ফারজানা ফারাবী, ধর্মীয় ডেক্সঃ মানুষ আল্লাহর সৃষ্টির সেরা জীব। কিন্তু এই শ্রেষ্ঠত্ব তখনই সত্যিকার অর্থে মূল্যবান হয়, যখন সে ন্যায়পরায়ণ হয়, অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হয় এবং কারো উপর জুলুম করে না। ইসলাম এমন এক ধর্ম, যেখানে জুলুম (অত্যাচার, অন্যায়, নিপীড়ন) নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে সর্বস্তরে। আল্লাহ তায়ালা ন্যায় প্রতিষ্ঠার আদেশ দিয়েছেন, আর জুলুমের বিরুদ্ধে করেছেন কঠোর সতর্কতা।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“তোমরা জুলুম করো না, কারণ জুলুম কিয়ামতের দিনে অন্ধকারের কারণ হবে।”
(সহিহ মুসলিম: ২৫৭৯)
এই হাদিসে এক গভীর সতর্কবার্তা রয়েছে। জুলুম শুধু কারো গায়ে আঘাত করা নয়, বরং কারো হক নষ্ট করা, কারো সম্মানহানি করা, মিথ্যা বলা, দায়িত্বে অবহেলা করা, কারো প্রাপ্য বেতন বা অধিকার আটকে রাখা—এসবও জুলুমের অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহর দৃষ্টিতে জুলুম সবচেয়ে ঘৃণিত অপরাধ
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন—
“আর তোমার প্রতিপালক কোনোভাবেই বান্দাদের প্রতি জুলুম করেন না।”
(সূরা ফুসসিলাত: ৪৬)
আল্লাহ নিজে যখন কোনো অন্যায় করেন না, তখন তিনি তাঁর বান্দাদেরও আদেশ করেছেন যে, তারা যেন কখনও জুলুম না করে। কারণ জুলুমের মাধ্যমে শুধু অন্যকে ক্ষতি করা হয় না, বরং নিজের আত্মাকেও কলুষিত করা হয়।
আল্লাহ বলেন—
“জালিমরা কখনো সফল হয় না।”
(সূরা আন‘আম: ২১)
আরেক জায়গায় আল্লাহ তায়ালা বলেন—
“জুলুমকারীদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না, তাহলে তোমাদের উপর আগুনের শাস্তি আসবে।”
(সূরা হুদ: ১১৩)
অর্থাৎ, শুধু জুলুম করা নয়, জুলুমকারীর পক্ষ নেওয়া বা তার অন্যায়ে নীরব থাকা—এটিও গোনাহ। ইসলাম জুলুমের বিরুদ্ধে শুধু মুখে নয়, কর্মে প্রতিবাদের নির্দেশ দেয়।
মজলুমের দোয়া — আল্লাহর দরবারে প্রত্যাখ্যাত হয় না
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“মজলুমের দোয়া থেকে সাবধান থাকো, কারণ তার দোয়া ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা নেই।”
(সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
এ হাদিসটি প্রমাণ করে যে, যখন কোনো মানুষ অন্যায়ভাবে কষ্ট পায়, তার হৃদয়ের আর্তনাদ সরাসরি আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যায়। তখন আল্লাহ তায়ালা সেই আর্তনাদ শুনেন, যদিও কখনো দেরি করেন, কিন্তু অবহেলা করেন না।
আরেক বর্ণনায় নবী করিম (সা.) বলেন—
“তিনটি দোয়া এমন, যা নিঃসন্দেহে কবুল হয়: মজলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া, ও পিতামাতার দোয়া সন্তানদের জন্য।”
(তিরমিজি: ১৯০৫)
এই হাদিসগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যে মানুষ কাঁদে অন্যায়ের যন্ত্রণায়, তার সেই কান্না হয় আল্লাহর কাছে সরাসরি আবেদন। আর যে জুলুম করে, সে আসলে নিজের ধ্বংসের বীজ নিজেই বপন করে।
