মাহমুদ আল-হাছান, বিশেষ প্রতিনিধি, নীলফামারী :
১৪ ফেব্রুয়ারি, শনিবার
নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনের নব নির্বাচিত সংসদ সদস্য হাফেজ আব্দুল মুনতাকিমকে এই আসনে রাজনীতির এক ফিনিক্স পাখী বললেও সেটাকে কম বলা হয়। স্বাধীনতার পরে এই আসনে জামায়াত কখনোই কোনো শক্ত প্রতিদ্বন্দিতা তৈরী করতে পারে নাই। দিনাজপুরের সীমান্ত থেকে শুরু করে রংপুরের প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত সুবিশাল আয়তনের এই আসনটিতে কখনও আওয়ামীলীগ কখনও জাতীয় পার্টি কখনও বিএনপি ঘুরেফিরে শক্তি প্রদর্শন করে গেছে। কিশোরগঞ্জের অলিগলি ঘুরে দেখা যায় এখানে উল্লেখযোগ্য কোনো কারন ছাড়াই প্রয়াত প্রেসিডেন্ট এরশাদের জাতীয় পার্টির প্রতি সাধারন মানুষের এক অমোঘ টান। এই উপজেলার মানুষ বারবার এরশাদের জাতীয় পার্টিকে দুই হাত উজার করে দিয়েছে। এখানে জামায়াতের ভিত কখনোই মজবুত ছিলো না। শিক্ষার হারের দিক থেকে পিছিয়ে পরা এই জনপদে জামায়াত তাদের অবস্থান মজবুত করতে পারে নাই।
সৈয়দপুরে রয়েছে বিএনপি’র শক্ত অবস্থান। বিএনপি’র প্রয়াত সংসদ সদস্য আমজাদ হোসেন (ভজে) কে সৈয়দপুরের আম জনতা তাদের মাথার মুকুট করে রেখেছিলো। তার প্রয়ানের পরে বিএনপি এই উপজেলায় সেই মাপের আর কোনো নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে ব্যার্থ হয়। এই উপজেলায় জামায়াতের অবস্থানও ছিলো মোটামোটি মজবুত। এই আসনে বিহারি ভোট বরাবরই একটি ফ্যাক্টর হিসাবে কাজ করে এবং নির্বাচনে জয় পরাজয়ের নিয়ামক বিবেচনা করা হয় এই বিহারিদের ভোটকেই। মরহুম আমজাদ হোসেন ভজের প্রতি বিহারিদের আন্তরিক টান তাকে এই আসনের এমপি এবং বারবার সৈয়দপুরের মেয়র নির্বাচিত করেছিলো।
হাফেজ আব্দুল মুনতাকিম সৈয়দপুরের সন্তান এবং সৈয়দপুর উপজেলা জামায়াতের আমীর। বয়সে অত্যন্ত তরুন এই রাজনীতিবিদ ইতিপূর্বে সৈয়দপুর পৌরসভার মেয়র ও সৈয়দপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছিলেন। সৈয়দপুরের সাধারন মানুষের কাছে বেশ পরিচিত হলেও কিশোরগঞ্জের রাজনীতিতে নেহায়েতই একটি নতুন মুখ হিসেবে এই উপজেলার ভোট প্রভাবিত করা হাফেজ আব্দুল মুনতাকিমের জন্যে এক বিরাট বড় চ্যালেঞ্জ ছিলো। তার উপর দূর্বল সাংগঠনিক ভিত্তি এই উপজেলায় বিজয়ের চিন্তা সুদূর পরাহত বলেই মনে হয়েছিলো রাজনৈতিক অঙ্গনে। এ ছাড়াও প্রতিপক্ষ বিএনপি’র বেশ শক্তিশালী প্রার্থী, জাতীয় পার্টির বিশাল সম্পদশালী শিল্পপতি প্রার্থী এই আসনকে জামায়াতের জন্য অসম্ভব বলেই মনে করেছিলেন রাজনৈতিক বোদ্ধা মহল। কিন্ত সব হিসাব নিকাশ ওলট-পালট করে দিয়ে হাফেজ আব্দুল মুনতাকিম নীলফামারী জেলার সব-কটি আসনের মধ্যে বেশী ব্যাবধান সৃষ্টি করে প্রায় ৪৫ হাজার ভোটের ব্যাবধানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দি বিএনপি প্রার্থীকে হারিয়ে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। তার এ বিজয় মোটেই সহজসাধ্য ছিলো না। নির্বাচনের সিডিউল ঘোষনার ০৬ মাস পুর্ব থেকেই তার নিরবিচ্ছিন্ন ছুটে চলা, ভোটারের ঘরে ঘরে পৌছানোর অবিশ্রান্ত প্রচেষ্টা, দিনরাত একাকার করে বিরামহীন পথচলা তাঁকে মনজিলে মকসুদে পৌঁছিয়ে দিয়েছে। বহুবার বেশ কাছে থেকে তার অক্লান্ত পরিশ্রম দেখার সুযোগ হয়েছে। একজন মানুষ কতোটা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলে সব সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে একটি অপরিচিত জনপদেও নিরঙ্কুশ বিজয়ের ফুল ফুটাতে পারেন- হাফেজ আব্দুল মুনতাকিম তার প্রকৃষ্ট উদাহরন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হাফেজ আব্দুল মুনতাকিম বিগত আওয়ামী শাসনামলে একাধিক মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত হিসাবে একাধিকবার জেল জুলুমের শিকার হয়েছেন, পুলিশী হেনস্থায় বিধ্বস্ত হয়েছেন কিন্ত সংগঠনের প্রতি আনুগত্য থেকে এক চুল নড়চড় হননি কখনোই। নির্বাচনের পুর্বমুহুর্তেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার জেরে তাঁকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে বলা হয়েছিলো এবং তিনি বিনা বাক্যে সংগঠনের সে সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। আবার জোট ভেঙ্গে গেলে সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে তিনি আবার নির্বাচনের মাঠে সক্রিয় হন। সকল বাধা অতিক্রম করে রাজনীতির ফিনিক্স পাখী ‘হাফেজ আব্দুল মুনতাকিম’ বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের নীলফামারী-৪ আসনের মাননীয় সদস্য হিসাবে ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলেন।
নির্বাচনকালীন তার বিরামহীন ছুটে চলার এই ধারা অব্যাহত রাখলে একজন সফল রাজনীতিবিদ হিসাবে তিনি নিজেকে অনন্য উচ্চতায় আসীন করতে পারবেন বলেই মনে হয়।