নিজস্ব প্রতিনিধি :
ইসলামী ইন্সুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের অভিযোগে বীমা খাতজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন কোম্পানির সেক্রেটারি চৌধুরী আহসানুল হক এবং ভাইস চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ। তাদের বিরুদ্ধে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিয়ার)–এর নীতিমালা অমান্য করে একের পর এক বিধিবহির্ভূত সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, কোম্পানির সেক্রেটারি চৌধুরী আহসানুল হক আইডিয়ারের অনুমোদন ও নির্ধারিত নিয়ম-কানুন অনুসরণ না করেই গোপনে একটি অজ্ঞাত স্থানে কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আয়োজন করেন। এজিএম আয়োজনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নোটিশ প্রদান, সভার স্থান প্রকাশ, শেয়ারহোল্ডারদের যথাযথ অংশগ্রহণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অবহিত করা বাধ্যতামূলক হলেও এসবের কোনোটিই যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপর আরও মারাত্মক অভিযোগ উঠে আসে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) অপসারণকে কেন্দ্র করে। জানা গেছে, কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ বোর্ডের বৈধ সিদ্ধান্ত, আইনগত প্রক্রিয়া এবং আইডিয়ারের অনুমোদন ছাড়াই সিইও খালেক সাহেবকে চাকরি থেকে অবসানের একটি চিঠি প্রদান করেন। বীমা আইন ও আইডিয়ারের বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী, সিইও নিয়োগ বা অপসারণের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের বৈধ রেজুলেশন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন আবশ্যক হলেও এ ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি।
পরবর্তীতে অভিযোগ আরও ঘনীভূত হয় অবৈধভাবে ভারপ্রাপ্ত সিইও নিয়োগের ঘটনায়। অভিযোগ রয়েছে, কোম্পানির চেয়ারম্যান বা ভাইস চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর ছাড়াই অন্য একজন পরিচালককে দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে কোম্পানির সেক্রেটারি চৌধুরী আহসানুল হক নিয়ম বহির্ভূতভাবে মোঃ মইনুল হাসানকে ভারপ্রাপ্ত সিইও হিসেবে নিয়োগ দেন এবং ওই নিয়োগপত্র আইডিয়ারে প্রেরণ করেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি করপোরেট গভর্ন্যান্সের চরম লঙ্ঘন এবং ক্ষমতার সুস্পষ্ট অপব্যবহার।
এ বিষয়ে আইডিয়ারের মিডিয়া ও কমিউনিকেশন পরামর্শক সাইফুন্নাহার সুমি জানান, সিইও অপসারণের ক্ষেত্রে আইনগত পদ্ধতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। ফলে খালেক সাহেবের চাকরির অবসান সংক্রান্ত পত্রটি কর্তৃপক্ষ নামঞ্জুর করেছে। একই সঙ্গে আইডিয়ার ইসলামী ইন্সুরেন্স কর্তৃপক্ষকে একটি পত্রের মাধ্যমে নির্দেশ দিয়েছে—নীতিমালা অনুযায়ী সিইও খালেক সাহেবের সকল পাওনাদি পরিশোধ সাপেক্ষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ইসলামী ইন্সুরেন্স কোম্পানিটি বর্তমানে একটি পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের মতো পরিচালিত হচ্ছে। পরিচালনা পর্ষদের একাধিক সদস্য বিভিন্ন অভিযোগ ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে আত্মগোপনে থেকে দেশ ও দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। ফলে নিয়মতান্ত্রিক বোর্ড সভা, নীতিনির্ধারণ ও তদারকি কার্যক্রম কার্যত ভেঙে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কোম্পানির সেক্রেটারি চৌধুরী আহসানুল হক নিয়মিত বোর্ড সভা ছাড়াই এককভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে অতীতে তাকাফুল ইসলামী ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে কর্মরত অবস্থায় ব্যাপক অনিয়ম ও বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচিত।
এছাড়া ইসলামী ইন্সুরেন্স কোম্পানির বিরুদ্ধে নিয়ম বহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত কমিশন প্রদান করে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অতিরিক্ত ব্যয় ও কমিশন প্রদানের কারণে ইতোমধ্যে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কোম্পানিটিকে জরিমানাও করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও অনিয়ম বন্ধ না হওয়ায় বীমা খাতে আস্থার সংকট আরও গভীর হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বীমা খাতের স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় আইডিয়ারের উচিত এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। একই সঙ্গে অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ভারপ্রাপ্ত সিইও’র বিষয়টি বাতিল করে বৈধ সিইও খালেক সাহেবকে নীতিমালা অনুযায়ী সকল পাওনাদি পরিশোধসহ চাকরিতে পুনর্বহাল করা জরুরি।
বীমাগ্রহীতা ও সাধারণ জনগণের স্বার্থ রক্ষায় ইসলামী ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে চলমান এসব অনিয়ম বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।