রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৩৩ পূর্বাহ্ন
ব্যাংক বীমা অর্থনিউজ
কুমিল্লা তিতাসে এমপি অধ্যক্ষ সেলিম ভূইয়াকে গণসংবর্ধনা খুলনায় পুলিশ কনস্টেবলের মৃত্যু: নীরব যন্ত্রণার আড়ালে এক মানবিক বার্তা কৃষকের অর্থনীতি শক্তিশালী হলে সামগ্রিক অর্থনীতি মজবুত হবে —মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষি মন্ত্রী জলবদ্ধতা দূরীকরণ, চাষাবাদ বৃদ্ধি ও প্রকৃতি বাঁচাতে খাল খনন অব্যাহত রাখা হবে ‎——- পানি সম্পদ মন্ত্রী বিশেষ অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ১৫ জনকে গ্রেফতার করেছে মুগদা থানা পুলিশ হজযাত্রী সেবা কাজকর্ম মনিটরিংয়ে গভীর রাতে হজক্যাম্পে ধর্মমন্ত্রী কায়কোবাদ আগামী বছরে সঠিক সময়ে বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে: প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ দল-মতের ঊর্ধ্বে থেকে দেশ গঠনে যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করার আহ্বান যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর মোহাম্মদপুরে চাঞ্চল্যকর আসাদুল হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই জড়িত মূল হোতাসহ চারজন গ্রেফতার প্রবীণ সাংবাদিকদের অবসর ভাতা বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার: তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী

বোর্ডবিহীন পরিচালনা, প্রশাসনিক শূন্যতা ও কোটি টাকার লুটপাটে বিপর্যস্ত ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেড

সংবাদ দাতার নাম
  • প্রকাশের সময় : বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১২২ বার পড়া হয়েছে

অনুসন্ধানী প্রতিবেদকঃ ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডে চলমান প্রশাসনিক অচলাবস্থা, বৈধ পরিচালনা পর্ষদের অনুপস্থিতি এবং সংঘবদ্ধ আর্থিক অনিয়ম এখন দেশের বীমা ও পুঁজিবাজার খাতের জন্য একটি অশনিসংকেত। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য, অভ্যন্তরীণ নথিপত্র, সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে—তালিকাভুক্ত এই বীমা কোম্পানিটি দীর্ঘদিন ধরে কার্যত কোনো বৈধ বোর্ড ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে, যা কোম্পানি আইন, বীমা আইন ও কর্পোরেট গভর্ন্যান্স নীতিমালার সরাসরি ও গুরুতর লঙ্ঘন।

