নূরনবী সোহেল, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক পিএলসিতে ২০১৯ সালের ৪ হাজার কম্পিউটার ক্রয়কে ঘিরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ বছরের পর বছর ঝুলে আছে। অভিযোগ ওঠার পর অভ্যন্তরীণ তদন্ত, দায় নির্ধারণ, শাস্তিমূলক সুপারিশ এসব কিছু কাগজে থাকার কথাই শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। তদন্ত প্রতিবেদন অদৃশ্য সিদ্ধান্তের স্মারক নম্বর অপ্রকাশিত। আর দুদক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের দপ্তরগুলো নীরব। এই নীরবতা শুধু একটি ব্যাংকের ভেতরের অনিয়ম নয়। এটি রাষ্ট্রীয় তদারকি ও জবাবদিহির কাঠামোর মুখে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই ক্রয় কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগে সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন আইটির জিএম ও বর্তমানে ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) মো. আবু সাঈদের বিরুদ্ধে দুদকে লিখিত অভিযোগ দাখিল হয়। এরপর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করে বলে জানা যায়। তদন্ত শেষে কমিটি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দায়ী করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে অবহিত করার কথা উল্লেখ করেছে এমন দাবি সংশ্লিষ্ট মহলে আছে। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনটির স্মারক নম্বর, সুপারিশ বাস্তবায়নের আদেশ, বিভাগীয় সিদ্ধান্ত এসবের কোনো প্রকাশ্য নথি জনসমক্ষে নেই। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের এমন একটি বড় ক্রয়ের ক্ষেত্রে নথি গোপন থাকাই বরং বেশি শোরগোল তোলে।
প্রশ্নটি সোজা। তদন্ত যদি হয়েই থাকে, তবে প্রতিবেদন কোথায়। দায় যদি নির্ধারিত হয়ে থাকে, তবে শাস্তি কোথায়। আর যদি কিছুই না হয়ে থাকে, তাহলে তদন্ত কমিটি গঠন ও সুপারিশের গল্প জনসমক্ষে কেন। অভিযোগ আরও গুরুতর। বলা হচ্ছে, তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফজাল করিম এবং প্রভাবশালী পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের হস্তক্ষেপে তদন্ত প্রতিবেদন কার্যত অকার্যকর করে রাখা হয়। পরিচালনা পর্ষদকে প্রভাবিত করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার দাবিও উঠেছে। এসব অভিযোগ প্রমাণসাপেক্ষ। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে যে কোনো বড় ক্রয়ে এমন অভিযোগ ওঠা মানেই উচ্চ ঝুঁকির লাল সংকেত। কারণ এখানে ব্যর্থতা শুধু একজন কর্মকর্তার নয়। ব্যর্থতা পুরো জবাবদিহির কাঠামোর।
দুদকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন পাহাড়সম। অভিযোগ দাখিলের পর তদন্তের অগ্রগতি কী। অনুসন্ধান রিপোর্ট হয়েছে কি না। কমিশন কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না। জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ এমন একটি অভিযোগে এত দীর্ঘ নীরবতার যুক্তি কী। প্রশাসনিক চাপ না কি প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতা। নাকি ক্ষমতাবানদের জন্য নিয়মের দাঁত ভোঁতা হয়ে যায়। দুদক যদি নির্দিষ্ট সময়ে অনুসন্ধান ও সিদ্ধান্তের তথ্য প্রকাশ না করে, তাহলে জনগণ কীভাবে বুঝবে রাষ্ট্রের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান বাস্তব নাকি কেবল কাগুজে।
একইভাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ভূমিকা নিয়েও মৌলিক প্রশ্ন উঠেছে। ব্যাংকের তদন্ত কমিটির সুপারিশ বিভাগে পৌঁছালে বিভাগ কী করল। বিভাগ কি কোনো নির্দেশনা দিয়েছে। কোনো স্মারক জারি করেছে। কোনো শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে। নাকি ফাইল চাপা পড়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ওপর বিভাগীয় তদারকির মানদণ্ড যদি গোপন থাকে, তাহলে সেই তদারকি কার্যকর বলার ভিত্তি কোথায়।
এই ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা কর্মকর্তা বর্তমানে পদোন্নতি ও পদায়নের মাধ্যমে আরও উঁচু পদে আছেন বলে নথিতে দেখা যায়। বর্ণিত তথ্যমতে, ৯ এপ্রিল ২০২৪ তারিখে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রজ্ঞাপনে তিনি ডিএমডি পদে পদোন্নতি পান এবং ২৪ এপ্রিল ২০২৪-এর আরেক প্রজ্ঞাপনে সোনালী ব্যাংক পিএলসিতে পদায়ন করা হয়। পদোন্নতি ও পদায়নের প্রজ্ঞাপন জনসমক্ষে থাকলেও অভিযোগ নিষ্পত্তি বা তদন্তের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কোনো স্মারক জনসমক্ষে নেই। অর্থাৎ একদিকে পদোন্নতির দরজা খোলা, অন্যদিকে অভিযোগের দরজা তালাবদ্ধ। এমন বৈপরীত্যই দুর্নীতির সংস্কৃতিকে অক্সিজেন দেয়।
এখানে আরেকটি প্রশ্ন অনিবার্য। অভিযোগ নিষ্পত্তি ছাড়াই পদোন্নতি হলে যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া কোথায় থামে। নিয়োগ, পদোন্নতি, সততা যাচাই এসব কি কেবল আনুষ্ঠানিকতা। নাকি প্রভাবের কাছে প্রক্রিয়া নতি স্বীকার করে।
