শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩৩ অপরাহ্ন
ব্যাংক বীমা অর্থনিউজ
কৃষকের অর্থনীতি শক্তিশালী হলে সামগ্রিক অর্থনীতি মজবুত হবে —মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষি মন্ত্রী জলবদ্ধতা দূরীকরণ, চাষাবাদ বৃদ্ধি ও প্রকৃতি বাঁচাতে খাল খনন অব্যাহত রাখা হবে ‎——- পানি সম্পদ মন্ত্রী বিশেষ অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ১৫ জনকে গ্রেফতার করেছে মুগদা থানা পুলিশ হজযাত্রী সেবা কাজকর্ম মনিটরিংয়ে গভীর রাতে হজক্যাম্পে ধর্মমন্ত্রী কায়কোবাদ আগামী বছরে সঠিক সময়ে বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে: প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ দল-মতের ঊর্ধ্বে থেকে দেশ গঠনে যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করার আহ্বান যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর মোহাম্মদপুরে চাঞ্চল্যকর আসাদুল হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই জড়িত মূল হোতাসহ চারজন গ্রেফতার প্রবীণ সাংবাদিকদের অবসর ভাতা বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার: তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী পাকিস্তানি প্রতিপক্ষের সাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক বাংলাদেশের প্রথম হজ ফ্লাইট সৌদি আরব পৌঁছেছে

৩৬টি জীবন বীমা কোম্পানির তিন মাসে সাড়ে তিন লাখের বেশি বীমা পলিসি তামাদি

সংবাদ দাতার নাম
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১৭৫ বার পড়া হয়েছে

নূরনবী সোহেল, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ দেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী ৩৬টি জীবন বীমা কোম্পানিতে ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) পলিসি তামাদি বা বন্ধ করেছেন ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৫৯০ জন গ্রাহক। বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।

এর আগের প্রান্তিক অর্থাৎ ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল–জুন) পলিসি বন্ধ করেছিলেন ৩ লাখ ২৫ হাজার ২৬৬ জন গ্রাহক। সে হিসাবে দ্বিতীয় প্রান্তিকের তুলনায় তৃতীয় প্রান্তিকে পলিসি তামাদির হার বেড়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ।

আইডিআরএর প্রতিবেদনে দেখা যায়, তৃতীয় প্রান্তিকে সর্বাধিক পলিসি তামাদি হয়েছে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের। এই সময়ে কোম্পানিটির ৬৪ হাজার ৩০৫টি পলিসি বন্ধ হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স, যেখানে পলিসি তামাদি হয়েছে ৪৬ হাজার ৮৭৪টি। তৃতীয় স্থানে থাকা প্রাইম ইসলামী লাইফে বন্ধ হয়েছে ১৯ হাজার ১৮০টি পলিসি।

চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকেও পলিসি তামাদির শীর্ষে ছিল সোনালী লাইফ। ওই সময় কোম্পানিটির পলিসি তামাদি হয়েছিল ৭৩ হাজার ২৬৭টি। একই সময়ে ন্যাশনাল লাইফে পলিসি তামাদি হয়েছিল ৪৬ হাজার ৭৬৩টি।

বার্ষিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৩ সালে তামাদি হওয়া জীবন বীমা পলিসির সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৪২ হাজার। ২০২৪ সালে পলিসি বন্ধ করেছেন ১২ লাখ ৪৯ হাজার ১৬৮ জন গ্রাহক।

‘তামাদি’ একটি আরবি শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ বিলুপ্ত হওয়া বা বাধাপ্রাপ্ত হওয়া। বীমা খাতে এই শব্দটি বহুল পরিচিত। পলিসিধারী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রিমিয়াম পরিশোধে ব্যর্থ হলে নির্দিষ্ট সময় পর পলিসিটি তামাদি বা বন্ধ হয়ে যায়। পলিসি বন্ধ হলে গ্রাহক বীমা কাভারেজ থেকে বঞ্চিত হন এবং অনেক ক্ষেত্রে জমা দেওয়া অর্থও ফেরত পান না।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও পুঁজিবাজারের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বীমা খাত। তবে নানা কারণে সম্ভাবনাময় এই খাতে দীর্ঘদিন ধরেই আস্থার সংকট বিরাজ করছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ থাকলেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আস্থা ফিরছে না। এর সঙ্গে বছর বছর পলিসি তামাদি বা বন্ধ হওয়ার প্রবণতা সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।

বীমা খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, পলিসি তামাদির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। জীবন বীমা কোম্পানির প্রতিনিধিরা পলিসি বিক্রির সময় যতটা সক্রিয় থাকেন, পরবর্তী সময়ে ততটা মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না। গ্রাহকদের মধ্যেও বীমা বিষয়ে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। কিছু কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি কিছু অসাধু বীমা প্রতিনিধির বিরুদ্ধে গ্রাহকের কাছ থেকে প্রিমিয়াম নিয়ে তা আত্মসাতের ঘটনাও ঘটছে।

