কুমিল্লা প্রতিনিধি, মোঃ রমিজ উদ্দিন :
কুমিল্লার তিতাস উপজেলার আসমানিয়া বাজার সংলগ্ন গোমতী নদীর ওপর নির্মাণাধীন ব্রিজ প্রকল্পে একাধিক গুরুতর অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও সম্ভাব্য দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকল্পটির শুরু থেকেই পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও তদারকিতে রয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি, যার ফলে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।গতকাল শুক্রবার সকাল ১১ টার দিকে নির্মাণাধীন ব্রিজ পরিদর্শন করেন কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূইয়া। এর আগেই তিনি জাতীয় সংসদে এ প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বাতাকান্দি জিসি-রায়পুর ভায়া মাছিমপুর সড়কের আসমানিয়া বাজার সংলগ্ন গোমতী নদীর ওপর ৭৫.০৬ মিটার দীর্ঘ পিএসসি ও আরসিসি গার্ডার ব্রিজটির উদ্বোধন করা হয় ২০২৪ সালের ১৩ মার্চ। তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নির্ধারিত স্থানে নতুন ব্রিজ নির্মাণের পরিবর্তে পুরনো ব্রিজ ভেঙে একই স্থানে কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এতে বিকল্প কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় শুরু থেকেই তিতাস, হোমনা,দাউদকান্দি, মেঘনা ও মুরাদনগর উপজেলাসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েন।স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন নৌকায় ভাড়া দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে নদী পারাপার করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বিকল্প হিসেবে নির্মিত কাঠের সেতুও দুই দফায় প্রবল স্রোতে ভেসে যায়, যা প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা ও অব্যবস্থাপনার স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হিসেবে উঠে এসেছে—ব্রিজের একটি গুরুত্বপূর্ণ পিলার স্থাপন না করেই ঢালাই সম্পন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি অন্য পিলারগুলোর সংযোগ কাজও নিম্নমানের বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের ত্রুটি ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহেলা, উদাসীনতা এবং অনৈতিক যোগসাজশ ছাড়া এ ধরনের কাজ সম্ভব নয়। তারা দাবি করেন, প্রকল্পের যথাযথ তদারকি না থাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইচ্ছেমতো কাজ করে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে সচেতন মহলের প্রশ্ন—উপজেলা প্রকৌশল অফিস ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা কি কাজের মান যাচাই করছেন, নাকি তারা এ অনিয়ম দেখেও নীরব রয়েছেন?
এদিকে কাজের ধীরগতি ও নিম্নমানের নির্মাণের কারণে সরকারি অর্থ অপচয়ের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় পার হলেও প্রকল্পটির দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ক্রমেই বাড়ছে।
স্থানীয়রা জানান, আসমানিয়া বাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র, যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষের যাতায়াত রয়েছে, যার মধ্যে নারী ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ঝুঁকিপূর্ণ নদী পারাপারের কারণে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে।
মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে স্থানীয় সমাজসেবক ছবির আহমেদ মেম্বার নিজ উদ্যোগে একটি ভাসমান সেতু নির্মাণ করে দেন। তবে সেটিও স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না। বর্ষা মৌসুমে উজানের পানির চাপ বাড়লে সেটি অচল হয়ে পড়ে, ফলে আবারও নৌকাই একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায়।
দীর্ঘদিনের ভোগান্তিতে অতিষ্ঠ হয়ে এলাকাবাসী মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। তবে অভিযোগ রয়েছে, এসবের পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে ডা. গোলাম মহিউদ্দিন জিলানী ভূইয়া, মো. জহিরুল ইসলাম (বিএসসি), মো. আরিফুল ইসলাম হানিফ, মো. ছবির আহমেদ মেম্বার, মো. রাসেল রানাসহ স্থানীয়রা এলজিইডি কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রকৌশলীর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অভিযোগকারীরা অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং দ্রুত মানসম্মতভাবে ব্রিজ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন।
এলাকাবাসীর ভাষায়, এ পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান না হলে জনঅসন্তোষ আরও বাড়বে এবং তা যে কোনো সময় বড় ধরনের জনরোষে রূপ নিতে পারে।