রংপুরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক অফিস নির্মাণে দুর্নীতির মহোৎসব
১৭ কোটি টাকার সরকারি প্রকল্পে নিম্নমানের কাজ, ঠিকাদারি স্বেচ্ছাচারিতা ও তদারকির ভয়াবহ ব্যর্থতা
ক্রাইম রিপোর্টার : রংপুরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক অফিস ভবন নির্মাণ প্রকল্পে যে অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ উঠেছে, তা কেবল একটি প্রকল্পের সীমাবদ্ধতা নয়; বরং এটি দেশের সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির এক নগ্ন ও ভয়াবহ চিত্র। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (EED) বাস্তবায়নাধীন প্রায় ১৭ কোটি ২৫ লাখ টাকার এই প্রকল্পে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মালিহা–সম্রাট জেভির স্বেচ্ছাচারিতা, তদারকির চরম ব্যর্থতা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের রহস্যজনক নীরবতা জনমনে গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
রংপুর সিটি কর্পোরেশনের ২২ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনসি মোড় এলাকায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্মিতব্য ১০ তলা ভিত্তিসহ ১০ তলা আঞ্চলিক অফিস ভবনটি শিক্ষা প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হওয়ার কথা ছিল। অথচ বাস্তবে এই ভবন এখন দুর্নীতি, অনিয়ম ও নিম্নমানের নির্মাণকাজের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকল্পটি ২০২১ সালে শুরু হলেও নির্ধারিত ২৮ মাস পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি। উল্টো নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই ভবনের বিভিন্ন অংশে ধস, ফাটল, প্লাস্টার খসে পড়া এবং কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সরকারি সাইনবোর্ড ও নথি অনুযায়ী প্রকল্পের দরপত্র বিজ্ঞপ্তি নং পি-০৩-৩৪ এনইউ/আঞ্চলিক অফিস/ইইডি/রংপুর/২০২০-২১/৪৮১। দরপত্র বিজ্ঞপ্তির তারিখ ১৫ অক্টোবর ২০২০। কাজ শুরুর নির্দেশ দেওয়া হয় ২৮ জানুয়ারি ২০২১। নির্ধারিত সময়সীমা ছিল ২৮ মাস। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মালিহা–সম্রাট জেভি, ঠিকানা কলাবাগান, ঢাকা। দরপত্র মূল্য ১৭ কোটি ২৫ লাখ ৩ হাজার ১৫৪ টাকা। বাস্তবায়নকারী সংস্থা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (EED)। ঠিকাদারের নাম ইকবাল হোসেন এবং সাইট ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্বে আছেন মিঠু মিয়া।
সরেজমিন পরিদর্শন ও স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে একাধিক গুরুতর অনিয়মের তথ্য। অভিযোগ রয়েছে নকশা অনুযায়ী মানসম্পন্ন বালু ব্যবহার না করে নিম্নমানের বালু ব্যবহারের। নির্ধারিত মানের রডের পরিবর্তে কম শক্তির রড ব্যবহার করা হয়েছে। দেয়াল নির্মাণে তৃতীয় শ্রেণির ইট ব্যবহার করা হয়েছে। সিমেন্টের পরিমাণ কম হওয়ায় প্লাস্টার ঝরে পড়ছে ও ভেঙে পড়ছে। ফ্লোর ও ওয়াশরুমের টাইলস অল্প সময়েই ভেঙে যাচ্ছে ও খসে পড়ছে। দরজা-জানালা ও ফিটিংসে ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের কাঠ ও সামগ্রী। এমনকি বৈদ্যুতিক কাজেও সরকারি মানদণ্ড ও নিরাপত্তা বিধি উপেক্ষা করার অভিযোগ উঠেছে।
এই সব অনিয়মের সরাসরি ফল হিসেবে ভবনের একাধিক অংশ নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও ফাটল, কোথাও ধসের চিহ্ন স্পষ্ট। এলাকাবাসীর আশঙ্কা, এই ভবন দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারযোগ্য হবে কি না, তা নিয়েই বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অফিস ভবন যদি এভাবে নির্মিত হয়, তবে তা ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রকল্পের তদারকি কার্যক্রম ছিল অত্যন্ত দুর্বল। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট গণপূর্ত অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিয়মিত সাইট পরিদর্শন করেননি। ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের ইচ্ছেমতো নিম্নমানের কাজ চালিয়ে গেছে। স্থানীয়দের মতে, এটি কেবল অবহেলা নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক যোগসাজশ ও দায়িত্বহীনতা।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, অনিয়মের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরও স্থানীয় কিছু সাংবাদিক ও প্রশাসনের একটি অংশ রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছেন। এলাকাবাসীর দাবি, আর্থিক লেনদেন ও প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে অনিয়মের তথ্য চেপে রাখার চেষ্টা চলছে। যদিও এসব অভিযোগ এখনও আনুষ্ঠানিক তদন্তে প্রমাণিত হয়নি, তবে বিষয়টি স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্তের দাবি জোরালো করেছে।
একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি অর্থে নির্মিত হলেও এখানে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ। তারা জানান, ভবনটির বর্তমান অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে এটি দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদভাবে ব্যবহার করা যাবে না। কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেন, দুর্নীতি ও তদারকির অভাবে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায় কেউ নেবে না।
এলাকাবাসী পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেছেন। তারা মালিহা–সম্রাট জেভির বিরুদ্ধে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানান। মানহীন অংশ ভেঙে সরকারি নকশা অনুযায়ী পুনর্নির্মাণের আহ্বান জানান। নির্মাণসামগ্রী পরীক্ষার স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার দাবি তোলেন। তদারকি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথা বলেন। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ঝুঁকি এড়াতে শক্তিশালী মনিটরিং টিম গঠনের দাবি জানান।
এই প্রকল্প ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—একটি প্রকল্পেই যদি এমন ভয়াবহ অনিয়ম হয়, তবে দেশের বিভিন্ন জেলায় চলমান একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য সরকারি কাজের মান কতটা প্রশ্নবিদ্ধ? সংশ্লিষ্ট গণপূর্ত অফিস, ঠিকাদার, প্রতিষ্ঠান মালিক ও ব্যবস্থাপকদের ভূমিকা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উন্মোচন না হলে এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে না। সরকারি অর্থের সুরক্ষা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই কঠোর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন—অন্যথায় এই দুর্নীতির সংস্কৃতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব পরবর্তীতে বিস্তারিত আসছে..