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স একাডেমির সাবেক পরিচালক এস. এম. ইব্রাহিম হোসেন এর আগে বাণিজ্য বার্তাকে বলেন, বীমা পলিসি তামাদি হওয়া কোম্পানি ও গ্রাহক উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। পলিসি বন্ধ হলে গ্রাহক অপ্রত্যাশিত ঘটনার ক্ষেত্রে যে সুরক্ষা পেতেন, তা থেকে বঞ্চিত হন। একই সঙ্গে এটি কোম্পানির রাজস্ব ক্ষতি ঘটায় এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা ও গ্রাহক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

আইডিআরএর প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, তৃতীয় প্রান্তিকে আকিজ তাকাফুল লাইফে ২,৯০১টি, আলফা ইসলামী লাইফে ১৫,৮৬৮টি, আস্থা লাইফে ১,২২৫টি, বায়রা লাইফে ১০৯টি, বেঙ্গল ইসলামী লাইফে ৮,০৫৪টি, বেস্ট লাইফে ৯৮৪টি, চার্টার্ড লাইফে ৪,১৭০টি, ডেল্টা লাইফে ২৭,৬০৮টি, ডায়মন্ড লাইফে ৬১০টি, ফারইস্ট ইসলামী লাইফে ৭৭৮টি, গোল্ডেন লাইফে ৩,৮৭২টি, গার্ডিয়ান লাইফে ৬,১৫৪টি, হোমল্যান্ড লাইফে ৩,৬০৮টি, যমুনা লাইফে ১৫১টি, জীবন বীমা করপোরেশনে ৪,১৩৬টি, লাইফ ইন্স্যুরেন্স করপোরেশন অব বাংলাদেশে ৫০৩টি, মেঘনা লাইফে ৩,৯৪৭টি, মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফে ৪,৪৮৮টি, মেটলাইফ বাংলাদেশে ১৮,৭১২টি, এনআরবি ইসলামী লাইফে ১,৩৮৯টি, পদ্মা ইসলামী লাইফে ৭১৯টি, পপুলার লাইফে ১৩,৪৮৩টি, প্রগতি লাইফে ১৭,২১৯টি, প্রাইম ইসলামী লাইফে ১৯,১৮০টি, প্রগ্রেসিভ লাইফে ২,৯২৬টি, প্রোটেক্টিভ ইসলামী লাইফে ৭৫৫টি, রূপালী লাইফে ১৭,৬৮৮টি, সন্ধানী লাইফে ১৫,৭৫৭টি, শান্তা লাইফে ৮২টি, সানফ্লাওয়ার লাইফে ২,৪৭৭টি, সানলাইফে ৩৯৬টি, স্বদেশ লাইফে ১৭,০৩৭টি, ট্রাস্ট ইসলামী লাইফে ৩,৪০০টি এবং জেনিথ ইসলামী লাইফে ৫,০২৫টি পলিসি তামাদি হয়েছে।

একটি জীবন বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বলেন, তামাদি হওয়া পলিসির বড় অংশই ক্ষুদ্র বীমা। অনেক গ্রাহক পরবর্তীতে একসঙ্গে বকেয়া প্রিমিয়াম পরিশোধ করে পলিসি চালু করেন। আবার কেউ কেউ কয়েক মাস পর সব পাওনা পরিশোধ করে পলিসি পুনরায় কার্যকর করেন। ফলে পলিসি তামাদি নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।

আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ২৬ লাখের বেশি জীবন বীমা পলিসি বাতিল বা তামাদি হয়েছে। ২০০৯ সালে মোট সক্রিয় পলিসির সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১২ লাখ, যা ২০২৩ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৮৫ লাখ ৮৮ হাজারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক তদারকি, দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ, কার্যকর গ্রাহক সুরক্ষা এবং সহজ সেবা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে জীবন বীমা খাতে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা কঠিন হবে।

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সদস্য ও জেনিথ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা এস. এম. নুরুজ্জামান বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে বীমা খাতকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি কোম্পানিগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। পলিসি তামাদি রোধে সময়মতো বীমা দাবি পরিশোধ, এজেন্টদের রিনিউয়াল প্রিমিয়ামের গুরুত্ব বোঝানো এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে পারলে তামাদির হার কমানো সম্ভব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. হাসিনা শেখ বলেন, পলিসি তামাদি হলে গ্রাহক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন, তেমনি কোম্পানিও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে। তাই পলিসি তামাদির মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে কোম্পানি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশে বীমা এজেন্টরা নতুন পলিসি বিক্রিতে বেশি মনোযোগী হলেও দ্বিতীয় বর্ষ থেকে প্রিমিয়াম আদায়ে সেই মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না। কমিশন কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে তারা পুরোনো পলিসির পরিবর্তে নতুন পলিসি বিক্রিতে ঝুঁকেন। এই কাঠামো সংস্কার এবং গ্রাহককে পলিসি বন্ধের ক্ষতি সম্পর্কে সচেতন করতে পারলে তামাদি পলিসির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

এ বিভাগের আরো সংবাদ
©1992 All rights reserved
Design by: POPULAR HOST BD
themesba-lates1749691102