আলী আহসান রবি :
তারিখ- ১৭/০৬/২০২৬ খ্রি.
সংসারের অভাব ঘোচানোর স্বপ্নে অনেকেই ভিটেমাটি, জমিজমা কিংবা পরিবারের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে বিদেশযাত্রার পথ বেছে নেন। প্রিয়জনদের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় তারা বিশ্বাস করেন দালালদের প্রতারণামূলক মিষ্টি কথায়। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথই কখনো পরিণত হয় মৃত্যুযাত্রায়। চলতি বছরে মার্চ মাসে ভূমধ্যসাগরে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনাটি ছিল তেমনই এক বেদনাদায়ক অধ্যায়, যেখানে অনাহার, তৃষ্ণা ও দুর্বিষহ যন্ত্রণার মধ্যে প্রাণ হারান ১৮ জন বাংলাদেশি। সেই হতভাগ্য নিহতদের তালিকায় ছিল মাসুম (ছদ্মনাম)। পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদের লাশগুলো সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়।
এই মানব পাচার চক্র ও মর্মান্তিক মৃত্যুর সাথে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে চক্রের ০১ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির নাম মোহাম্মদ মিকাইল ইসলাম (৫২), পিতা- মৃত আব্দুল করিম, মাতা- মৃতা আবযান বিবি, সাং- মিঠাপুর, থানা- দিরাই, জেলা- সুনামগঞ্জ। সিআইডির টিএইচবি (মানব পাচার প্রতিরোধ) ইউনিট গত ১৫/০৬/২০২৬ খ্রি. বিকালে সিলেট বিমানবন্দর এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভূমধ্যসাগরে নিহতদের একজন ভুক্তভোগী মাসুম (ছদ্মনাম) ও গ্রেফতারকৃত অভিযুক্ত মোহাম্মদ মিকাইল ইসলাম একই গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার আশায় মাসুম মানব পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে ইউরোপ যাত্রার বিপজ্জনক পথে পা বাড়ান।
মানব পাচার চক্রটি ইউরোপের দেশ গ্রীসে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে মাসুমের পরিবারের কাছে মোট ১৩ লক্ষ টাকা দাবি করে। চক্রের সদস্যরা প্রথমে বিমানযোগে লিবিয়ায় পাঠানোর জন্য ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং গ্রীসে পৌঁছানোর পর আরও ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধের শর্ত দেয়। উন্নত জীবনের আশায় পরিবারের সদস্যরা দালাল চক্রের কথায় বিশ্বাস করে মাসুমের পরিবার এ অর্থ পরিশোধে সম্মত হন।
ঢাকায় ১৭ দিন থাকার পর চক্রের সদস্যরা অন্যান্যদের সাথে মাসুমকেও লিবিয়ায় নিয়ে যায়। সেখানে পৌঁছানোর পর মাসুম পরিবারকে ফোনে এই চক্রের এক সদস্যকে টাকা পাঠানোর নির্দেশনা দেয়। নির্দেশনা মোতাবেক একটি ব্যাংক হিসাবে গত জানুয়ারি মাসে ৪ লক্ষ টাকা জমা করেন মাসুমের পিতা। কয়েকদিন পর গ্রেফতারকৃত অভিযুক্ত মিকাইল মিয়ার কাছে নগদ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ভূমধ্যসাগরের উত্তাল জলরাশিতে নিভে যায় তার জীবন। প্রতিকূল আবহাওয়ায় পথ হারিয়ে টানা ০৬ দিন খাবার ও পানীয় ছাড়াই সমুদ্রে ভাসতে থাকায় যাত্রীরা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও চরম ক্লান্তিতে মৃত্যু হয় বেশ কয়েকজনের। পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো মাঝসমুদ্রেই ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে উদ্ধার হওয়া জীবিত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
মামলাটির তদন্তে জানা যায়, একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী চক্র ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশগমনেচ্ছু ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করত। চক্রটি বৈধ অভিবাসনের পরিবর্তে অবৈধভাবে লিবিয়া হয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর নামে মানব পাচার কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের আটকে রেখে বিভিন্নভাবে অর্থ আদায় এবং ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে ইউরোপে পাঠানোর ব্যবস্থা করত।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মাসুমকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে কয়েক মাস অবস্থানের পর গত ২১/০৩/২০২৬ খ্রি. তারিখে ১৮ জন বাংলাদেশিসহ মোট ৪৫ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে অবৈধ সমুদ্রপথে গ্রীসের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। যাত্রাপথে নৌযানটি কয়েকদিন ভূমধ্যসাগরে আটকা পড়ে। খাদ্য ও পানির তীব্র সংকটে একে অসুস্থ হয়ে পড়েন যাত্রীরা। অবশেষে অনাহার ও পানিশূন্যতায় প্রাণ হারান একাধিক ব্যক্তি, যাদের মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে যে মৃতদের মধ্যে তাদের মাসুমও রয়েছেন। গ্রীসে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ১৩ লক্ষ টাকা গ্রহণ করা হয়।
মামলার তদন্তের ধারাবাহিকতায় মানব পাচার চক্রের সদস্য মোহাম্মদ মিকাইল ইসলাম (৫২) কে গ্রেফতার করেছে সিআইডি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মানব পাচার কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে। গ্রেফতারকৃতকে পরবর্তী আইনানুগ প্রক্রিয়ার জন্য বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে সিআইডির টিএইচবি ইউনিট। এ প্রতারক চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতার, আর্থিক লেনদেনের উৎস অনুসন্ধান এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সম্পৃক্ততা উদ্ঘাটনে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
সিআইডি বিদেশে কর্মসংস্থান, অভিবাসন বা ভ্রমণের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত ও বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণের জন্য জনসাধারণকে পরামর্শ প্রদান করছে। একই সঙ্গে মানবপাচার, জাল ভিসা, অভিবাসী চোরাচালান কিংবা এ ধরনের অপরাধ সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে সিআইডিকে অবহিত করার জন্যও অনুরোধ জানানো হচ্ছে ।