বিশেষ প্রতিনিধিঃ বাংলাদেশের বীমা খাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা কাঠামোগত দুর্বলতা ও সুশাসনের ঘাটতির অভিযোগে আলোচিত। সেই প্রেক্ষাপটে যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডকে ঘিরে সম্প্রতি উঠে আসা অভিযোগগুলো নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—কেন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে মালিক পক্ষ ব্যক্তিগতভাবে কোনো আর্থিক সুবিধা নেননি বলে দাবি করা হয়, সেখানে লাইফ ফান্ড নেগেটিভে চলে যায়?
একজন ভুক্তভোগী কর্মকর্তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে উত্থাপিত অভিযোগ অনুযায়ী, যমুনা লাইফের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী “সিন্ডিকেট” সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, এই গোষ্ঠীর কারণে দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানে টিকে থাকতে পারেন না। প্রতিবাদ বা ভিন্নমত পোষণ করলে চাকরিচ্যুতির ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় যোগ্য জনবল ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
স্ট্যাটাসে আরও দাবি করা হয়, অযোগ্য ব্যক্তিদের দ্রুত পদোন্নতি দিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে বেতন কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে—যা স্বাভাবিক মানবসম্পদ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অভিযোগের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো কর্মকর্তা যাদের দুই বছর আগেও বেতন তুলনামূলক কম ছিল, তাদের নামে এখন উচ্চমূল্যের ফ্ল্যাট ও গাড়ি রয়েছে—যা আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে সন্দেহ তৈরি করছে। এসব বিষয় মিলিয়েই লাইফ ফান্ড নেগেটিভ হওয়ার কারণ হিসেবে “অভ্যন্তরীণ অনিয়ম” ও “দুর্বল তদারকি”-কে দায়ী করা হচ্ছে।
আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো—প্রতিষ্ঠানের সিইওরা নাকি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না। সিন্ডিকেটের সঙ্গে তাল না মিললে পরিচালনা পর্ষদের কাছে ভুলভাবে বিষয় উপস্থাপন করে সিইওদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে। এতে করে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও পেশাদার শাসন কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়—যার প্রভাব পড়ে লাইফ ফান্ডসহ সামগ্রিক আর্থিক স্বাস্থ্যে। তবে এসব অভিযোগ এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্তে প্রমাণিত নয়। কোম্পানির পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা বা অবস্থান জনসমক্ষে আসেনি। বীমা খাতে লাইফ ফান্ড নেগেটিভ হওয়ার পেছনে অ্যাকচুয়ারিয়াল হিসাব, দাবি নিষ্পত্তির চাপ, বিনিয়োগ আয়ের ওঠানামা এবং বাজার বাস্তবতার মতো বৈধ কারণও থাকতে পারে—যা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—নবাগত সিইও অজিত চন্দ্র আইস কি পুরোনো অভিযোগিত সিন্ডিকেট ভাঙতে পারবেন? নাকি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও মালিক পক্ষের সরলতার সুযোগ নিয়ে একই চক্র আবারও প্রাধান্য বিস্তার করবে? উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন স্বচ্ছ অডিট, শক্তিশালী বোর্ড গভর্ন্যান্স, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্রিয় নজরদারি এবং হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা।
শেষ পর্যন্ত, অভিযোগ সত্য হোক বা না হোক—যমুনা লাইফসহ পুরো বীমা খাতের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে জবাবদিহি, পেশাদারিত্ব ও আইনের শাসন নিশ্চিত করাই একমাত্র পথ।