নিজস্ব প্রতিবেদক :
বাংলাদেশের নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স খাত দীর্ঘদিন ধরেই এক গভীর আস্থার সংকটের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এই সংকটের পেছনে রয়েছে অনিয়ন্ত্রিত কমিশন প্রথা, নিয়ন্ত্রণ দুর্বলতা, আর্থিক শৃঙ্খলার অভাব এবং তার সরাসরি ফল হিসেবে ক্লেইম নিষ্পত্তিতে ব্যাপক অনিয়ম। সাম্প্রতিক সময়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ব্যক্তিগত এজেন্ট কমিশন শূন্য শতাংশ নির্ধারণের যে নোটিশ জারি করেছে, তা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই সিদ্ধান্ত কি বাস্তবে কার্যকর হবে, নাকি আগের মতো কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স খাতের সংকট কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এক ধরনের বিকৃত ব্যবসায়িক সংস্কৃতির ফল, যেখানে ব্যবসা আহরণের একমাত্র হাতিয়ার হয়ে উঠেছে কমিশন। পণ্যের মান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সেবা কিংবা গ্রাহক স্বার্থ নয়—বরং কে কত বেশি কমিশন দিতে পারবে, সেটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিযোগিতার প্রধান মানদণ্ড।
আইডিআরএ দীর্ঘদিন ধরেই নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্সে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ কমিশন নির্ধারণ করে রেখেছে। এই সীমা নির্ধারণের পেছনে ছিল স্পষ্ট যুক্তি—কোম্পানির আর্থিক ভারসাম্য রক্ষা, টেকনিক্যাল রিজার্ভ সংরক্ষণ এবং সর্বোপরি পলিসিধারীদের ন্যায্য ক্লেইম নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে এই নীতিমালার কোনো কার্যকর প্রতিফলন দেখা যায়নি। বাজার বাস্তবতায় দেখা গেছে, অধিকাংশ নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি নিয়ম বহির্ভূতভাবে ৪০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন প্রদান করে ব্যবসা করছে।
এই অতিরিক্ত কমিশন কোনো গোপন বিষয় নয়। এটি প্রকাশ্যেই একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। কমিশন ছাড়া ব্যবসা পাওয়া যায় না—এই ধারণা এতটাই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে যে, নিয়ম মেনে চলতে চাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো বাজার থেকে ছিটকে পড়ার আশঙ্কায় নিজেরাই নিয়ম ভাঙতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে পুরো খাতই এক ধরনের ‘কমিশন দৌড়ে’ নেমেছে, যার শেষ পরিণতি অনিবার্যভাবে ক্লেইম সংকট।
২০২৪ সালের নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স খাতের মোট গ্রস প্রিমিয়াম আনুমানিক ১২ থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। আইডিআরএ নির্ধারিত ১৫ শতাংশ কমিশন অনুযায়ী এই অঙ্ক থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ১,৮০০ থেকে ১,৯০০ কোটি টাকা কমিশন বাবদ ব্যয় হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে যদি গড় কমিশন ধরা হয় ৪৫ শতাংশ, তাহলে মোট কমিশন ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৫,৫০০ থেকে ৬,০০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বৈধ সীমার বাইরে গিয়ে প্রতিবছর প্রায় ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত কমিশন হিসেবে খাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
এই বিপুল অঙ্কের অর্থ কোথা থেকে যাচ্ছে, তার হিসাব খুঁজলেই নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স খাতের আর্থিক সংকটের মূল কারণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে অর্থ ক্লেইম পরিশোধ, রিজার্ভ সংরক্ষণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত হওয়ার কথা, সেই অর্থই আগেই কমিশনের নামে বিতরণ হয়ে যাচ্ছে। ফলে ক্লেইম পরিশোধের সময় কোম্পানিগুলো আর্থিক চাপের অজুহাত দেখাতে বাধ্য হচ্ছে।
এর ফল ভোগ করছেন পলিসিধারীরা। বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা ক্লেইম, আংশিক পরিশোধ, অকারণ জটিলতা ও হয়রানি—সবই এখন নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স খাতের নিত্যদিনের বাস্তবতা। এই পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের আস্থা কমে যাওয়া স্বাভাবিক। বীমা যেখানে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেয়, সেখানে যদি ক্ষতিপূরণ পেতে হয় অনিশ্চয়তা ও অপেক্ষার মুখে, তাহলে সেই খাতের প্রতি মানুষের আস্থা টিকে থাকে না।