কর্মকর্তার ব্যক্তিগত যোগ্যতা, চাকরি জীবনের পদায়ন, প্রশিক্ষণ এসব বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য প্রচারিত রয়েছে। তিনি ২০০৪ সালে সিনিয়র প্রোগ্রামার হিসেবে যোগদান করেছেন বলেও বর্ণনা আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, পরে এমবিএ এবং আইবিবি থেকে ডিএআইবিবি ডিগ্রি অর্জনের কথাও উল্লেখ করা হয়। যোগ্যতা থাকা অপরাধ নয়। কিন্তু যোগ্যতা কখনো অভিযোগের ঢাল হতে পারে না। অভিযোগ ওঠার পর স্বচ্ছ তদন্তই একমাত্র পথ। কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে প্রশ্নটি ব্যক্তিকে ঘিরে সীমিত থাকে না। প্রশ্নটি জনগণের অর্থ, রাষ্ট্রীয় ক্রয় এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার স্বচ্ছতা নিয়ে।
অভিযোগের সঙ্গে আরও দাবি যুক্ত হয়েছে। দ্রুত পদোন্নতির পেছনে অসাধু উপায়, রাজনৈতিক প্রভাবশালী সংগঠনের পদ ব্যবহার করে অনৈতিক সুবিধা নেওয়া এসব দাবি প্রমাণ ছাড়া সিদ্ধান্ত নয়।
“এখানে আরেকটি প্রশ্ন অনিবার্য। অভিযোগ নিষ্পত্তি ছাড়াই পদোন্নতি হলে যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া কোথায় থামে। নিয়োগ, পদোন্নতি, সততা যাচাই এসব কি কেবল আনুষ্ঠানিকতা। নাকি প্রভাবের কাছে প্রক্রিয়া নতি স্বীকার করে।”
ব্যাংকের মূল কাজ হচ্ছে জেনারেল ব্যাংকিং, ফরেন এক্সচেঞ্জ, লোন অ্যান্ড এডভান্স ইত্যাদি। কিন্তু অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা কর্মকর্তা মো. আবু সাঈদ তার দীর্ঘ কর্মজীবনে কখনো কোনো শাখায় কাজ করেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে। জেনারেল ব্যাংকিং, ফরেন এক্সচেঞ্জ বা লোন অ্যান্ড এডভান্স—ব্যাংকিংয়ের এই মৌলিক কার্যক্রমে তার সরাসরি কোনো অভিজ্ঞতার নজির পাওয়া যায় না। এমন একজন কর্মকর্তা কোন বিবেচনায় ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) পদে উন্নীত হলেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার একটি শাখার নেতৃত্ব দেওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই, তিনি কীভাবে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের সামগ্রিক পরিচালনা ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তে নেতৃত্ব দেবেন—এই প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব এখনো অমীমাংসিত। কিন্তু এসব দাবি ওঠার পরও কোনো তদন্ত নেই বা তদন্তের ফল অদৃশ্য থাকলে সেটিই হয় প্রশাসনিক ব্যর্থতা। আর প্রশাসনিক ব্যর্থতাই শেষ পর্যন্ত দুর্নীতির বড় আশ্রয়স্থল।
বিশেষজ্ঞদের মত অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বড় ক্রয় সিদ্ধান্তে নথি প্রকাশ, স্মারক নম্বর, তদন্তের ফল, শাস্তির আদেশ এসব জনস্বার্থ-সম্পর্কিত তথ্য। তদন্ত হলে নথি দেখাতে হবে। তদন্ত না হলে বলতে হবে কেন হয়নি। মাঝামাঝি এই ধূসরতা সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভবিষ্যতের অনিয়মকে উৎসাহিত করে। বারবার একই চিত্র দেখা যায়। অভিযোগ ওঠে, তদন্ত কমিটি হয়, তারপর নীরবতা নেমে আসে, আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব ঢেকে যায়।
এখন সময় নির্দিষ্ট জবাবের। সোনালী ব্যাংককে বলতে হবে, ২০১৯ সালের ৪ হাজার কম্পিউটার ক্রয় বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের স্মারক নম্বর কী, কারা কমিটিতে ছিলেন, কী সুপারিশ করা হয়েছিল, কোন তারিখে কার কাছে পাঠানো হয়েছিল এবং কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দুদককে বলতে হবে, অভিযোগের ফাইল কোন পর্যায়ে। অনুসন্ধান হয়েছে কি না। সিদ্ধান্ত কী, জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশে বাধা কোথায়। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে জানাতে হবে, ব্যাংকের সুপারিশ পেলে তারা কী করেছে, পদোন্নতির আগে সততা যাচাইয়ের মানদণ্ড কী ছিল, অভিযোগ ঝুলে থাকলে তা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি কোনো দয়া নয়। এটি বাধ্যবাধকতা। যে রাষ্ট্র দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার কথা বলে, সেই রাষ্ট্রের দপ্তরগুলো যদি অভিযোগের সামনে নীরব থাকে, তাহলে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়বেই।
শেষ প্রশ্নটি তাই আরও কঠোর। দুদক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কি তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবে, নাকি ক্ষমতাবানদের দায়মুক্তির সংস্কৃতি আগের মতোই বহাল থাকবে। কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এই নীরবতা ভাঙবে না। আর নীরবতা ভাঙা না গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ওপর জনগণের আস্থা ক্ষয় হবে, দায় এড়ানোর সুযোগ থাকবে না কারও।
যোগাযোগ করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে। বক্তব্য পাওয়া গেলে তা হুবহু প্রকাশ করা হবে।