এম হোসাইন আহমদ, বিশেষ প্রতিবেদকঃ সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন ও দেশের প্রথম নারী সরকারপ্রধান বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় ফজরের ঠিক পরপরই তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর ইন্তেকালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক দীর্ঘ, দৃঢ় ও মর্যাদাপূর্ণ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল।
বিএনপির মিডিয়া সেল ও ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া পৃথক পোস্টে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়। পোস্টে বলা হয়, “বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ সকাল ৬টায় ইন্তেকাল করেছেন। আমরা তাঁর রূহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং সকলের নিকট দোয়া প্রার্থনা করছি।”
দীর্ঘদিন ধরে হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, লিভার সিরোসিস ও কিডনির জটিলতাসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। শ্বাসকষ্ট তীব্র হলে গত ২৩ নভেম্বর তাঁকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চললেও শেষ পর্যন্ত জীবনযুদ্ধে হার মানেন তিনি।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক নীরব কিন্তু অটল শক্তি। উত্তাল রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি ছিলেন সংযম, মর্যাদা ও দৃঢ়তার প্রতীক। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যার পর দেশ যখন গভীর অস্থিরতায়, তখন এক নিভৃত গৃহিণী থেকে তিনি উঠে আসেন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে—কোনো প্রতিহিংসা নয়, কোনো উচ্চকণ্ঠ প্রতিশোধ নয়, বরং নীরব আত্মমর্যাদা ও বিশ্বাসের শক্তি নিয়ে।
তাঁর রাজনীতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল নৈতিক সংযম। কঠিনতম প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও তিনি ব্যক্তিগত আক্রমণ বা বিদ্বেষমূলক ভাষা থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। এই সংযম ছিল তাঁর দুর্বলতা নয়; বরং সেটিই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।
কারাবাস, অসুস্থতা ও একাকিত্ব—সবকিছুর মুখোমুখি হয়েও তিনি কখনো দেশ ছাড়াকে সহজ পথ হিসেবে বেছে নেননি। বিদেশে নিরাপদ চিকিৎসার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বারবার দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, জেনেই যে সামনে অপেক্ষা করছে বন্দিদশা ও কষ্ট। এই আত্মত্যাগ তাঁকে শুধু একজন রাজনীতিক নয়, বরং সহনশীলতা ও নীরব প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত করেছে।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় বেগম খালেদা জিয়া ও তাঁর স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান ইতিহাসে অবিচ্ছেদ্য। ১৯৭৫ সালে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের পথ খুলে দেন জিয়াউর রহমান। আর ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এরশাদের সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নেতৃত্ব দেন বেগম খালেদা জিয়া। ইতিহাসের ভিন্ন দুই অধ্যায়ে এই দম্পতি দেশকে ফিরিয়ে এনেছেন রাজনৈতিক বহুত্ববাদ ও গণতন্ত্রের ধারায়।
১৯৯১ সাল থেকে তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান। তিনি কখনো কোনো সংসদীয় আসনে পরাজিত হননি—এক অনন্য রাজনৈতিক রেকর্ডের অধিকারী তিনি।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করা বেগম খালেদা জিয়া শিক্ষা গ্রহণ করেন দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও সুরেন্দ্রনাথ কলেজে। ১৯৬০ সালে তিনি বিয়ে করেন মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানায়ক জিয়াউর রহমানকে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ফার্স্ট লেডি হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁর মৃত্যুতে শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নয়, একটি সময়ের অবসান ঘটল। যাঁরা তাঁকে “দেশনেত্রী” নামে সম্বোধন করতেন, তাঁদের হৃদয়ে আজ গভীর শূন্যতা। তাঁর পরিবার, দলীয় নেতাকর্মী ও অসংখ্য অনুসারীর প্রতি জানানো হচ্ছে গভীর সমবেদনা।
তিনি চলে গেছেন সৃষ্টিকর্তার কাছে। আল্লাহ্ যেন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন। তাঁর সৌম্যতা, সাহস ও দেশপ্রেম আগামী প্রজন্মের জন্য হয়ে থাকুক আলোকবর্তিকা। ইতিহাস হয়তো নীরবে আজ নিজের বৃত্ত সম্পূর্ণ করেছে। জীবনের কঠিনতম যন্ত্রণার মুখোমুখি হওয়া এই নারী রাজনীতিক শেষ পর্যন্ত বিদায় নিলেন দেশবাসীর অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে।
বেগম খালেদা জিয়া—বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে তিনি চিরকাল অম্লান থাকবেন।