ইমাম আলী (রাঃ) বলেছেন—
“জুলুম করো না, কারণ জুলুম এমন এক আগুন যা একদিন জুলুমকারীর গায়ে নিজেই লেগে যাবে।”
জুলুম শুধু ব্যক্তি নয়, সমাজকেও ধ্বংস করে
যে সমাজে জুলুম সহ্য করা হয়, সেখানে শান্তি টিকে না। অন্যায়ের উপর নীরবতা মানে অন্যায়কে শক্তিশালী করা। ইসলাম চায় ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হোক— এমনকি নিজের বা আপনজনের বিরুদ্ধেও।
কোরআনে আল্লাহ বলেন—
“হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর দৃঢ় থাকো, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সাক্ষ্য দাও, যদিও তা তোমাদের নিজের বা আত্মীয়দের বিরুদ্ধে যায়।”
(সূরা নিসা: ১৩৫)
এ আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ন্যায়ের পক্ষে থাকা মানে শুধু অন্যকে রক্ষা করা নয়, বরং নিজের আত্মাকে শুদ্ধ রাখা। কারণ জুলুম সহ্য করা মানে সমাজের নৈতিক ভিত্তি নষ্ট করা।
আর যখন সমাজে ন্যায় হারিয়ে যায়, তখন মানুষের মনে ভয়, ঘৃণা ও বিভাজন জন্ম নেয়। অথচ ইসলাম শান্তির ধর্ম—এ ধর্মের মূল ভিত্তিই হলো ন্যায় ও করুণা।
ন্যায়পরায়ণতার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“ন্যায়পরায়ণরা আল্লাহর কাছে নূরের মিম্বরে অবস্থান করবে, যারা তাদের সিদ্ধান্ত ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে ন্যায় করে।”
(সহিহ মুসলিম: ১৮২৭)
যে নেতা, বিচারক, শিক্ষক বা সাধারণ মানুষ ন্যায়ের পথে চলে, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। আর যে জুলুম করে, আল্লাহ তাকে অপমানিত করেন।
কিয়ামতের দিন জুলুমের প্রতিশোধ নেওয়া হবে নির্দয়ভাবে। নবী করিম (সা.) বলেছেন—
“কিয়ামতের দিনে হক আদায় করা হবে এমনভাবে যে, শিংওয়ালা পশু যেদিন শিংবিহীন পশুকে মেরেছিল, সেদিন সেই শিংবিহীন পশুকেও তার প্রতিশোধ দেওয়া হবে।”
(সহিহ মুসলিম: ২৫৮২)
অর্থাৎ, জুলুম এতটাই গুরুতর অপরাধ যে, আল্লাহ পশুদের মধ্যেও বিচার করবেন। তাহলে মানুষ কীভাবে রেহাই পেতে পারে?
উপসংহার
ইসলামের আলোকে স্পষ্ট— জুলুমকারীর জন্য কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেই। আজ যদি সে ক্ষমতার আসনে থাকে, কাল সে আল্লাহর ন্যায়বিচারের সামনে দাঁড়াবে একা।
তাই আমাদের উচিত— অন্যের প্রতি অন্যায় করার আগে একটু থেমে ভাবা। যার উপর তুমি জুলুম করছো, তার চোখের পানি আজ নীরব হলেও সেই অশ্রুর আওয়াজ একদিন আল্লাহর দরবারে প্রতিধ্বনিত হবে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সেই অমর বাণীটি মনে রাখো—
“মজলুমের দোয়া থেকে সাবধান! কারণ আল্লাহ তার আর্তনাদ প্রত্যাখ্যান করেন না।”
তাই আসো, আমরা ন্যায়ের পথে চলি, কারো অধিকার নষ্ট না করি, কারো উপর জুলুম না করি।
কারণ জুলুমের অন্ধকারে কোনো আলোক নেই, কিন্তু ন্যায়ের আলোয় আছে দুনিয়া ও আখিরাতের শান্তি।