৮৬ টন বর্জ্য মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে চূড়ান্ত ডাম্পিং করেছি। অর্থাৎ, আমরা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি বর্জ্য অপসারণ করতে সক্ষম হয়েছি। এর মধ্যে প্রথম দিনে ১৪,৮১৪ টন, দ্বিতীয় দিনে ৮,৯৭৭ টন এবং তৃতীয় দিনে ১২,২৯৫ টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়।
তবে আমাদের কার্যক্রম এখানেই শেষ নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন, সেই অনুযায়ী আমাদের তদারকি টিম সার্বক্ষণিক মাঠে কাজ করে যাচ্ছে। আপনাদের মাধ্যমে নগরবাসীকে জানাতে চাই-ডিএসসিসির কোথাও কোনো বর্জ্য জমে থাকতে দেখলে দয়া করে আমাদের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নম্বর: ০১৭০৯৯০০৮৮৮ এবং ০২২২৩৩৮৬০১৪-এ জানান। আমরা সংবাদ পাওয়ার ১ ঘণ্টার মধ্যে বর্জ্য অপসারণ করব, ইনশাআল্লাহ। তবে নগরবাসীর প্রতিও অনুরোধ, দয়া করে যত্রতত্র ময়লা ফেলবেন না এবং অন্য কেউ ফেললে তাকেও নিবৃত্ত করুন। এটি আপনার নৈতিক ও নাগরিক দায়িত্ব।
এদিকে, কোরবানির ১১টি অস্থায়ী হাটের বর্জ্য অপসারণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আপনারা দেখেছেন, হাটের ইজারাদাররা শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে বর্জ্য অপসারণ করেননি। জনভোগান্তি রোধে হাটের সমস্ত বর্জ্য আমাদের নিজেদেরই অপসারণ করতে হচ্ছে, যা সামগ্রিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গতি কিছুটা শ্লথ ও আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছিল। আমরা ইজারাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা হিসেবে জামানত বাজেয়াপ্ত ও কালো তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বর্তমানে জামানতের পরিমাণ কম হওয়ায় তারা এর তোয়াক্কা করে না। তাই আগামী বছর থেকে জামানতের অংক উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জনভোগান্তি তৈরি করলে সে যেই হোক না কেন, বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।
প্রিয় নগরবাসী,
বিগত তিন দিন ধরে টানা কোরবানি, যত্রতত্র বর্জ্য ও চামড়া ফেলে রাখা, মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে যাওয়ার পথে যাত্রাবাড়ী অংশের তীব্র যানজট এবং লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত বর্জ্য অপসারণ করতে গিয়ে যে সাময়িক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়েছে, তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। পাশাপাশি আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান ঢাকাকে একটি ‘ক্লিন সিটি, গ্রিন সিটি’ হিসেবে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। সুতরাং, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ সিটি কর্পোরেশনের যেকোনো নাগরিক সেবায় বিন্দুমাত্র গাফিলতি বরদাশত করা হবে না।
জাতীয় ঈদগাহে পবিত্র ঈদুল আযহার প্রধান জামাত ব্যবস্থাপনা, পশুর হাট ও কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আপনাদের এবং নগরবাসীকে যেভাবে পাশে পেয়েছি, ঠিক একইভাবে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও জলাবদ্ধতা নিরসনেও আপনাদের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করছি।
আমি বিশ্বাস করি, নাগরিকেরা যদি সচেতন হন তবে যেকোনো সমস্যার ৫০ ভাগ সমাধান এমনিতেই হয়ে যায়; বাকি ৫০ ভাগ সিটি কর্পোরেশন নিশ্চিত করলেই শতভাগ সমাধান সম্ভব।
এই শহর আপনার, এই শহর আমার, এই শহর আমাদের সবার।
ঢাকা বদলাবে, যদি আমি নিজে বদলাই।