ফারজানা ফারাবী, ধর্মীয় ডেক্সঃ মানুষকে আল্লাহ পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে—আখিরাতের সম্বল সংগ্রহ করা। দুনিয়া হলো ক্ষণস্থায়ী এক পরীক্ষা ক্ষেত্র, যেখানে প্রতিটি কাজ, প্রতিটি কথা, প্রতিটি নিয়তই আসলে আখিরাতের জন্য সম্বল হয়ে যায়। এই দুনিয়ায় আমাদের হাতে দেওয়া হয়েছে একটি ব্যাগ—ঈমান ও নেক আমলের ব্যাগ। সেখানে ভরার কথা ছিল নামাজ, রোজা, দান-সদকা, উত্তম চরিত্র, এবং আল্লাহর আনুগত্যের সম্বল।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই দুনিয়ার ঝলমলে আলো, অর্থ-সম্পদ, ক্ষমতা আর মোহাবিষ্ট আনন্দ আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। আমরা আসল উদ্দেশ্য ভুলে যাই। আল্লাহ আমাদের পাঠিয়েছিলেন আখিরাতের বাজার করতে, অথচ আমরা দুনিয়ার ফেতনায় ডুবে গিয়ে সেই ব্যাগটাই হারিয়ে ফেলি।
দুনিয়ার ধোঁকা সম্পর্কে আল্লাহর সতর্কবাণী
আল্লাহ তায়ালা বলেন—
“এই পার্থিব জীবন তো কেবল খেলা ও আমোদ-প্রমোদ মাত্র। আর নিশ্চয় আখিরাতই হলো প্রকৃত জীবন, যদি তারা জানত।”
(সূরা আনকাবুত: ৬৪)
আরও বলেছেন—
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো এবং সেই দিনের আশঙ্কা করো, যেদিন কোনো পিতা তার সন্তানের কাজ আসবে না, আর কোনো সন্তানও তার পিতার কিছু কাজে আসবে না। নিশ্চয় আল্লাহর ওয়াদা সত্য। অতএব পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে ধোঁকায় না ফেলে এবং প্রতারক (শয়তান) যেন আল্লাহ সম্বন্ধে তোমাদেরকে ধোঁকায় না ফেলে।”
(সূরা লুকমান: ৩৩)
এ আয়াতগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে দুনিয়ার মোহ একটি ক্ষণস্থায়ী ধোঁকা, যেখানে ডুবে গেলে মানুষ আখিরাতের আসল প্রস্তুতি ভুলে যায়।
রাসূল ﷺ এর শিক্ষা
রাসূল ﷺ দুনিয়ার প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত, তা পরিষ্কার করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন—
“দুনিয়ায় থাকো এমনভাবে, যেন তুমি একজন পথিক অথবা পথের ধারে বসে থাকা একজন ভ্রমণকারী।”
(বুখারি, হাদিস: ৬৪১৬)
আরেক হাদিসে তিনি বলেছেন—
“চতুর সেই ব্যক্তি, যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। আর অক্ষম সেই ব্যক্তি, যে নিজের খেয়াল-খুশির পেছনে চলে এবং আল্লাহর উপর নিরর্থক ভরসা করে।”
(তিরমিজি, হাদিস: ২৪৫৯)
এই শিক্ষাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এই পৃথিবীতে আমরা চিরস্থায়ী নই। প্রকৃত বুদ্ধিমান সেই, যে আখিরাতের জন্য নেক আমলের সম্বল জমা করে।
হারানো ব্যাগের আফসোস
একজন মানুষ যখন বাজারে যায়, তার উদ্দেশ্য হয় প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা। কিন্তু যদি সে ভুলে যায় আসল উদ্দেশ্য আর মেতে ওঠে অপ্রয়োজনীয় খেলনায়, তবে শেষে যখন বাড়ি ফিরে বুঝবে তার হাতে কোনো খাদ্য নেই—তখন তার আফসোসের শেষ থাকবে না।
তেমনই কিয়ামতের দিন অনেকেই দেখবে তাদের হাতে নামাজ নেই, দান নেই, উত্তম চরিত্র নেই। ব্যাগ শূন্য। তখন তারা আফসোস করবে, কিন্তু সেই আফসোস আর কোনো কাজে আসবে না। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, মুনাফিকরা মুমিনদের কাছে আলো চাইবে, কিন্তু তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে—
“তখন বলা হবে: ফিরে যাও পেছনে, আলো খুঁজে নাও।”
(সূরা হাদীদ: ১৩)
করণীয়
তাহলে আমাদের করণীয় কী?
আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যে ফিরে আসা
প্রতিদিন নামাজ, রোজা, দান-সদকা, কুরআন tilawat এর মাধ্যমে আখিরাতের সম্বল জমা করা
সৎ চরিত্র গঠন করা, মানুষের হক আদায় করা
দুনিয়ার ফেতনা থেকে দূরে থাকা এবং এটিকে অস্থায়ী মনে করা
কারণ মৃত্যু হলো সেই দরজা, যার পর আর কোনো বাজার খোলা থাকবে না।
উপসংহার
আমাদের সবাইকে আখিরাতের বাজার করতে পাঠানো হয়েছে। অথচ আমরা দুনিয়ার মোহে ডুবে গিয়ে ব্যাগটাই হারিয়ে ফেলছি। এখনই সময় সেই হারানো ব্যাগ খুঁজে নেওয়ার, নেক আমল দিয়ে ভরাট করার, এবং আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার। কারণ একদিন সেই ব্যাগ নিয়েই দাঁড়াতে হবে আল্লাহর সামনে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হারানো ব্যাগ ফিরে পাওয়ার এবং আখিরাতের বাজারে সফল হওয়ার তাওফিক দান করুন।