এই প্রেক্ষাপটে আইডিআরএ কর্তৃক নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ব্যক্তিগত এজেন্ট কমিশন শূন্য শতাংশ নির্ধারণের নোটিশ নিঃসন্দেহে একটি সাহসী নীতিগত সিদ্ধান্ত। নোটিশে বলা হয়েছে, নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স খাতে ব্যক্তিগত এজেন্ট লাইসেন্স প্রবর্তনের প্রেক্ষিতে কমিশন শূন্য শতাংশ নির্ধারণ করা হবে এবং এ বিষয়ে নির্দেশনা অনুসরণ নিশ্চিত করতে মনিটরিং জোরদার করা হবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সহায়তায় যৌথ মনিটরিং ব্যবস্থাও গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। কমিশন যদি সত্যিকার অর্থেই বন্ধ করা যায়, তাহলে নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স খাতের আর্থিক কাঠামোতে একটি মৌলিক পরিবর্তন আসতে পারে। ব্যবসা আহরণ তখন আর কমিশনের ওপর নির্ভর করবে না; বরং পণ্যের গুণগত মান, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও সেবার দক্ষতার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হবে। একই সঙ্গে ক্লেইম পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ কোম্পানির ভেতরেই সংরক্ষিত থাকবে।
তবে এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠে আসে—এই নীতিগত সিদ্ধান্ত কি বাস্তবে কার্যকর হবে? অতীত অভিজ্ঞতা আশাবাদী হওয়ার সুযোগ খুব বেশি দেয় না। এর আগেও কমিশন নিয়ন্ত্রণ, ব্যয় সীমা নির্ধারণ ও আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরানোর বিষয়ে নানা নির্দেশনা এসেছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রয়োগ খুবই সীমিত ছিল। ফলে নীতিমালা থাকলেও অনিয়ম থামেনি।
কমিশন বন্ধের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। প্রকাশ্যে কমিশন বন্ধ থাকলেও যদি গোপনে বা ভিন্ন নামে একই অর্থ বিতরণ চলতে থাকে, তাহলে অনিয়ম আরও গভীরে প্রোথিত হবে। সেজন্য এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে হলে আইডিআরএকে শুধু নোটিশ জারিতেই থেমে থাকলে চলবে না; প্রয়োজন কঠোর নজরদারি, নিয়মিত অডিট এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।
একই সঙ্গে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনার দায়বদ্ধতাও নিশ্চিত করতে হবে। অতিরিক্ত কমিশন কোনো একক কর্মচারীর সিদ্ধান্তে হয় না; এটি প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ফল। সুতরাং দায়ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই নির্ধারণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স খাত থেকে অনিয়ম দূর করার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো কমিশন সংস্কৃতি ভেঙে ফেলা। যতদিন কমিশনই থাকবে ব্যবসার প্রধান চালিকা শক্তি, ততদিন এই খাতে শৃঙ্খলা ফিরবে না। আইডিআরএ-এর সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত সেই সংস্কার প্রক্রিয়ার একটি সূচনা হতে পারে—যদি তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়।
বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থায় নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স খাতের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শিল্প, বাণিজ্য, অবকাঠামো ও ব্যক্তিগত সম্পদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় এই খাতের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু এই খাত যদি নিজেই অনিয়মে জর্জরিত থাকে, তাহলে তা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এখন সময় এসেছে নীতিগত সিদ্ধান্তকে বাস্তবতার মাটিতে নামিয়ে আনার। কমিশন বন্ধের ঘোষণা যেন কেবল একটি কাগুজে আশ্বাসে পরিণত না হয়। এটি কার্যকর হলে নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স খাত নতুন করে আস্থার জায়গা ফিরে পেতে পারে। আর তা ব্যর্থ হলে, এই খাতের সংকট আরও গভীর হবে—যার দায় শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে সাধারণ জনগণকেই।