সিউডোবুলবার ব্যাধি : মনস্তাত্ত্বিক পর্যালোচনা
জয়দেব বেরা
[অতিথি অধ্যাপক,বই লেখক,সমাজকর্মী এবং সমাজ-মনোবিশ্লেষক]
সিউডোবুলবার (Pseudobulbar) ব্যাধি হল একধরনের স্নায়বিক ব্যাধি যা কান্না, হাসি, রাগ বা অন্যান্য মানসিক প্রদর্শনের অনিচ্ছাকৃত বিস্ফোরণ ঘটায়।এই সমস্যাটি আমাদের শারীরিক ও সামাজিক-মানসিক সমস্যার সাথে যুক্ত।এই সমস্যায় আক্রান্ত হলে ব্যক্তিরা মূলত নিজেদের হাসি ও কান্নার উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে ব্যার্থ হয়।যে কোনও পরিস্থিতিতে হাসি ও কান্না প্রকাশ হয়ে যায়,যদিও তা পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রত্যাশিত নয়।এই সমস্যাটি হলে ব্যক্তির স্নায়ু এবং মুখের পেশীর সমস্যা আসে।অর্থাৎ সিউডোবুলবার পালসি হল একটি স্নায়বিক অবস্থা যা মুখের পেশী নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হ্রাস করে, সেইসাথে কথা বলা, চিবানো এবং খাওয়ার গিলতে বাধা দেয়।পাশাপাশি হাসি, কান্না প্রভৃতি নিয়ন্ত্রণেও বাধা দেয়।এর ফলে অনিয়ন্ত্রিত হাসি-কান্না প্রকাশ হয়ে যায়।এই সমস্যা হলে ব্যক্তি যখন খুশি হেসে ফেলে আবার যখন খুশি কান্না করে ফেলে।সিউডোবুলবার পালসিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা হঠাৎ করে হাসি বা কান্নার অনুপযুক্ত পর্বও অনুভব করতে পারেন, যা সিউডোবুলবার ইফেক্ট (PBA) নামে পরিচিত। যদিও এটি নিজেই কোনও রোগ নয়, সিউডোবুলবার পালসি একটি অন্তর্নিহিত স্নায়বিক ব্যাধির লক্ষণ যার আরও চিকিৎসা মূল্যায়ন এবং ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
সিউডোবুলবার এর সাধারণকিছু উপসর্গ হল-হঠাৎ এবং অনিচ্ছাকৃত ও অনিয়ন্ত্রিত হাসি বা কান্না,মানসিক অস্থিরতা,
রাগ, হতাশা, বিষণ্নতা ইত্যাদি। এমনকি কথা বলা ও খাওয়ার খাওয়াতেও সমস্যা দেখা যায়।
এই সমস্যার কারণগুলি হল- স্ট্রোক, ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরি (TBI),নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ,ব্রেন টিউমার, সেরিব্রাল পালসি,মাথায় আঘাত লাগা, বয়সজনিত সমস্যা, অত্যাধিক মানসিক চাপ ও অস্থিরতা,স্নায়বিক অসুস্থতা,নেশাগ্রস্ততা প্রভৃতি।
এই ব্যাধিটি হলে ব্যক্তিকে শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক চিকিৎসা ও পরামর্শ নিতে হবে।কারণ অনিয়ন্ত্রিত হাসি ও কান্নার ফলে ব্যক্তিকে সমাজে নানান খারাপ কথা শুনতে হয়,নানান সমালোচনার সম্মুখীনও হতে হয়।তবে বিশ্বাস করুন এতে সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তির কোনও দোষ থাকে না।এই ব্যাধিটি হলে যে কেউ হাসি ও কান্নার নিয়ন্ত্রণ এর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে।যদিও এই সমস্যাটি স্নায়বিক সমস্যা তবুও এই সমস্যাকে কেন্দ্র করে ব্যক্তির মধ্যে সামাজিক ও মানসিক সমস্যা চলে আসে,চলে আসে বৈষম্যও।কারণ সমাজের বেশিরভাগ মানুষ কিছু না বুঝেই,কিছু না জেনেই সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিকে নানান মন্দ কথা শুনিয়ে দেয় এবং খারাপ আচরণ ও খারাপ ব্যাবহারও করে ফেলে।এর ফলে এই সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিটির মানসিক বিষণ্ণতা বাড়তে থাকে।তার সমাজিক ও মানসিক চাপও বৃদ্ধি পায়,লজ্জার জন্য হয়তো সে কোথাও যেতে পারে না,কারুর সাথে মিশতে পারে না,কোনও অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করে না।কারণ সবাই তাকে নিয়ে মজা করে,খারাপ কথাও শোনায়।তাই এই সমস্যাটি হলে একদম মানসিক চিন্তা না করেই প্রথমে একজন নিউরোলজিস্ট ডাক্তারবাবুর কাছে যাবেন এবং চিকিৎসা করাবেন অপরদিকে চাই মানসিক পরামর্শ।এর জন্য দক্ষ মনোবিদ ও কাউন্সেলরের কাছেও যেতে হবে।মনোবিদ বিভিন্ন থেরাপি ও কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে এই সমস্যাটিকে সারিয়ে তুলতে সাহায্য করবেন।স্পিচ থেরাপি থেকে শুরু করে ব্রিদিং এক্সারসাইজ,CBT সহ আরও অন্যান্য থেরাপি এবং কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে একজন কাউন্সেলর তথা মনোবিদ এই সমস্যাকে দূরীকরণ করতে সাহায্য করবেন।তবে সর্বপ্রথম যেটা করতে হবে এর লক্ষণগুলোকে ভালো করে চিহ্নিতকরণ করে একজন ভালো নিউরোলজিস্ট ডাক্তারবাবুর কাছে পরামর্শ নেওয়া তারপর মনোবিদ তথা কাউন্সেলরের পরামর্শ নেওয়া।তবেই এই সমস্যাটিকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।
ভারতবর্ষ,পশ্চিমবঙ্গ,পূর্ব মেদিনীপুর