চেয়ারম্যান ও বোর্ড উধাও, কোম্পানি চলছে অদৃশ্য শক্তিতে
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ফ্যাসিবাদী শাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কোম্পানির চেয়ারম্যানসহ পরিচালনা পর্ষদের অধিকাংশ সদস্য দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত ও আত্মগোপনে রয়েছেন। এর ফলে গত পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডে কোনো নিয়মিত চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কিংবা বৈধ বোর্ড সভা নেই। অথচ একটি তালিকাভুক্ত বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে বোর্ড ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনা করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
বীমা খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন নেতৃত্বশূন্যতা কেবল অনিয়মের পথই প্রশস্ত করে না, বরং এটি শেয়ারহোল্ডারদের অর্থ আত্মসাতের একটি সংগঠিত কাঠামো তৈরি করে।
বোর্ড ছাড়াই সিইও নিয়োগ, সিগনেটরি ছাড়াই কোটি টাকা উত্তোলন
সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে—বোর্ড মিটিং ছাড়া কীভাবে একজন সিইও নিয়োগ পায়? কোনো বোর্ড রেজোলিউশন বা অনুমোদিত সিগনেটরি ছাড়াই কীভাবে এমডি বিহীন অবস্থায় চেক স্বাক্ষর করে কোটি কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়? অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে।
অভিযোগ অনুযায়ী, কোম্পানি সেক্রেটারি চৌধুরী এহসানুল হক, ভারপ্রাপ্ত সিইও মো. মইনুল হাসান চৌধুরী এবং আন্ডাররাইটিং বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বোর্ড সভা ছাড়াই আর্থিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আসছেন। এসব কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ মদদ দিচ্ছেন ভাইস চেয়ারম্যান ও স্পন্সর ডিরেক্টর নূর মোহাম্মদ।
প্রিমিয়াম আয় হলেও টাকা যাচ্ছে কোথায়?
সূত্র জানায়, ডিসেম্বর ২০২৫ মাসেই কোম্পানিটি প্রায় ৮ কোটি টাকা প্রিমিয়াম আয় করেছে। কিন্তু এর সিংহভাগ অর্থ প্রশাসনিক ব্যয়, কমিশন, ভাতা ও বিভিন্ন খাতে খরচ দেখিয়ে অনিয়মের মাধ্যমে বের করে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া বিল ও অস্বাভাবিক কমিশন দেখিয়ে সিন্ডিকেটের সদস্যরা ব্যক্তিগত পকেট ভারী করছেন।
বীমা বিশ্লেষকদের মতে, বোর্ড অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের লেনদেন কেবল অবৈধই নয়, এটি শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণার শামিল।
উত্তরা ব্রাঞ্চে বেতন ও ক্লেইম কেলেঙ্কারি
অনিয়মের জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে উত্তরা ব্রাঞ্চের ঘটনা। সেখানে এক ব্রাঞ্চ ম্যানেজারকে মাসিক ৬ লাখ টাকা বেতন দেওয়া হচ্ছে—যার মধ্যে থেকে প্রতি মাসে অন্তত ২ লাখ টাকা সিন্ডিকেটের পকেটে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া উত্তরা ব্রাঞ্চের মাধ্যমে সংঘটিত ‘প্রতীক সিরামিক’ ক্লেইম কেলেঙ্কারির তদন্ত বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চলমান, যা কোম্পানির ভেতরে দীর্ঘদিনের অনিয়মের একটি স্পষ্ট প্রমাণ।
আইডিআরএর চিঠি উপেক্ষা, রহস্যজনক নীরবতা
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি (আইডিআরএ) এসব অনিয়ম সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিভিন্ন সময় অসন্তোষ প্রকাশ করে চিঠিপত্র পাঠালেও কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা তা উপেক্ষা করে আসছেন।
আরও বিস্ময়কর হলো, সাম্প্রতিক সময়ে কোম্পানিটিকে মাত্র ৫ লাখ টাকা জরিমানা করে কোটি কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়কে কার্যত বৈধতা দেওয়া হয়েছে। এতে বীমা খাতের স্বচ্ছতা প্রত্যাশী মহল গভীর হতাশা প্রকাশ করেছে। অনেকেই মনে করছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ ছাড়া এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন সম্ভব নয়।
স্টক এক্সচেঞ্জের নীরবতা কি প্রশ্নবিদ্ধ নয়?
এই সমস্ত অনিয়ম সরাসরি সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থের পরিপন্থী। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ না করলে লক্ষ লক্ষ সাধারণ শেয়ারহোল্ডার চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন—এটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ এসব অনিয়ম সম্পর্কে জেনেও যদি নীরব থাকে, তবে তাদের ভূমিকার বৈধতা ও নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে বোর্ড ছাড়া পরিচালনা, অবৈধ অর্থ উত্তোলন ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা চললেও স্টক এক্সচেঞ্জের নিষ্ক্রিয়তা পুঁজিবাজারের জন্য মারাত্মক বার্তা বহন করে।
রাজনৈতিক ছায়া ও কোম্পানির নীরবতা
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, ফ্যাসিবাদী শাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের ছায়া-নিয়ন্ত্রণ এখনো কোম্পানিটির ওপর বিদ্যমান। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি। কোম্পানির সেক্রেটারি, সিএফও ও ভাইস চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত বা মৌখিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
শেষ কথা
বিশ্লেষকদের মতে, অবিলম্বে বৈধ বোর্ড পুনর্গঠন, নিরপেক্ষ ফরেনসিক অডিট, অবৈধ নিয়োগ ও লেনদেন বাতিল এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেড কেবল একটি কোম্পানির সংকট নয়—বরং এটি পুরো বীমা ও পুঁজিবাজার ব্যবস্থার জন্য এক ভয়াবহ নজিরে পরিণত হবে।

এ বিভাগের আরো সংবাদ
©1992 All rights reserved
Design by: POPULAR HOST BD
themesba-lates1749691102