এম হোসাইন আহমেদ, বিশেষ প্রতিবেদক:
লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা পরিণত হয় এক ঐতিহাসিক শোকসমাবেশে। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদির জানাজা আজ শনিবার দুপুর আড়াইটায় অনুষ্ঠিত হয়। এ জানাজা শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং তা হয়ে ওঠে জাতির বিবেকের উচ্চারণ, প্রতিবাদের প্রতীক এবং আত্মত্যাগের প্রতি সম্মিলিত শ্রদ্ধার প্রকাশ।
জানাজায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলসহ উপদেষ্টা পরিষদের একাধিক সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মানুষ শহীদ হাদির জানাজায় শরিক হয়ে তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
জানাজার আগে ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন শহীদ হাদির সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত পাঠ করেন। তিনি বলেন, শহীদ হাদি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার এক আপসহীন কণ্ঠস্বর, যিনি জীবনের বিনিময়ে হলেও ন্যায়ের পথ থেকে সরে যাননি। এরপর বক্তব্য রাখেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের। তিনি শহীদ হাদির আদর্শ, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক সচেতনতার কথা তুলে ধরে বলেন, “হাদির আত্মত্যাগ জাতির জন্য এক অনন্ত দায়বদ্ধতা সৃষ্টি করেছে।”
এরপর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বক্তব্য রাখেন। তিনি শহীদ হাদির আত্মত্যাগকে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের সংগ্রামে এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, শহীদদের রক্ত কখনো বৃথা যায় না, বরং তা জাতিকে নতুন পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে। বক্তব্য শেষে তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
পরিবারের পক্ষ থেকে শহীদ হাদির বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিক আবেগঘন বক্তব্য রাখেন। তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলে জানাজায় উপস্থিত হাজারো মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে তিনিই শহীদ হাদির জানাজায় ইমামতি করেন। জানাজা শেষে শহীদ হাদির মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার আবহে দাফন করা হয়। দাফনের সময়ও অসংখ্য মানুষ উপস্থিত থেকে দোয়া ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
জানাজায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা অংশ নেন। এছাড়া সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামানও জানাজায় উপস্থিত ছিলেন।
সকাল থেকেই জানাজায় অংশ নিতে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে মানুষের ঢল নামে। সকাল ১১টা ২০ মিনিটে সংসদ ভবনের প্রধান গেট খুলে দেওয়া হলে জনসমাগম আরও বেড়ে যায়। আসাদগেট, ফার্মগেট, খামারবাড়ি ও আশপাশের এলাকাগুলো মানুষের ভিড়ে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। লাখো মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি শহীদ শরিফ ওসমান হাদির প্রতি জাতির গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং তার আদর্শকে ধারণ করে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকারের এক ঐতিহাসিক দলিল হয়ে থাকবে।