বিশেষ প্রতিনিধি :
বাংলাদেশের সিটি কর্পোরেশনের পর ৪২টি জেলা পরিষদেও দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এই সিদ্ধান্তে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে উল্লাস দেখা গেলেও প্রশ্ন উঠেছে—স্থানীয় সরকারের এসব প্রতিষ্ঠান কি বিএনপি নেতাদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে?
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অকার্যকর স্থানীয় সরকারকে সচল করতেই সিটি কর্পোরেশনে রাজনৈতিক প্রশাসক বসানো হয়েছে। জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় সরকারি কর্মকর্তাদের চেয়ে রাজনৈতিক প্রশাসকরা ভালো কাজ করতে পারবেন বলেও দাবি তাদের।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসক পদে রাজনৈতিক নেতারা কার্যকর হতে পারেন। কিন্তু দলীয় নেতাদের প্রশাসক করা হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানে দলীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিতও এতে থাকতে পারে।
এরই মধ্যে দেশের সব সিটি কর্পোরেশন থেকে সরকারি কর্মকর্তাদের সরিয়ে বিএনপি নেতাদের প্রশাসক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হয়ে হেরেছেন। আবার কেউ দলীয় মনোনয়নও পাননি।
সর্বশেষ রোববার ৪২টি জেলা পরিষদেও দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। সরকারের আশা, নতুন প্রশাসক নিয়োগে জেলা পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল, স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবশ্য গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার দিনই দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কথা বলেছিলেন।
বর্তমানে দেশে রয়েছে ১২টি সিটি কর্পোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৬৪টি জেলা পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ এবং প্রায় ৪ হাজার ৫৭০টি ইউনিয়ন পরিষদ।
সিটি ও জেলায় দলীয় নেতারা
২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের সিটি কর্পোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা মেয়রদের অপসারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার।
তখন এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ শীর্ষ পদে ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতারা। সরকারের পতনের পর তাদের অনেকেই আত্মগোপনে যান এবং অনেকে আটক হন।
এই পরিস্থিতিতে সিটি কর্পোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। উপজেলা ও পৌরসভায় এখনো সরকারি কর্মকর্তারাই প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন।
সংসদ নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা নেয়। এর এক সপ্তাহের মধ্যেই ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ ছয়টি সিটি কর্পোরেশনে দলীয় নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক করা হয় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আবদুস সালামকে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক হন ঢাকা–১৫ আসনে হেরে যাওয়া বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম খান।
খুলনায় প্রশাসক করা হয়েছে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে।
গাজীপুরে প্রশাসক হয়েছেন মহানগর বিএনপি সভাপতি শওকত হোসেন সরকার।
নারায়ণগঞ্জে মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি সাখাওয়াত হোসেন।
সিলেটে জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীকে প্রশাসক করা হয়েছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের বলেছিলেন,
“জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় সরকারি কর্মকর্তাদের চেয়ে রাজনৈতিক প্রশাসকরা সিটি করপোরেশনে ভালো কাজ করতে পারবেন। তাই অকার্যকর স্থানীয় সরকারকে সচল করতে রাজনৈতিক প্রশাসক বসানো হয়েছে।”
পরবর্তীতে ১৪ মার্চ বরিশাল, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, রংপুর ও কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনেও বিএনপি নেতাদের প্রশাসক করা হয়।
বরিশালে বিলকিস আক্তার জাহান।
রাজশাহীতে মাহফুজুর রহমান।
ময়মনসিংহে রুকুনোজ্জামান রোকন।
রংপুরে মাহফুজ উন নবী চৌধুরী।
কুমিল্লায় ইউসুফ মোল্লা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন।
এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে আদালতের রায়ে চট্টগ্রাম সিটির মেয়রের দায়িত্ব পান বিএনপি নেতা শাহাদাত হোসেন।
নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ার শঙ্কা
সিটি কর্পোরেশন প্রশাসক নিয়োগের পর আলোচনা চলাকালেই রোববার ৪২টি জেলা পরিষদেও প্রশাসক নিয়োগ দেয় সরকার। নিয়োগপ্রাপ্তরা সবাই নিজ নিজ জেলায় বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও স্থানীয় সরকার কমিশনের সদস্য তারিকুল ইসলাম বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিই স্থানীয় সরকারকে সবচেয়ে কার্যকর করে।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন,
“সংসদে সংস্কার প্রস্তাব পাস করে দ্রুত নির্বাচন দেওয়া উচিত। ততক্ষণ রাজনৈতিক প্রশাসকই ভালো। কারণ সরকারি কর্মকর্তারা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে স্থানীয় সরকারে কাজ করতে পারছিলেন না।”
দলীয় নেতাদের পুনর্বাসন?
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত স্থানীয় সরকার কমিশন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্দলীয় নির্বাচন ও সরাসরি ভোটের সুপারিশ করেছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, কমিশন চেয়েছিল জনগণের সরাসরি ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচিত হোক।
তিনি বলেন,
“স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না রাখার সুপারিশ ছিল। এতে দলীয় প্রভাব কমে এবং জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ে।”
সংসদ নির্বাচনের পর দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে—এমন প্রত্যাশা ছিল অনেকের। কিন্তু দলীয় নেতাদের প্রশাসক করায় নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৭ ফেব্রুয়ারি ফেসবুকে লিখেছিলেন,
“জনগণের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতেই সরকারি কর্মকর্তাদের পরিবর্তে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশাসক করা হচ্ছে।”
বর্তমানে চট্টগ্রাম ছাড়া অন্য কোনো সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই।
সেবায় বিঘ্নের অভিযোগ
সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক থাকলেও কাউন্সিলর না থাকায় জনসেবা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নির্বাচন না হওয়ায় এ সংকট তৈরি হয়েছে।
যাদের প্রশাসক করা হয়েছে তাদের কেউ সংসদ নির্বাচনে হেরেছেন। আবার কেউ দলীয় মনোনয়ন পাননি। ফলে প্রশাসক পদকে কেউ কেউ ‘সান্ত্বনা’ বা ‘পুরস্কার’ বলেও আলোচনা করছেন।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) দ্রুত সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচন দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
আইপিডির নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন,
“সরকারের উচিত ছিল নির্বাচন আয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কিন্তু সেটি না করে দলীয় নেতাদের পুনর্বাসন করা হয়েছে। নির্বাচনের উদ্যোগ না নিয়ে প্রশাসক নিয়োগ ভালো ইঙ্গিত দেয় না।”
তিনি আরও বলেন, প্রশাসকরা ভবিষ্যৎ নির্বাচনেও প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠান জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকে না।
ছয় সিটি কর্পোরেশনে বিএনপি নেতাদের প্রশাসক নিয়োগের পর সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দলীয় পদধারীদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থি। এটি নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র এবং পাতানো নির্বাচনের প্রথম ধাপ।