১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ঢাকা
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
বাংলাদেশের বীমা খাত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানামুখী সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোয় বীমা একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলেও এখনো সাধারণ মানুষের আস্থার ঘাটতি, দক্ষ জনবল সংকট এবং সমন্বিত নীতিমালার অভাব প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ প্রেক্ষাপটে রাজধানীর কাকরাইলে অবস্থিত রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে এক আলোচনায় উঠে আসে শিল্পের উন্নয়ন ও সংবাদপত্রের সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে বাস্তবসম্মত মতামত।
কোম্পানির সিইও গোলাম কিবরিয়ার বিশেষ আলোচনায় অংশ নেন “দৈনিক এই আমার দেশ” ও “দৈনিক গড়ব বাংলাদেশ” পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক এম হোসাইন আহমদ আরো উপস্থিত ছিলেন “ব্যাংক বীমা অর্থ নিউজ”-এর নির্বাহী সম্পাদক নুরনবী সোহেল।
বীমা খাতের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
আলোচনার শুরুতেই গোলাম কিবরিয়া বাংলাদেশের বীমা শিল্পের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে বলেন,
“গ্রাহক সেবার মানোন্নয়ন এখন সময়ের দাবি। মানুষ বীমার সুবিধা সম্পর্কে যতটা জানে, ততটাই ভোগান্তির অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের। দাবি নিষ্পত্তি থেকে শুরু করে গ্রাহক সেবা সহো সব ক্ষেত্রেই আমাদের আরও স্বচ্ছতা ও দ্রুততা আনতে হবে।”
তিনি উল্লেখ করেন, দেশে প্রায় ৮০টিরও বেশি বীমা কোম্পানি থাকলেও তাদের কার্যক্রম ও নীতিমালা একেকজনের (টায়ার) একেকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এতে গ্রাহকদের আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। “একই নীতিমালার আওতায় সব কোম্পানিকে আনলে যেমন শৃঙ্খলা আসবে, তেমনি গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা বাড়বে।”
দক্ষ জনবলের সংকট
আলোচনায় উঠে আসে দক্ষ সেলস কর্মীর ঘাটতি প্রসঙ্গও। গোলাম কিবরিয়া বলেন, “বীমা শুধু পলিসি বিক্রির নাম নয়; এটি গ্রাহকের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব। তাই বিক্রয়কর্মীদের শুধু পলিসি বিক্রিতে উৎসাহিত করলেই হবে না, তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রকৃত সেবার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে।”
সংবাদপত্রের দায়িত্ব
এই আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় সংবাদপত্রের ভূমিকা প্রসঙ্গে। এম হোসাইন আহমদ বলেন,
“জনগণের আস্থার সংকট দূর করতে মিডিয়া সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে পারে। সংবাদপত্র শুধু সমালোচক নয়, পথপ্রদর্শকও। বীমা শিল্পে কোথায় সাফল্য হচ্ছে, কোথায় ব্যর্থতা হচ্ছে—এসব বিষয় জনগণের সামনে নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরা হলে শিল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি দুটোই বাড়বে।”
তিনি আরও বলেন, সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়, বিশেষ প্রতিবেদন কিংবা ফিচারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বীমার প্রয়োজনীয়তা ও সুবিধা সম্পর্কে সচেতন করা যায়। পাশাপাশি অসাধু কার্যকলাপ বা প্রতারণার ঘটনা তুলে ধরা হলে প্রতিষ্ঠানগুলোও নিজেদের সেবার মানোন্নয়নে বাধ্য হবে।
নুরনবী সোহেল আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত সব বীমা কোম্পানি একই নীতিমালা মেনে চলবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত বাজারে অস্থিরতা থেকেই যাবে। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত সবার জন্য অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করা ও বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর তদারকি বাড়ানো দরকার।”
তার মতে, মিডিয়া শুধু সংবাদ পরিবেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং নীতিনির্ধারক মহলে জনমত তৈরি করে সংস্কার বাস্তবায়নের চাপ তৈরি করতে হবে।
আস্থার সংকট নিরসনে গণমাধ্যমের ভূমিকা
বীমা খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আস্থাহীনতা। গ্রাহকরা মনে করেন, বীমা কোম্পানিগুলো প্রিমিয়াম নিলেও দাবি নিষ্পত্তিতে গড়িমসি করে। এই মনোভাব দূর করতে স্বচ্ছতা ও দ্রুততার পাশাপাশি প্রয়োজন সঠিক তথ্য প্রচার।
এই প্রসঙ্গে গোলাম কিবরিয়া বলেন, “আমরা চাই মিডিয়া শুধু ভুলত্রুটি খুঁজে বের করুক, তা নয়; আমাদের ইতিবাচক দিকগুলোও সামনে আনুক। এতে জনগণের আস্থা বাড়বে।”
সংবাদপত্র ও উন্নয়ন সাংবাদিকতা
এম হোসাইন আহমদ মত দেন, বীমা খাতকে কেন্দ্র করে উন্নয়ন সাংবাদিকতার সুযোগ রয়েছে। যেমন—সফল কর্মীদের ও ম্যাচুরেট গ্রাহকের গল্প, দুর্ঘটনা-পরবর্তী দাবি নিষ্পত্তির ইতিবাচক দিক, বহির্বিশ্বে বীমার গুরুত্ব সাথে বাংলাদেশের বীমা শিল্পের গুরুত্ব বোঝানোর ব্যবস্থা গ্রহণ ও অবস্থান , নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার—এসব বিষয় মানুষের কাছে তুলে ধরলে তারা বীমার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবে।
উপসংহার
রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে অনুষ্ঠিত এ আলোচনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক আলোচনা নয়; বরং দেশের বীমা শিল্পের সামগ্রিক উন্নয়ন নিয়ে চিন্তা-ভাবনার এক প্রতিফলন। গ্রাহক সেবার মানোন্নয়ন, দক্ষ কর্মী তৈরি, নীতিমালার একীকরণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই এই খাত টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারবে।
আর সেই যাত্রায় সংবাদপত্র হতে পারে পথপ্রদর্শক। কারণ গণমাধ্যম যদি তথ্যভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে জনগণ ও নীতিনির্ধারকদের কাছে সঠিক বার্তা পৌঁছে দেয়, তবে বীমা শিল্প শুধু অর্থনীতির সহায়ক খাত হিসেবেই নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে।