আলী আহসান রবি :
বৃহস্পতিবার ০৫ মার্চ , ২০২৬
শুরুতেই আমি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি মহান মুক্তিযুদ্ধে সকল শহীদদের ও সম্ভ্রম হারানো মা-বোনদের যাদের ত্যাগ-তিতিক্ষায় আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। একইসাথে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করতে চাই’ ২৪ এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সকল শহীদ ও আহতদের।
বস্ত্র ও পাটমন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে’ পাটশিল্প গড়ে তুলুন, কর্মসংস্থানসৃষ্টি করুন’ প্রতিপাদ্যে আগামীকাল ৬মার্চ-জাতীয় পাট দিবস উদযাপন করা হচ্ছে।
।দেশবাসীকে জানাই জাতীয় পাট দিবস-২০২৬ এর শুভেচ্ছা।
পাটশিল্পের সাথে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং গৌরব মিশে আছে। সোনালী আঁশখ্যাত পাটের হারানো সোনালী অতীত ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাতে বর্তমান সরকার কাজ করছে।’ করবো কাজ গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে দেশের বিভিন্ন খাতের মতো পাটশিল্পের পুনর্জাগরনের লক্ষ্য অর্জনে সরকার এগিয়ে যাচ্ছে।
.বর্তমান সরকারের লক্ষ্য দেশকে আধুনিক, গণতান্ত্রিক, উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা যেখানে ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে। বেকারত্ব দূর করা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এ সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি । সেজন্য ফ্যাসিবাদী সরকারের অপশাসনে বন্ধ হয়ে পরা পাটকল পুনরায় চালু করতে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে কাজ করবে সরকার। অপরদিকে, দেশের কর্মসংস্থান সুযোগ তৈরিতে ও অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীন বিজেএমসি’ র নিয়ন্ত্রণে থাকা পাটকলগুলো বেসরকারিভাবে চালু করতে দীর্ঘমেয়াদী ইজারা কার্যক্রম অব্যাহত আছে। ইতোমধ্যে ইজারাকৃত মিলগুলোর মধ্যে ৯টি মিলে ৭২০০ জন কাজ করছে যা দেশের উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
পাটশিল্পের উন্নয়নে দেশের রফতানি আয় তথা দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিয়ে আসে। উল্লেখ্য, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যসূত্রে, ২০২৫’ ২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত পাট ও পাটজাত পণ্যের রফতানি আয় ৪১৮.৬৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে বেশি- এটা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। পাটশিল্পের উন্নয়ন মানেই রফতানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতির সমৃদ্ধি।
. মূল্য সংযোজনের দৃষ্টিকোণ থেকে কাঁচা পাট রপ্তানি তুলনামূলকভাবে কম লাভজনক হওয়ায় বাংলাদেশ কাঁচা পাট রপ্তানি নিরুৎসাহিত করতে চায়। ২০২৪- ২৫ অর্থবছরে দেশে মোট পাট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩.৮০
লক্ষ মেট্রিক টন। কাঁচাপাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে মোট আয় হয় প্রায় ৮২০.০৪ (আটশত কুড়ি দশমিক শূন্য আট) মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে কাঁচা পাট হিসেবে রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১৪৮.48 (একশত আটচল্লিশ দশমিক আটচল্লিশ) মিলিয়ন ডলার যেখানে পাটপণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৬৭১.60 (ছয়শত একাত্তর দশমিক ষাট) মিলিয়ন ডলার। একদিকে যেমন দীর্ঘদিন ধরে কাঁচা পাট রপ্তানির ফলে দেশীয় পাটশিল্প কাঁচামাল সংকটে পড়ছে, অন্যদিকে তেমনি ভারতসহ অন্যান্য দেশ বাংলাদেশি কাঁচা পাট ব্যবহার করে উচ্চমূল্যের পণ্য রপ্তানি করে অধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। এই অবস্থার বিবেচনায় কাঁচাপাট রপ্তানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে মূল্য সংযোজিত প্রসেসড ও ফিনিশড পাটপণ্য রপ্তানিতে কর ছাড় ও নগদ সহায়তা প্রদান করা হবে, যাতে শিল্প উদ্যোক্তারা উচ্চমূল্য সংযোজনমুখী বিনিয়োগে উৎসাহিত হন।
. মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় পাটশিল্পের উন্নয়নে বর্তমান সরকার’ সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শন একইসাথে রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফার ভিত্তিতে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে পাটখাতকে উজ্জীবিত করতে স্বল্প ও মধ্য-মেয়াদি কার্যক্রম পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। স্বল্প মেয়াদি কর্মপরিকল্পনাতে- পাট অধিদপ্তরের ১৫ প্রকার লাইসেন্স অনলাইন সেবাদান, পাট আইন সংশোধন, পাটখাতে বিশেষ প্রনোদনা, জুট পোর্টাল তৈরির মতো কার্যক্রম নিয়েছে সরকার। সেইসাথে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনায় ইন্ডাস্ট্রিজ-একাডেমি কলাবরেশন বৃদ্ধি, পৃথক টাস্কফোর্স গঠন, জুট ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্লাস্টার পাটখাতের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা, Golden Fibre of Bangladesh নামে ব্র্যান্ডিং এর মতো বিভিন্ন কার্যপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে পাটখাতের রফতানি আয় বৃদ্ধি পাবে এবং লক্ষাধিক কর্মসংস্থানের সুযোগসৃষ্টি হবে।
এছাড়াও সরকার পরিবেশ সুরক্ষায় ও পাটজাত পণ্যের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন, ২০১০’ ও
এর অধীনে প্রণীত বিধিমালা বাস্তবায়ন করছে। এ আইন বাস্তবায়নের ফলে দেশের অভ্যন্তরে প্রতিবছর ১৫০ কোটি পাটের বস্তার চাহিদার সৃষ্টি হয়েছে, যা বাজার মূল্য ৮-৯ হাজার কোটি টাকা।
এছাড়া সার্বিক পাটখাত উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার কর্তৃক’ পাট আইন, ২০১৭’ ‘ জাতীয় পাটনীতি, ২০১৮’ ও’ চারকোলনীতিমালা, ২০২২’ প্রণয়ন করা হয়েছে। অধিকন্তু, টেকসই পাটখাত তৈরির লক্ষ্যে পাটবীজ উৎপাদনে চাষিদের সক্ষমতা অর্জন এবং চাষিদের উৎপাদিত পাটের ন্যায্য মূল্য প্রদান নিশ্চিত করা জরুরি। সেলক্ষ্যে সরকার পাট অধিদপ্তরের আওতায়’ উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর পাট ও পাটবীজ উৎপাদন এবং সম্প্রসারণ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রকল্পভুক্ত ৬.২৫ লক্ষ পাট চাষিকে প্রতিবছর বিনামূল্যে বীজ, সার, বালাইনাশকসহ কৃষি যন্ত্রপাতি প্রদান করা হচ্ছে। তাছাড়া পাট চাষিদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। তাছাড়া বাণিজ্যিকভাবে পাটখড়ি ব্যবহার করে চারকোল উৎপাদন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পাটের ‘জিনোম সিকোয়েন্স’ আবিষ্কারের ফলে পাট তার সোনালি ঐতিহ্যে ফিরিয়ে আনার অগ্রযাত্রায় সহায়ক ভূমিকা নিয়ে কাজ করছে।
আপনারা জেনে আনন্দিত হবেন, জাতীয় পাট দিবস 2026 উদযাপনের পাশাপাশি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে ০6 থেকে 1৪ মার্চ, 2026 তারিখ ০৯ দিনব্যাপী পাট ও বহুমুখী পাটপণ্যের মেলা আয়োজন করা হয়েছে। পাট ও পাটপণ্যের আগ্রহী ক্রেতা, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনসহ সকলকে এই মেলায় বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।
পরিশেষে, আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর” সবার আগে বাংলাদেশ” এই স্লোগানে উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি উচ্চ-মধ্যম, সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানাই। পাট শিল্পের সম্ভাবনাকে আমরা
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যার্জনে অন্যতম গন্তব্য ধরে অগ্রগামী হতে হবে। সোনালী আঁশের সোনালী দিন আবারও ফিরে আসুক ঘরে ঘরে।